শিরোনামহীন

১.
ইউরোপীয়ান রেস্পীরেটরী সোসাইটি (ইআরএস) ইন্টারন্য়াশনাল কংগ্রেস এবৎসর যুক্তরাজ্য়ের লন্ডনএ। অনেকদিন আগে একটা এব্স্ট্রাক্ট সাবমিট করেছিলাম, পেডিয়েট্রিক পালমোনোলজী রিলেটেড। আমার লেখাটা এক্সেপ্ট হয় প্রেজেন্টেশনের জন্য়। ই আর এস’র মত একটা প্রেস্টিজিয়াস ইন্টারন্য়াশনাল ফোরামে আমার একটা প্রেজেন্টেশন থাকবে! আমি তো রীতিমতো এক্সাইটেড। অনেক খাটা-খাটনি করে প্রেজেন্টেশন রেডী করলাম। খুব যত্ন করে তাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার ছাপটা দিয়ে দিলাম। শুরু হল দিন গোনার পালা। উড়ো-উড়ো চন্চল্ হাওয়া-হাওয়া মন, দু’চোখে স্বপ্ন রঙিন।
২.
ইউ কে ভিসার জন্য় এপ্লাই করলাম। অনেক লম্ফ-ঝম্ফ দিয়ে এত্তো এত্তো কাগজ-পত্র সব যোগাড় করলাম। কম্পিউটারে বিশাল একখান্ ফরম পূরন করলাম। ট্রাভেল এজেন্সীর ছেলেটা বলল ‘স্য়ার, আপনার ভিসা তো শিওর।’ ‘ক্য়ামনে বুজলেন?’ ‘আপনার কাগজ-পত্র সব ওকে প্লাস আপনার অর্গানাইজিং কমিটির ইনভাইটেশন লেটার আছে এ্য়াজ প্রেজেন্টিং অথর। সো আপনি কনফার্ম।’ তারপরও তিনগুন বেশী টাকা খরচ করে প্রায়োরিটি ভিসা সার্ভিস নিলাম, যাতে শেষ মুহূর্তে কোন ঝামেলা না হয়। পাঁচ কার্য-দিবসে ভিসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আশ্বাষ নিয়ে ফিরে আসলাম।
৩.
পাঁচ কার্য-দিবসের শেষ দিবসের শেষ বিকেলে ফোন মোবাইলে, টিএনটি নাম্বার।’মিঃ…. বলছেন?’ ‘জ্বী, বলছি।’ ‘ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে বলছি। কিছু টেকনিক্য়াল প্রবলেম এর কারনে আপনার ভিসা সংক্রান্ত ডিসিশন উইদিন ফাইভ ডেজ এ সম্ভব হচ্ছে না। উই আর রিয়েলি সরি ফর দ্য়াট এন্ড উই নিড টু মোর ডেজ টু সল্ভ দ্য়া ইসু।’ ‘ও কে, ফাইন। দুইদিন সময় নেন, কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু প্রবলেমটা কোথায় আমি কি একটু জানতে পারি?’ ‘সরি স্য়ার,বাংলাদেশে ইউ কে ভিসার ব্য়াপারে সমস্ত সিদ্ধান্ত আসে দিল্লী থেকে। আমাদের পক্ষে আসলে এব্য়াপারে কিছু জানার বা বলার কোন স্কোপ নাই। আমরা শুধু দিল্লী থেকে পাওয়া ইনফরমেশন গুলো টাইম টু টাইম আপনাদের জানিয়ে দিই।’ বুঝলাম এবং দিল্লীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলাম।
৪.
তারপর দিন যায়, দিন আসে। দুইদিন আর শেষ হয় না। সপ্তাহ কেটে যায়। আমার সাথে বা আরও পরে যারা ভিসার জন্য় এপ্লাই করে, সবাই ভিসা পেয়ে যায়। তারা টূর প্ল্য়ান করে। শীতের কাপড় কিনে। গরম মাফলার, নরম মোজা- কত্তো কি! আমি অস্তির সময় কাটাই। কিছু জানতে পারছি না, কাউকে কিছু বলতেও পারছি না। ভিএফএস(ভিসা এপ্লিকেশন জমা দানকারী প্রতিষ্ঠান) এ যোগাযোগের চেষ্টা করি। তারাও তেমন কিছু বলতে পারে না।

একদিন দুপুরবেলা তাদের অফিসে যাই, সরাসরি ম্য়ানেজার সাহেবের সাথে কথা বলি।বেশ চট-পটে,স্মার্ট ভদ্রলোক। তিনি যা বলেন সংক্ষেপে তার সারমর্ম হল, ভিএফএস’র কাজ পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসগুলো যথাযথভাবে কালেক্ট করে জায়গামত পৌঁছে দেয়া। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার কোনটাই তাদের নাই। আমি কিছুটা উত্তেজিত ভাবে বললাম ‘দেখুন, আমি আপনাদের এখানে এপ্লিকেশন, ভিসা ফি জমা দিয়েছি। আমি তো অন্য় কাউকে চিনি না। আমি যা বলার আপনাদেরকে বলব। আই এ্য়াম গোইং টু এটেন্ড এন্ ইন্টারন্য়াশনাল সেমিনার। আই হ্য়াব এ প্রেজেন্টেশন দ্য়ায়ার। আই টুক দ্য়া প্রায়োরিটি ভিসা সার্ভিস এন্ড আই ওয়াজ সাপোজ্ড টু গেট্ দ্য়া রেজাল্ট উইদিন ফাইভ ওয়ার্কিং ডেজ। আজ এতদিন পার হয়ে গেল… স্টীল আই ডোন্ট নো হোয়াটস্ দ্য়া প্রবলেম, হোয়ট্স মাই ফল্ট।’ ভদ্রলোক তার অমায়িক হাসিটা মুখে ধরে রেখে বললেন ‘আই আন্ডারস্ট্য়ান্ড ইউর সিটুয়েশন। কিন্তু কি করব বলুন। আমাদের তো কিছু করার নাই দিল্লীর মুখপাণে তাকিয়ে থাকা ছাড়া। যাহোক, আপনার ব্য়াপারটা নিয়ে আমি আজকে আবার একটা মেইল দিব। দেখা যাক কি হয়।’ একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে আসি। মনে মনে নিজেকে সান্তনা দিই- কত রথী-মহারথী, হাতি-ঘোড়া দিল্লীর মুখপাণে তাকিয়ে থাকে তীর্থের কাকের মত, আমি তো কোন ছার! মশা-মাছি, পোকা-মাকড়।
৫.
আমার সংগের সাথীরা সবাই টা-টা, বাই- বাই বলে বিমানে উঠে পড়ে। আর আমি ক্ষনিকের স্বপ্ন আর স্বপ্ন ভংগের বেদনা নিয়ে পড়ে থাকি। অবশেষে ২০তম দিন বিকাল বেলা রিং আসে, টিএনটি নাম্বার। ‘স্য়ার, বায়োমেট্রিক্স এ কিছু ট্য়াকনিক্য়াল্ ডিফিক্য়াল্টিজ’র কারনে আপনার ভিসা এপ্লিক্য়াশন টা প্রসেস করা যাচ্ছে না। আমরা দুঃখিত। আপনাকে নতুন একটা এপ্লিক্য়াশন করতে হবে এবং বায়োমেট্রিক্ ছাপ দিতে হবে।’ আমি প্রমাদ গুনলাম। আবার এপ্লিক্য়াশন! আবার বায়োমেট্রিক্স!! সামনে টানা তিনদিন বন্ধ। বললাম ‘আচ্ছা, আমার তো পাঁচ কার্য-দিবসে ভিসা সংক্রান্ত ডিসিশন পেয়ে যাওয়ার কথা। ২০ তম দিনে এসে কেন আপনারা একথা বলছেন? আরও আগে কি বলা যেত না?’ সেই একই উত্তর ‘ইন্সট্রাক্শন ফ্রম দিল্লী।
৬.
নির্দিষ্ট দিনে ভিএফএস’এ গিয়ে নতুন করে এপ্লিক্য়াশন ও বায়োমেট্রিক ছাপ দিয়ে আসলাম। মনের গহীন কোনে ক্ষীন আশা- যদি শেষ মুহূর্তে ফ্লাই করা যায়, যদি প্রেজেন্টেশন টা ধরা যায়। আমার কলিগরা ইউ কে’র বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ায়। ফেসবুকে ছবি পাঠায়। আমি দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। দিন কেটে যায়। কংগ্রেস শেষ হয়ে আসে। আমার ছেলে জিজ্ঞেস করে ‘আব্বু তুমি লন্ডন যাবা না?’ ওর কচি মুখ আর প্রশ্ন ভরা সরল চাহনী। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। বলতে পারি না ‘বাপরে, আমার যাওয়া না যাওয়া তো আমার উপর নির্ভর করে না।
৭.
ইআরএস কংগ্রেস ৩-৭ই সেপ্টেম্বর। আমার প্রেজেন্টেশন ৪ঠা সেপ্টেম্বর। ৭ তরিখ সন্ধ্য়া বেলা চেম্বারে রুগী দেখছি। মোবাইলে রিং আসল, টিএনটি নাম্বার। ‘স্য়ার, আপনার পাসপোর্ট রেডী। আগামীকাল সকাল সাড়ে আট টা থেকে দুপুর একটা’র মধ্য়ে নিয়ে যেতে পারবেন।’ মনটা বিষিয়ে উঠল। ইচ্ছে হল কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিই। আবার চিন্তা করলাম ‘না থাক। ওকে কড়া কথা শুনিয়ে কি লাভ? ওর তো কোন ইনভল্বমেন্ট নাই।’ পরদিন হসপিটালের কাজ শেষ করে গুলশান রওনা দিই। প্রচন্ড তাপ আর অসহনীয় যানজট ঠেলে ভিএফএস’ এ পৌঁছাই দুইটা বাজার দশ মিনিট আগে। তারা আমাকে বেশ বড়-সড় একটা প্য়াকেট ধরিয়ে দেয়। সিল করা। ভিতরে কি আছে জানার বিন্দু মাত্র আগ্রহ নাই আমার। ইচ্ছে করেই লিফ্টে উঠি না, সিঁড়ি দিয়ে নামছি ধীরে ধীরে। হঠাৎ মনে হল প্য়াকেটের ভিতর তো আমার মূল্য়বান পাসপোর্ট টা থাকার কথা যাতে বিশ্বের ডজন খানেক দেশের ভিসা লাগানো আছে। ওটা ঠিক-ঠাক আছে তো? প্য়াকেট খুলে পাসপোর্ট বের করলাম। দেখি ইউ কে’র ভিসা লাগানো- ৩১শে অগাষ্ট’২০১৬ থেকে পরবর্তী ছয় মাস মেয়াদ। আমি বুঝতে পারলাম না তারা কেন আমাকে ভিসা দিল আর কেনই বা এই দেরীটা করল। কি ছিল আমার ফল্ট। যদি ৩১শে অগাষ্ট থেকে ভিসা ইফেক্টিভ হয় তাহলে কেন যেদিন কংগ্রেস শেষ ঠিক সেদিন সন্ধ্য়া বেলা পাসপোর্ট ফেরত নেয়ার কথা বলা হল। জানি, এসব প্রশ্নের উত্তর কোনদিনই মিলবে না। মিলবার নয় কারন কিছুই যে আমাদের হাতে নাই। বাংলাদেশ থেকে, আমার জানা মতে দুইজনের লেখা এক্সেপ্ট হয় প্রেজেন্টেশন এর জন্য়। কাকতালীয় হলেও সত্য়, সবার ভিসা হয় শুধু ঐ দুইজন বাদে।

ডাঃ এম এস খালেদ
সহকারী অধ্য়াপক (পেডিয়েট্রিক পালমোনলজী)
জাতীয় বক্ষব্য়াধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
মহাখালী, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।