মাস্টারমাইন্ড জিয়া কোথায়?

মাস্টারমাইন্ড জিয়া কোথায়?আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার জানানো হচ্ছে, দেশজুড়ে সিরিজ লেখক-ব্লগার হত্যার মাস্টারমাইন্ড সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া। যিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিম বা আনসার আল ইসলামের (এবিটি) সামরিক শাখার প্রধান। তার আরেক সহযোগী ও এসব হত্যাকাণ্ডের আরেক কমান্ডার এবিটি নেতা সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে হাদী-২। শীর্ষ জঙ্গি নেতা মেজর জিয়াকে ধরিয়ে দিতে বেশ কয়েক মাস আগে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। একইভাবে সেলিমকে ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা আসে অনেক আগেই। কিন্তু হোতা জিয়া ও সেলিমের কোনো হদিস মিলছে না।

৮ অক্টোবর হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ব্লগার হত্যার মাস্টারমাইন্ড মেজর জিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে সে ধরা পড়বে। সেদিন ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এ কথা বলছিলেন, তখন গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও আশুলিয়ায় জঙ্গি আস্তানায় একযোগে অভিযান চালাচ্ছিল পুলিশ ও র‌্যাব। ওই অভিযানগুলোতে ১২ জঙ্গি নিহত হয়। এরপর থেকে জিয়ার অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে, শীর্ষ জঙ্গি নেতা জিয়া আসলে কোথায়?

সবশেষ গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেনও বলেছেন, দেশে এ পর্যন্ত যত ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার সব ক’টিই হয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন এবিটি নেতা চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের নির্দেশে। গ্রেফতার এবিটি সদস্যদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এ কথা জানান এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। মোস্টওয়ান্টেড জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেননি তিনি। তবে তাকে খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ডিবির যুগ্ম কমিশনার জানান, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন ও ব্লগার নিলয় নীল হত্যার সঙ্গে জড়িত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা খায়রুলকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল তাকে রিমান্ডেও আনা হয়েছে।

গত বছরের একুশে বইমেলায় প্রকাশ্যে লেখক-ব্লগার প্রকৌশলী ড. অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় মুক্তমনাদের সিরিজ টার্গেট কিলিং। চলতি বছরের এপ্রিলে কলাবাগানে জুলহাজ মান্নানকে ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়কে। মাঝখানে ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীলয়, সিলেটে অনন্ত বিজয়, পুরান ঢাকায় জবি ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদ ও শাহবাগে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে একই কায়দায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিম বা আনসার আল ইসলামের (এবিটি) সিøপার সেলের দুর্র্ধষ জঙ্গিরা জড়িত বলে জোর দিয়ে একাধিকবার জানিয়েছেন পুলিশ ও র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

মাস্টারমাইন্ড জিয়া কোথায়?গত বছর সিরিজ লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক হত্যায় জড়িত ও হোতা আনসারুল্লাহর ভয়ঙ্কর ছয় জঙ্গিকে চিহ্নিত করে তাদের ধরিয়ে দিতে চলতি বছরের ১৯ মে ১৮ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। এরা হলো শরীফ ওরফে হাদী, সেলিম, সিফাত, রাজু, সিহাব ও সাজ্জাদ। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে আবদুস সবুর ওরফে রাজুকে ও মইনুল ইসলাম শামীমকে জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা ও আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল হত্যাচেষ্টায় গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এর আগে গত জুলাই মাসে খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের এবিটির জঙ্গি শরীফ ওরফে হাদী।

অপরদিকে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহর সামরিক শাখার প্রধান চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া ও নব্য জেএমবির প্রধান তামিম চৌধুরীকে ধরিয়ে দিতে ২ আগস্ট ২০ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ সদর দফতর। সাম্প্রতিক সব ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার এই দুই শীর্ষ জঙ্গিই মাস্টারমাইন্ড বলে পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে জানানো হয়। এদের মধ্যে তামিম চৌধুরী আগস্ট মাসের শেষ দিকে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় পুলিশের অভিযানে দুই সহযোগীসহ নিহত হন। তবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে এবিটির সামরিক শাখার প্রধান বহিষ্কৃত মেজর জিয়া।

কে এই বহিষ্কৃত মেজর জিয়াউল হক: ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তৎকালীন মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। পরবর্তী সেনাবাহিনী থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উৎখাতে ধর্মান্ধ কয়েক সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়। তখনই প্রবাসী ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ ও মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকের নাম আসে, যারা ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়। গত দুই বছরে বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক-প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যার প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের মধ্যভাগ থেকে আবারো জিয়ার নাম আলোচনায় আসে। তার পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তার বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ ব্যবহƒত বর্তমান ঠিকানা পলাশ, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা। তার বাবা এখনো বারিধারা ডিউএইচএস এলাকায় বসবাস করেন।

জিয়ার নির্দেশেই সব ব্লগার-লেখক হত্যাকাণ্ড-ডিবি : দেশে এ পর্যন্ত যত ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার সব কটিই হয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের নির্দেশে। গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন এই তথ্য জানান।

আবদুল বাতেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খাইরুল পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, ২০১৩ সালে ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার মাধ্যমেই তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেন। ২০১৪ সাল থেকে সংগঠনের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করে আসছিলেন তিনি। তিনি ইন্টারনেটে নজরদারি করতেন। তথ্য বিশ্লেষণ করতেন। সম্ভাব্য টার্গেটের বিষয়ে বড় ভাইকে তথ্য জানাতেন। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘টার্গেট’ ঠিক করতেন বড় ভাই। পরে টার্গেটের বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ করা হতো। বড় ভাইকে তা জানানো হতো।

দীপন-নীলয় হত্যায় এবিটি সদস্য খায়রুল গ্রেফতার: গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদুল বাতেন জানান, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন ও ব্লগার নিলয় নীল হত্যার সঙ্গে জড়িত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা খায়রুলকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। শুক্রবার রাতে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। জামিল, রিফাত, ফাহিম ও জিসান নামেও পরিচিত এই খায়রুল।

পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল বাতেনের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে এবিটি সদস্য খাইরুল জানিয়েছেন, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নির্দেশেই দীপন ও নিলয়কে হত্যা করা হয়। ব্লগার হত্যার প্রতিটি ঘটনাই জিয়ার নির্দেশে হয়েছে। হত্যাসংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব সদস্যদের মধ্যে তিনিই ভাগ করে দিতেন।

এই যুগ্ম কমিশনার বলেন, গ্রেফতার হওয়া খায়রুল চট্টগ্রামে তার ভাই-বোনের সঙ্গে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিল। তার বাবা-মা নেই। আনসার আল ইসলামে যোগদানের পর সে ঢাকায় আসে। রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর ও এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় মারকাজ (প্রশিক্ষণ) নেয়। এর মধ্যে এলিফ্যান্ট রোডে সাত দিনের মারকাজ করে।
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ড. অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সময় ওই এলাকায় থাকা সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ খায়রুলকে দেখানো হয়েছে উল্লেখ করে আবদুল বাতেন বলেন, ভিডিও ফুটেজ থেকে অন্তত চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা তাদের সাংগঠনিক নাম বলেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্রেফতার এবিটি সদস্য খায়রুলের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার চণ্ডীপুরে। তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গতকাল বিকেলে তার রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে আদালত খায়রুলের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৩১ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে নিজ কার্যালয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর গোড়ানে নিজ বাসায় ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায় স্বীকার করে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম (এবিটি)।

মানবকন্ঠ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।