হাস্যজ্জল মুজাহিদ, কফিনে শুইয়েও হাসছে।

আম্মা!
– ও আম্মা! কই গেলেন? তাড়াতাড়ি ভাত দিন। আমাকে যেতে হবে তো। দ্রুত করুন।

– ছেলের এমন হাঁকডাঁকে আম্মা কিছুটা বিচলিত হলেন। তার ছেলে মুজাহিদ তো এমন না। সে ক্ষুধার জ্বালায় মরে যাবে তারপরও মুখ ফুটে একটি শব্দও করে না। ২৪ টি বছর ধরে বুকের মাঝে আগলে ধরে যে মুজাহিদ কে আমি বড় করলাম সেই শান্ত মুজাহিদ তো এই মুজাহিদ নাহ! মুজাহিদকে এতো অস্থির দেখাচ্ছে কেন?

– নাম মুজাহিদুল ইসলাম। ষ্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ ফাইনাল সেমিষ্টারের ছাত্র। দুই ভাই এর মধ্যে মুজাহিদই বড়। ছোটবেলা থেকেই মুজাহিদ বেশ শান্ত এবং চুপচাপ! তার এই শান্ত স্বভাবটি আম্মা মোটেও পছন্দ করতেন না। এই চুপচাপ স্বভাবের কারণেই মুজাহিদ নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে আম্মাকে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতে হয়।

– একবার আম্মা মুজাহিদ কে নিয়ে তার বোনের বাড়ি অর্থাৎ মুজাহিদের খালামনির নারায়নগঞ্জের বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। মুজাহিদ এবং তার খালাতো ভাই বোনরা একসঙ্গে খেলতেছিল। হঠাৎ কি যে হল, ওর খালাতো ভাই বোনরা ওকে মারতে শুরু করল! মাইর এর ধুপ ধাপ শব্দে আম্মা ছুটে এলেন। দেখলেন, মুজাহিদ নীরবে মাইর খেয়ে যাচ্ছে আর চোখের পানি ফেলছে! এই দৃশ্য দেখে আম্মা নিজেও কেঁদে ফেলেন! আম্মা আফসোস করে বলেন, হায় আল্লাহ! আমার ছেলেটাকে এতোটা সহজ সরল বানালে কেন? এই ঘটনায় আম্মা কিছুটা রাগান্বিত হয়ে মুজাহিদকে বলেন, তুমি চুপ করে বসে ছিলা কেন হু? তুমি দুইটা দিতে পারো নি! মুজাহিদ নির্লুপ্ত কণ্ঠে বলে, তাহলে যে ওদের খুবই ব্যাথা লাগত!

– এদিকে মুজাহিদের এই শান্ত স্বভাবের কারণেই নানাজি সবচেয়ে বেশি আদর করতেন। নানাজি যেন মুজাহিদ বলতেই অজ্ঞান। নানাজি যখন মুজাহিদদের বাড়িতে আসেন তখন নানাজির সর্বক্ষনের সঙ্গি হিসেবে মুজাহিদ কে দেখা যেত! আর নানাজিও মনের যাবতীয় সুখ দুঃখের খেরোপাতা মুজাহিদের সামনে ঢেলে দিতেন। তিনি তার অতীত অভিজ্ঞতার সমস্ত ভান্ডারটি মুজাহিদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতেন। যেন মুজাহিদ বাস্তব জীবনে পদার্পন করতে গিয়ে কিছুটা সহায়তা পায়।

– আম্মা আবারো নিজের চিন্তায় ফিরে আসলেন। এমন কত দিন গেছে গ্যাস না থাকার কারণে বাসায় নাস্তা তৈরী হয়নি। ওদিকে মুজাহিদের ভার্সিটিতে যাবার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু সামান্য টু শব্দটি না করে সালাম দিয়ে ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতো। আম্মা বাঁধা দিতে গেলে বলত, ভার্সিটির ক্যান্টিনে খেয়ে নিবো আম্মা।

– আজ ঈদের তৃতীয় দিন। কি এমন ঘটল যে মুজাহিদ ভাত খাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিল। আম্মার বুকের কোথায় যেন চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করতে লাগলেন! শুনেছি শেষ বিদায়ের সময় নাকি এমনটা করে থাকে! তাহলে কি………. ছিঃ ছিঃ! কি সব ভাবছি আমি! আজ হয়তো ওর একটু বেশিই ক্ষুধা লেগেছে!

– আবারো হাক ছাড়ে ‍মুজাহিদ! কই আম্মা? দেরি হয়ে যাচ্ছে যে! ওদিকে সবাই অপেক্ষা করছে! তাহলে কি আম চলে যাবো আম্মা? আম্মা কিছুটা রুঢ় ভাষায় বললেন, একদমই না! আর একটু অপেক্ষা কর এখনই দিচ্ছি!

– টেবিলে খাবার দিয়ে ‍মুজাহিদের সামনের চেয়ারটিতে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন আম্মা। আর মুজাহিদ এক মনে খেয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মুজাহিদ আম্মার কৌতূহলী দৃষ্টিটি দেখতে পায়! কি হল আম্মা! এমন করে তাকিয়ে আছেন যে? আম্মা আনমনা মন কে দূর করে বলেন, কই এমনিতেই দেখছিলাম! আম্মা আমি তাহলে যাই! বেশ দেরিয়ে হয়ে গেল! আসসালামু আলাইকুম। এভাবেই বেরিয়ে গেল মুজাহিদ আর আম্মা মৃদু স্বরে বলেলেন, ফি আমানিল্লাহ!

– দুপুরের পর আম্মা সংবাদ দেখার জন্য টিভি ছেড়ে বসলেন। তখন এনটিভির দুপুরের সংবাদ চলছিল। সংবাদের মাঝে একটি দৃশ্য দেখে আম্মা হতভম্ব হয়ে গেলেন! আম্মা পুরো পৃথিবী যেন স্তবদ্ধ হয়ে থমকে গেছে! এ জন্য একটি দুঃস্বপ্ন কিংবা মতিভ্রম! তাই হবে হয়তো না হলে কি করে সম্ভব! যে মুজাহিদকে তিনি খাইয়ে বাহিরে পাঠালেন, সেই মুজাহিদকে পল্টন ময়দানে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হচ্ছে। আম্মা দেখলেন, তার মুজাহিদের হাতের পালস দেখে মৃত্যু নিশ্চিত করা হল! আম্মার পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল।

– খালামনির বাড়িতে কাজিনদের মাঝে মাইর খেয়ে মুজাহিদ যেমন শান্ত এবং নির্লিপ্ত ছিল আজও তেমনি শান্তই রয়ে গেছে! আজ মুজাহিদ যেন আরো বেশি শান্ত। আজ মুজাহিদের চোখে পানিও নেই। বরঞ্জ মুখটা অনেক বেশি হাস্যজ্জল লাগছে! নূরের আলো যেন মুজাহিদের ‍মুখ দিয়ে ঠিকরে বরে হচ্ছিল!

– নানাজি প্রিয় নাতির শান্ত মুখটা দেখে কালবোকা হয়ে গেলেন! ওরা, আমার এতো শান্ত নাতিটাকে এইভাবে সাপের মত পিটিয়ে হত্যা করতে পারল? নানাজি তার জীবনের অন্যতম প্রিয় বস্তু হজ্জ এর সময় ব্যবহৃত ইহরামের সাদা কাপড়টি দিয়ে প্রিয় নাতির কাফন বানিয়ে দিলেন। সদা হাস্যজ্জল মুজাহিদ যেন কফিনে শুইয়েও হাসতেছিল। সোনার পাখি এভাবেই চিরবিদায় নিয়ে নিল। সমাজের বুক থেকে হারিয়ে গেল মুজাহিদ আর আম্মার বুকে তৈরী হল দির্ঘশ্বাস! আম্মা আজও খুঁজে ফিরে নাড়ি ছেঁড়া ধন শহীদ মুজাহিদুল ইসলামকে।

শাহমুন নাকীব ফারাবী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।