Sunday , October 21 2018
Home / মুক্তমত / সুরেন্দ্র কুমারের বই এবং আমার কয়েকটি প্রশ্ন – ওলিউল্লাহ নোমান

সুরেন্দ্র কুমারের বই এবং আমার কয়েকটি প্রশ্ন – ওলিউল্লাহ নোমান

দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার একটি বই বের হয়েছে দেখলাম। বইটির ‘মুখবন্ধ’ এবং প্রচ্ছদ অনেকে প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এনিয়ে আবার অনেকের মাঝে উচ্ছাস দেখা যাচ্ছে। এমন উচ্ছাস অনেকের মাঝে দেখেছিলাম যখন তিনি গৃহবন্দি ছিলেন। তখনো আমি বলেছিলাম, দুর্নীতিবাজরা কখনো শক্ত অবস্থান নিতে পারে না।
বইটি পড়ার সুযোগ আমার হয়নি এখনো। তবে প্রচ্ছদ এবং নাম দেখেই বুঝতে পারছি তিনি কি লেখার চেষ্টা করেছেন। বইটি সংগ্রহ করার চেষ্টায় আছি। তখন ইনশাল্লাহ বিস্তারিত লেখব।
বইটির নাম এখানে দিলাম—–A BROKEN DREAM Rule of Law, Human Rights & Democracy

প্রচ্ছদে উল্লেখিত শিরোনাম বাংলা তরজমা করলে দাড়ায়
আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের স্বপ্ন ভঙ্গের কথা বলেছেন ।

শিরোনাম দেখেই আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন জেগে উঠেছে। তাই সবার সাথে শেয়ার করে নিচ্ছি আমার মনের প্রশ্ন গুলো। হতে পারি আমি ভুল। তারপরও যেহেতু মনে প্রশ্ন গুলো উদয় হচ্ছে তাই লিখলাম।

১. বাবু সুরেন্দ্র কুমারকে আমি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি থেকে দেখতেছি। খুব কাছে থেকে প্রতিদিন বিচারালয় পর্যবেক্ষণ করতাম। সংবাদের খুজে আদালত ভবনে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। তখন থেকে জানি তিনি একজন গোড়া আওয়ামী লীগার। পাশাপাশি তাঁর দুর্নীতির বিষয় গুলো আইনজীবীদের মুখে মুখে প্রচারিত ছিল।

২. বাবু সুরেন্দ্র কুমার বিচারের আসনে বসা অবস্থায় কি ন্যায় বিচার করেছেন?
বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলাটির লিভ টু আপিল শুনানীর জন্য আদালতে ধার্য্য ছিল। সেদিন প্রধান বিচারপতি ছিলেন এবিএম খায়রুল হক। তাঁর দুই পাশে বসেছিলেন মো: মোজাম্মেল হোসেন ও সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। মূল আইনজীবী ব্যারিষ্টার রফিক উল হক সাহেব উঠে দাড়ালেন। বললেন, শুরু করার আগে ব্যারিষ্টার মওদুদ সাহেব একটি আবেদন পেশ করবেন। তারপর শুনানী শুরু করা হউক। তারা জানতেন আবেদনটি কি বিষয়ে। উত্থাপনের আগে এফিডেভিট করে দাখিল করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী এফিডেভিট করে সেটা দাখিল করা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট দফতরে। ব্যারিষ্টার মওদুদ সাহেব দাড়ালেন। আপিল বিভাগ সেটা শুনতে নারাজ। সেদিনের আদালতে মনে হয়েছিল খায়রুল হক নন, প্রধান বিচারপতির আসনে বসে কোর্ট চালাচ্ছেন সুরেন্দ্র কুমার। তাঁর অতি উৎসাহি ভুমিকা দেখার সুযোগ হয়েছিল সেদিন। রফিক উল হক বার বার দাড়িয়ে বলছেন ওনার আবেদনটা শুনেন। মওদুদ সাহেব আবেদন নিয়ে দাড়িয়ে আছেন তখন। তারা রফিক উল হককে বলছেন লিভ টু আপিল শুনানী শুরু করেন। নতুন আবেদনের সুযোগ নাই। এক পর্যায়ে তারা বললেন আমরা রায় দিচ্ছি। শুনানী ছাড়াই খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলায় লিভ টু আপিল আবেদন খারিজ করে দিলেন। ব্যারিষ্টার মওদুদ সাহেব যেই আবেদন নিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন সেটা ছিল বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে এই আপিল আদালতের প্রতি অনাস্থা। একজন বিচার প্রার্থীর তাদের উপর আস্থা নেই। সেটা জেনে বোঝে তারা সেই বিচার প্রার্থীর আবেদন শুনানীর সুযোগ না দিয়ে খারিজ করে দিলেন! ন্যায় বিচারকরা কি এমনটা করতে পারেন??? এটার নাম কি ন্যায় বিচার???? তখন কোথায় ছিল সুরেন্দ্র কুমারের ন্যায় বিচারের সেই স্বপ্ন???

৩. সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল শুনানীর আগে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শামিম হাসনাইন আবেদন করলেন। কারন বিচারপতি শামিম হাসনাইন পাকিস্তানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহপাঠি ছিলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালেও সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। আপিল বিভাগে তখন সুরেন্দ্র কুমার প্রধান বিচারপতি। হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি সাক্ষ্য দিতে চেয়েছেন। অথচ সেটা শোনারও প্রয়োজন মনে করলেন না। শুধু তাই নয়, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষ থেকে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পেশ করা হয়েছিল। ধরে নিলাম সেই সার্টিফিকেট ভুয়া। নিজেরা বানিয়ে সেটা পেশ করেছেন। কিন্তু বিচারকের কাজ কি? সেটাকে যাছাই বাছাই করা ছাড়াই প্রত্যাখান করা? একটা মানুষকে খুন করার জন্য আদেশ দেয়ার আগে একটু যাছাই বাছাই করতে সমস্যা কোথায় ছিল?! নাকি তারা জানেন শামিম হাসনাইনকে সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ দিলে এবং সার্টিফিকেট যাছাই বাছাই করতে গেলে খুন করার আদেশটা এত সহজে দেয়া যাবে না। সুরেন্দ্র কুমারের কাছে প্রশ্ন এর নামটি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা??! চিরন্তন সত্য হচ্ছে ফাঁসির আদেশ দেয়ার আগে সন্দেহাতীত প্রমান হওয়া। এখানে কি বলা যায় সন্দেহাতীত প্রমান হয়েছিল সবকিছু?? উত্থাপিত প্রশ্নের যাছাই বাছাই ছাড়া কাউকে ফাঁসি দিলে কি বলা যায় সন্দেহাতীত প্রমাণ হয়েছে?!!

৪. আবদুল কাদের মোল্লাকে আপিল বিভাগ ফাঁসি দিয়েছে একজন সাক্ষ্যের একটি বক্তব্যের উপর বিত্তি করে। সেই সাক্ষীর নাম মোমেনা। মোমেনার ৩টি বক্তব্য রয়েছে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একটি বক্তব্য রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। যেখানে তিনি ঘটনার সাথে আবদুল কাদের মোল্লার কোন করমের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেননি। একটি বক্তব্য মামলার তদন্তকারীর কাছে দিয়েছেন। সেখানে তিনি দিয়েছেন এক রকম। সর্বশেষ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের ক্যামেরা ট্রায়ালে। যেখানে শুধু বিচারক প্রসিকিউশনের আইনজীবী ও আসামী পক্ষের একজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। বোরখা পরিহিত এবং মুখমন্ডল আবৃত ছিল তাঁর। প্রশ্ন হচ্ছে বিচারের নীতি হল সন্দেহাতীত প্রমানিত হওয়া। ৩ বক্তব্যে তাঁর বয়সেরও ফারাক রয়েছে। ৩ রকমের ৩টি বক্তব্য দিয়ে কি সন্দেহাতীত প্রমানিত হয়!! এ প্রশ্ন যখন আপিলের সময় উত্থাপিত হয়েছিল তখন তিনি সুরেন্দ্র কুমার অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে বলেছিলেন এর মাঝে একটা আমাদের বিশ্বাস হয়েছে। এর নাম কি ন্যায় বিচার???

৫. দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে একটি আদালত অবমাননার মামলা হয়েছিল সরাসরি আপিল বিভাগে। কারন, একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছিল আপিল বিভাগের কিছু আদেশ নিয়ে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল-চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে। এই রিপোর্ট আমি নিজেই অনুসন্ধান করে লিখেছিলাম। আদালত অবমাননার মামলাটি যখন শুনানী হয় তখন সম্পাদক জনাব মাহমুদুর রহমান রিপোর্টের পক্ষে প্রমান হাজির করলেন। তাৎক্ষণিক সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ অন্যায় বিচারপতিরা বললেন, আমরা এখানে সত্য মিথ্যা যাছাই করতে বসিনি। ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। আমাদের কারাদন্ড এবং অর্থ জরিমানা করলেন। প্রমান যাছাই বাছাই না করে কাউকে কারাদন্ড দেয়া কি ন্যায় বিচার!!??

বাবু সুরেন্দ্র কুমারের বইয়ে কি এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর পাওয়া যাবে?!!

About banglamail

Check Also

গনতন্ত্রের কুলখানি ; কোন পথে বাংলাদেশ সমাধানের উপায়

কোন রাজনৈতিক আদর্শের বাহক হিসেবে নয় দেশের একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে কথাগুলা বলা নাগরিক …