Monday , September 24 2018
Home / মুক্তমত / সাইফুর রহমান সম্পর্কে কিছু বিরল তথ্য

সাইফুর রহমান সম্পর্কে কিছু বিরল তথ্য

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের নবম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৩২ সালের এই বিরল প্রতিভার ব্যক্তিকে বাংলাদেশ অর্থনীতির পুনর্গঠনের স্থপতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি একমাত্র বাংলাদেশী যিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় নির্বাচিত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর সাইফুর রহমান এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি হঠাৎ করে পাদপ্রদীপে আসেননি। ছাত্রজীবনেই তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। জেল খেটেছেন। ভাষাসৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের একুশে পদকও পেয়েছেন। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন তিনি।

পেশাগত জীবনে সাইফুর রহমান ছিলেন নিরীক্ষক। যিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের ডিগ্রি নিয়েছেন ইংল্যান্ডের ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়ালস থেকে। তিনি ছিলেন মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি ও উন্নয়ন অর্থনীতির আন্তর্জাতিক মানের একজন বিশেষজ্ঞ। শুধু বাংলাদেশ অর্থনীতির খুঁটিনাটি বিষয়ই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির সমকালীন প্রবণতাকে তিনি যেভাবে বিশ্লেষণ করতেন তা বিস্ময়কর মনে হতো। ১৪ বছর বাংলাদেশের কেবিনেট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নিজ দেশের পক্ষে ১২টি জাতীয় বাজেট তিনি উপস্থাপন করেছেন। সম্ভবত এটি বাংলাদেশের যেকোনো অর্থমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপন।

সাইফুর রহমানের সাথে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির বড় অংশ অর্থনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে। তবে কলেজে পড়াকালেই তার নামের সাথে আমার বিশেষ পরিচয় ঘটে। তার প্রতিষ্ঠিত ও মালিকানাধীন সিএ ফার্ম রহমান রহমান অ্যান্ড হক থেকে আমার বড় ভাই মাহফুজ খলিলী সিএ পাস করেছেন এবং পাস করার পর সেখানেই কয়েক বছর কাজ করেন। সেই সময়টাতে তিনি সম্ভবত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেখান থেকে তাকে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দান করেন। অবশ্য সাইফুর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং তার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল গঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণকারী এই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বকে সিলেটের মানুষ ‘ছয়ফুর রহমান’ হিসেবে জানেন। প্রথম দিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য বাজেট ডকুমেন্টে এ বানানেই স্বাক্ষর করতেন। সংসদে বাজেট আলোচনার সময় একজন ভুলক্রমে তাকে ‘ছয়ফুট রহমান’ বলে ফেলেন। স্পিকার রস করে বিষয়টিকে হালকা করে বলেন, মাননীয় মন্ত্রী আপনাকে উনি খাটো করেননি, এভারেজ বাঙালির উপরেই রেখেছেন। তখন সংসদে হাসির রোল পড়ে যায়। পরে অবশ্য সব ক্ষেত্রে তিনি সাইফুর রহমান হয়ে গেছেন।

সাইফুর রহমান বিয়ে করেছিলেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত একে খান পরিবারে। পাকিস্তানের এই সাবেক শিল্পমন্ত্রী এ কে খানের পরিবার ছিল তার ভাই বোন সবাইকে নিয়ে। বাংলাদেশের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি এই পরিবারের জামাতা ছিলেন। চট্টগ্রামের মেয়ের জামাতা হিসেবে বন্দরনগরীর প্রতি তার এক ধরনের টান ছিল। অর্থমন্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না, যদিও সাইফুর রহমানকে এখনো সিলেটের উন্নয়নের কারিগর হিসেবে জানেন দলমত নির্বিশেষে সেখানকার সব মানুষ। সাইফুর রহমান যে সিলেটের মানুষ সেটি তার বাজেট বক্তৃতা শোনার সময়ও বোঝা যেত। আর এই মানুষটি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের বার্ষিক গভর্নর সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন সাইফুর রহমান। তার ওপর অগাধ আস্থা ছিল প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভব করতেন না। এ সময় অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে এবং এর আগে বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে অর্থনীতির ওপর যেসব মন্তব্য তিনি করতেন তা নিয়মিত ফলো করার সুযোগ হতো। অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে আমাদের কাজ ছিল অর্থমন্ত্রীর দৈনন্দিন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা। সাইফুর রহমান বরাবরই একজন রিপোর্টারবান্ধব মন্ত্রী ছিলেন। শেষ মেয়াদে তিনি দায়িত্ব পালনের সময় বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন তার স্ত্রী দুররে রহমান দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

স্ত্রীর মৃত্যুর প্রভাব তার ওপর বিশেষভাবে পড়ে। তবে শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হলেও দায়িত্ব পালনে তাকে কখনো সেভাবে ক্লান্ত মনে হতো না। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে প্রতি বছর তিনি অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সদস্যদের সাথে বাজেট প্রণয়নের সময় বসতেন এবং বাজেটের নানা বিষয়ে তাদের সাথে মতবিনিময় করতেন। ২০০৬ সালে ইআরএফের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি থাকাকালে এ ধরনের এক অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তার সরকারের শেষ প্রাকবাজেট আলোচনা তার একেবারে পাশে থেকে শোনার সুযোগ হয়। তদানীন্তন ইআরএফ সেক্রেটারি নাজমুল আহসান সেই সভাটি পরিচালনা করেছিলেন।

সাইফুর রহমান এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মুক্তবাজারে বিশ্বাস করতেন। ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর শহীদ জিয়ার সরকারের কমান্ড অর্থনীতি থেকে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ’৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল কাজটি তিনি করেছেন। ২০০১ সালের পরের মেয়াদে এটাকে আরো বেশ খানিকটা সুদৃঢ় ভিত্তি দিয়েছেন তিনি। সাইফুর রহমানের নীতির বৈশিষ্ট্য ছিল সর্বজনীন। তার সময়ে বাংলাদেশে তৈরী পোশাকের লিংকেজ শিল্প এবং ভারী শিল্পকারখানার শক্ত ভিত্তি লাভ করে।

বিচক্ষণ ও সাহসী সাইফুর রহমানের সুযোগ্য তত্ত্বাবধানেই ঐতিহাসিক ব্যাংকিং খাতের সময়োপযোগী ও যুগোপযোগী সংস্কারকাজ বাস্তবে রূপায়িত হয়েছিল। তিনি ছিলেন উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী একজন কর্মবীর। গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত স্থাপনে এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণে কর্মসূচি প্রণয়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে অল্প দিনের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। তার বহু কীর্তি সারা দেশের গ্রাম ও শহরে রয়েছে এবং তা বহুকাল ধরেই থাকবে। অনেকেই তাকে বৃহত্তর সিলেটের রাস্তাঘাট, সেতুসহ বিভিন্ন উন্নয়নের রূপকার বলে থাকেন। কিন্তু সারা দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত স্থাপন, কৃষির উন্নয়ন ও সেচসুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে সারা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও পরিকল্পনার যে মূল ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের রূপকার হিসেবেই এ দেশের মানুষ তাকে স্মরণ করবে।

তিনিই প্রথম জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের সূচনা করেন এবং বিস্তৃতি ঘটান। বাজার অর্থনীতিতে তার মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করা নব্বই শতকে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয় এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে এটি ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। সাইফুর রহমানের এটি ছিল একটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ। এতে তিনি অবশ্য অনেক সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। এমনকি নিজের দলের মধ্যেও তাকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি অবিচল থেকেছেন, কেউ তাকে লক্ষচ্যুত করতে পারেনি। তার সমালোচকেরাই পরে তার প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশে তিনিই প্রথম অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। দলের সঙ্কীর্ণতা তার নীতির বাস্তবায়নে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি ছিলেন এক উদারপন্থী, সংস্কারবাদী, বাস্তবতায় বিশ্বাসী প্রাগমেটিক রাজনীতিক। তিনি বুঝেছিলেন বাংলাদেশকে যদি একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হয়, যদি সমৃদ্ধিরপথে এগিয়ে যেতে হয়, দারিদ্র্যমুক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার আনতেই হবে। এসব সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়ন ছাড়াও দুর্নীতির সর্বগ্রাসী থাবা থেকে দেশকে রক্ষা করতে তিনি স্বাধীন জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখন ব্যাংকিং খাতের সেই সংস্কার অনেকখানি মুখথুবড়ে পড়েছে আর দুর্নীতি দমন কমিশন দলীয় স্বার্থের কাছে এক অসহায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

সাইফুর রহমান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যাকে কাঠামো দিয়েই দেখতেন এবং সমাধানের চেষ্টাও সেভাবেই করতেন। যার কারণে তার সময় প্রতি বছর ৫-৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাব দেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে শিল্প এলাকায় এমনকি হাটবাজারে গেলেও বোঝা যেত। এখন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরও বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। নতুন শিল্পকারখানা করার মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। গ্রামগঞ্জে গেলে অনেক লোকের মধ্যে তীব্র অভাব-অনটন দেখা যায়।

সাইফুর রহমানের ’৯০-এর দশকের প্রথম মেয়াদে নেয়া বিভিন্ন নীতির ধারাবাহিকতা এর পরে অর্থমন্ত্রী হওয়া শাহ এ এম এস কিবরিয়া অনেকখানিই অনুসরণ করেছেন। তিনি এ কথা স্বীকার করতে কুণ্ঠিতও হতেন না। কিন্তু ২০০৭ সালের পর সেই ধারাবাহিকতা আর রক্ষিত হয়নি। আর এখন অর্থনীতির অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কেতাবে আছে তো গোয়ালে নেই’।

আমরা শুনতাম সাইফুর রহমানের শরীরে এক সময় ক্যান্সার জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়েছে। এর পরও তাকে আমরা ৭৬ বছর বয়সেও প্রাণবন্তই দেখতাম। কিন্তু এই বিরল মানুষটি তাকে বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনায় খাদে পড়ে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন ২০০৯ সালে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যারা এক যুগ পরেও কাজ করবেন তারাও সাইফুর রহমানকে স্মরণ না করে পারবেন না।

About banglamail

Check Also

দুই শতাধিক সফরসঙ্গী নিয়ে জাতিসঙ্ঘে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বরেকর্ড – ডক্টর তুহিন মালিক

এক : জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন নিউ ইয়র্কে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে যোগ …