Saturday , October 20 2018
Home / মুক্তমত / ড. কামালদের ভীড়ে জামায়াতের বাস্তবতা – মু সাইফুর রহমান পারভেজ

ড. কামালদের ভীড়ে জামায়াতের বাস্তবতা – মু সাইফুর রহমান পারভেজ

রাত ২.৪৫ মিনিট। লেখার কোন অভিপ্রায় ছিল না। আমি একজন ভাল পাঠক। ফেসবুকের অনেক ভাল লেখকদের লেখাগুলো বেশীরভাগ সময়ে মন দিয়ে পড়া হয়। পত্রিকার চেয়ে লেখকরা অনেক মাধুরী মিশিয়ে এখানে অকপটে লিখে যেতে পারেন। প্রকাশ বা কাটছাঁটের কোন ঝামেলা নেই। এই ধরুন একটা কলাম লিখে তা প্রকাশ করার জন্য চেনাজানা অনলাইন বা অফলাইন পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পাঠালাম। বিড়ম্বনা এখানেই। বেচারা তন্নতন্ন করে খোজে বেড়ায় জামায়াত শিবির নিয়ে অতিরিক্ত কিছু লিখলাম কিনা। লিখলে সরি বলে আর প্রকাশ করেন না মহাশয়। ৯৫ ভাগ পত্রিকাওয়ালাদের জামায়াত শিবির নিয়ে ভাল এলার্জি রয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই ফেসবুকে হাত ধরতে হয়। সম্ভব হলে অচিরেই একটা অনলাইন পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছে আছে। যাদের লেখা প্রকাশ করতে কর্তাদের কষ্ট হয় তাদের লেখার জায়গা হবে এ পোর্টালে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ দোরগোড়ায় উপনীত। এ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কর্তৃক একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনীত ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হলে এর ফলাফল অতীতের ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ফলাফলের চেয়ে যে ভিন্নতর হবে না এটি অনেকটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের কল্যাণের মধ্য দিয়ে সার্বিকভাবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। দেশের সাধারণ জনমানুষও দেশের স্থিতিশীলতার বিষয়টিকে মাথায় রেখে প্রত্যাশা করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনসমর্থনের প্রতিফলনে নির্বাচিত দল সরকার পরিচালনা করবে। আগামী সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে হলে সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ ভেঙে দেয়া অত্যাবশ্যক। যাই হোক, প্রসংগে আসি।

দেশের প্রথিতযশা রাজনাতিবিদ ড.কামাল হোসেন ও বি চৌধুরী ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু তাদের যে জনসমর্থন বা সাংগঠনিক ক্ষমতা তাতে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে ভোটে জিতে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবেন না।যেসব শর্তে তারা জাতীয় ঐক্যের কাজ করছেন তা মঙ্গলজনক হবে বলে মনে হচ্ছে না। শর্তের ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত চালাকি বা মামার বাড়ির আব্দার সবসময় মিষ্টত্ব লাভ করে না। নিজের যোগ্যতা আর সক্ষমতা সবসময় গুরত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বলে গন্য হয়।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য গঠন প্রক্রিয়ার খুব একটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়। কারণ ড. কামাল হোসেনের পহেলা শর্ত হচ্ছে- ২০ দলীয় জোট থেকে আগে জামায়াতকে বাদ দিতে হবে। তার অর্থ দাঁড়ায় আগে ২০ দলীয় জোট ভেঙে ফেলতে হবে। এরকম কথা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক। তাদের এ দাবীর মধ্যে যে বড় ধরনের কিন্তু লুকানো রয়েছে তা দিবালোকের মত স্পষ্ট।

মনে রাখা ভাল, যখন ২০ দলীয় জোট ভেঙে যাবে তখন বিএনপিও নতুন করে সংকটে পতিত হবে। এ সুযোগে ওইসব ছোট ছোট দলের রজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে এবং তারা নির্বাচনী দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে। ড. কামালদের উদ্দেশ্য যে তা নয়, কে বিশ্বাস করবে ?

কে না জানে,২০ দলীয় জোটের মধ্যে বিএনপির বড় সহযোগী ও বিশ্বস্ত শক্তি হচ্ছে জামায়াত। তাই জামায়াতকে বাদ দিয়ে যাদের সঙ্গেই বিএনপি জাতীয় ঐক্যে যাক না কেন ভোটের হিসাবে তাদের পক্ষ থেকে কতটুকু সমর্থন লাভ করতে পারবে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপি যদি নতুন কোন তামাশায় পা দেয়, তাহলে বিএনপি চিরতরে নির্বাসনে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট রয়েছে । তাই ড. কামাল হোসেনের দেয়া শর্ত বাজারে খুব একটা চড়া দামে বিক্রি হবে বলে মনে হয় না।

ক্ষমতার স্বাদ পেতে হলে ড. কামালদের হয় তাদের ভোটে জেতার মতো বড় দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করতে হবে অথবা বিনাভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি পথ বের করতে হবে। বিনাভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি তৎপরতা কামাল হোসেনকে সামনে রেখে কারো কারো মাথায় আছে বলে বাজারে খবর আছে। তবে অসাংবিধানিক পথে হাঁটার বিপদ ও ঝুঁকি বিবেচনা করে তারা তেমন আত্মধ্বংসী কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না বলেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। এতে হিতে বিপরীত হয়ে রিয়েকশান হার্ড হতে পারে।

সেজন্যই আসছে বৃহত্তর জোটের ভাবনা। তবে এই ভাবুকদের এটা জানা আছে যে, বিএনপির সঙ্গে না থাকলে ভোটের বাক্স ফাঁকা থাকবে। তাই বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের একটা চেষ্টা চলছে। বিএনপি এতে খুশি। বিএনপি খুশী হলেও ২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফাকে আজ বলতে শুনেছি ,যেখানে যুক্তফ্রন্টের নেতারা এখনই আসন ভাগাভাগিসহ ক্ষমতা চায়, সেখানে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের শঙ্কা রয়েছে। যদিও ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গোলাম মোস্তফা নয় সকলের কথা হচ্ছে, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে। এ অবস্থায় দলের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি ঠিকমতো রাজনীতি করতে পারছে না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে কাবু দলটি এখন গরিবের বউয়ে পরিণত হয়েছে। যাদের কোনো ভোট নেই, তারাও ১৫০ আসন চায়। নির্বাচনে জয়ী হলে ২ বছর দেশ চালানোর মতো শর্ত দেয়। বিএনপির নেতৃত্বের কাছে এটা কাম্য নয়। তাদের মেরুদ- সোজা করা উচিত। তবুও বিএনপি দিল্লি-জাতিসংঘ-ওয়াশিংটন ইত্যাদি ঘুরে বাজারের অবস্থা বুঝতে পেরেছে। একটি বড় ঐক্য গড়ে না উঠলে আবাদ এবং ফলন ভালো হলেও ফসল বিএনপির গোলায় তোলা সহজ কাজ হবে না। বিএনপি বড় ছাড় দিয়ে হলেও এ টু জেড ঐক্য চায়। তেমন ঐক্য হওয়া কঠিন। আওয়ামী লীগ ভুঁইফোড় দল নয়, দেশ জুড়ে দলের কর্মী-সমর্থক নেই তা-ও নয়। বিএনপি চাইলেই এখন কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে আওয়ামী লীগকে ফেলে দিতে পারবে না। আওয়ামীলীগকে ফেলে দিতে হলে হিম্মত বা রাজনৈতিক ম্যারপ্যাচের চূড়ান্ত দীক্ষা এবং বুকের পাটা মেলে ধরে এবার দাড়াতে হবে। যদ্দুর বিশ্বাস করি,ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে জামায়াতকে বাদ দিয়ে ঐক্য করবে না বিএনপি। করবে কৌশল।

যদ্দুর বিশ্বাস করি,ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে জামায়াতকে বাদ দিয়ে ঐক্য করবে না বিএনপি। করবে কৌশল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতকে যেভাবে ‘যুগপৎ’ শব্দ দিয়ে সঙ্গে রাখা হয়েছিল, এবারও তাই করা হবে। তবে এতে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এক কৌশল বার বার ভালো ফল দেয় না। কৌশল বা স্টাইল বদলাতে হয়। ম্যাজিকেল মুভমেন্ট আনতে হয় প্রয়োজনে । এবারকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ড. কামালদের এই ‘বৃহত্তর’ ঐক্যের ভিত্তি কী? কেবল জামায়াত বিরোধীতা আর সরকার পতন ? ক্ষমতায় যেভাবেই হোক আসীন হওয়া ? যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে লিখিত দিচ্ছি, আশা গুড়ে বালি হবে। জনমের কান্দন কান্দিতে হবে একে অন্যের গলায় ধরে। বুঝা উচিত, জনগন আন্দোলনমুখী না হলেও বোকা নয় বরং চালাক। কথা হচ্ছে, যারা জামায়াত বাদের শর্ত দিচ্ছে, তাদের একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য আছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০ দলীয় জোটে জামায়াত দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জনশক্তির দিক বিবেচনায় তৃতীয় শক্তি। ভোটের হিসাব নিকাশে বসে বাস্তব এবং গ্রাহ্য চিত্র দেখতে পাচ্ছেন। বিশেষ করে অতীতের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী ছিল ক্ষমতায় যাওয়ার একটা ফ্যাক্টর। কেন না ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন দেয়ার কারণে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন না দেয়ায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী চারদলীয় জোট গঠনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে। চারদলীয় জোটের বিরোধীদের বিশ্লেষণ ছিল এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০০৬ সালের নির্বাচনেও এই জোট পুনরায় ক্ষমতায় আসবে। এ কারণেই সেই নির্বাচন হতে দেয়া হয়নি। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ১/১১ ঘটানোর মধ্য দিয়ে দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া হয়।

সারা দেশে জামায়াতের প্রচুর রিজার্ভ জনশক্তি রয়েছে। এমন অনেক আসন আছে যেখানে পৃথকভাবে নির্বাচন করলে জামায়াতের প্রার্থী জিতে আসতে পারবে অনায়সে। তা কি ড. কামালদের বেলায় ভূলেও কল্পনা করা যায়?

তাছাড়া জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল দলও বটে। দেশের আপামরজনগনের মতে, ‘জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল দল এবং তারা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাদের দল পরিচালনা করে থাকে- যা অন্য কোনো দল করে না। গণতন্ত্রের অনুশীলন কেবল জামায়াতের মধ্যেই বেশি’।জামায়াত বাদের শর্ত আরোপকারীদের লক্ষ্য হচ্ছে- জামায়াত না থাকলে জাতীয় ঐক্যে প্রভাব খাটানো যাবে। বিএনপির পরেই তাদের অবস্থান হবে। ফলে তারা যা চাইবে তাই পাওয়া যাবে বলে তারা মনে করেন। মন্ত্রিত্ব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সব দাবিই করা যাবে।তবে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে অংশ নিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বড় মাথা ব্যথা। কেননা, বর্তমানে জামায়াত যতই নাজুক পরিস্থিতিতে থাক না কেন, ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত শক্ত অবস্থানে। কারণ জামায়াতের ভোট ব্যাংকে কেউ কখনো হাত দিতে পারে না। জামায়াতের ভোট ব্যাংকে ভোট বাড়ে বরং কখনো কমে না। আগামী নির্বাচনেও জামায়াত যে আওয়ামী লীগ বিএনপির জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় ফ্যাক্টর সেটা অন্যদের বোধগম্য না হলেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ঠিকই ভাবছেন। আর যে কারণে জামায়াতকে দমাতে এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করতে যতসব কৌশল ক্ষমতাসীনদের।ড.কামালদের রাজনৈতিক তোড়জোড় কতটা ফল দেবে জানি না তবে ভোট আর রাজপথের চূড়ান্ত হিসেবে বলতে পারি জামায়াতকে সঠিক রক্ষনাবেক্ষন আর পরিচর্যা ছাড়া কোনভাবেই সোনালী ফসল ঘরে তোলা সম্ভব নয়। জামায়াত ছাড়া অনেক কিছু হয়েও হবে না, নাটক অসমাপ্ত থেকে থেকে যাবে। ড. কামালরা যে পথে ক্ষমতার দিবাস্বপ্নে ঘুমাতে পারছেন না, সে পথ অনেকটা পিচ্ছিল এবং বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভবও বটে।

About banglamail

Check Also

গনতন্ত্রের কুলখানি ; কোন পথে বাংলাদেশ সমাধানের উপায়

কোন রাজনৈতিক আদর্শের বাহক হিসেবে নয় দেশের একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে কথাগুলা বলা নাগরিক …