পৃথিবীর সব বড় সন্তানদের গল্প

বাউল শাহেদ শাহ

আমি ফজলুল করিম ফিরোজ! নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবা-মায়ের পরিবারের প্রথম সন্তান। আমার পর তাদের আরও ২ সন্তান আছে। আমার ৭ বছরের ছোট এক বোন আর ৯ বছরের ছোট ভাই।

ডায়েরী লেখার অভ্যেস কোন কালেই আমার ছিল না। সত্যি বলতে আমার মত মানুষের জীবনে এত ঘটনাই ঘটে যে, এত বিচ্ছিন্ন কালকে স্মৃতিতে ঠাই দিতে হয় যে, তা থেকে বেছে ডায়েরী লেখবার মত সময় আমাদের হয়ে উঠে না।
গুছিয়ে বলার মত ক্ষমতাটা আমার কখনই ছিল না। তারপরও কিছু কথা কাউকে খুব বলতে ইচ্ছে করছে, অচেনা কাউকে। যার সাথে কোনদিন দেখা হবে না, দেখা হলেও সেও জানবে না, আমি ফজলুল করিম ফিরোজ! বড় বোনদের কথা লেখা হয়, বড় বোনরা মায়ের মত হয়, পৃথিবী মেনে নেয়। আমিও এক বাক্যে মানি। কিন্তু বড় ভাইদের গল্প খুব একটা লেখা হয় না। বড় ভাইও যে একসময় পিতার দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নেয়, এটা চিৎকার করে বলার কেউ থাকে না। হয়ত বড় ভাই পুরুষ বলে প্রকাশটা আর হয়ে উঠে না। পুরুষ – যার পরিচয় বেশিরভাগই হয় লোভী এবং ক্ষুধার্ত কিছু একটা হিসেবে। পাষবিক ব্যাপারটা মনে হয় যেন কেবল পুরুষের সাথেই মানানসই।

বুঝটা কখন থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক মনে নেই। ছোট বোনটা জন্ম হবার কয়মাস আগ থেকেই আব্বা – আম্মার বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যাই আমি। সামনের ঘরের ছোট খাটটায় ঘুমোতাম আমি। খুব ভয় হত। শুয়ে শুয়ে আল্লাহকে ডাকতাম। যেন, ভূত না আসে।

ছোট বোনটার জন্ম হবার পর থেকেই কি যেন একটা অনুভব করতে শুরু করেছিলাম আমি। চিপস চকোলেট খুব পছন্দের ছিল আমার। ও যখন বছর খানেকের মত, একদিন কি মনে করে ওর মুখে ভেঙে একটু চিপস দিলাম। মুখে দিয়ে ও যে কি একটা করল ওর মুখটা। কিছুক্ষন পর আবার হা করল। সেদিন থেকে আর কোনদিন একলা চিপস খেতে পারিনি। এরপর চকোলেট আর আচার। এক সময় পুরো প্যাকেটই ওর হাতে দিতে হত, না হলে চিৎকার করত।

একটু যখন হাটতে শিখল, আমার সাথে খুব বাইরে ঘুরতে যেতে চাইত। ক্লাশ প্রাইভেট শেষে প্রায়ই ওকে নিয়ে মাঠে খেলতে যেতাম। বন্ধুদের সাথে কত খেলা মিস করেছি ওর জন্য! কখনও কখনও খুব রাগ হত, বকতাম। কোনদিনও গায়ে হাত তুলি নি। ওর নরম শরীরে, কি করে মারি!

একদিন আমার সাথে হাটতে গিয়ে পুকুরে পরে যায় ও। আমিও খুব একটা সাঁতার জানা ছিলাম না। শুধু পানিতে ভেসে থাকতে জানতাম। তবু লাফিয়ে পরেছিলাম ওর জন্য, কাউকে ডাকার অপেক্ষা করিনি। নিজে কতটা পানি খেয়েছিলাম মনে নেই, কিন্তু ওকে উপরে না তোলার আগ পর্যন্ত অন্য কিছু ভাবিনি। প্রচন্ড ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল ও।

ওর দুই বছর পর ছোট ভাইটা হল। দুই জন আমার অনেক কিছুতেই নিজেদের অধিকার করে নিল। না, আপত্তি ছিল না আমার। আমার পাওনা কিছুটা কমে গিয়ে ওদের যখন খুশি করত, তার মাঝেই অনেক আনন্দ পেতাম। ছোট ভাইটা সবার আদরে একটু বেশিই আহ্লাদে হয়েছিল। অনেক দুষ্টুমী করত। একদিন খুব করে মেরেছিলাম। খুব রাগ হয়েছিল, কিন্তু নিজে ভেতরে কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম, আজও তা বুঝবার মত সুযোগ ওর নাই।

দিন এ ভাবেই কেটে গেল। আমি সরকারী একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স এর জন্য চলে যাই। বাড়ি থেকে খুব বেশি টাকা আনতাম না। নিজে টিউশিনি করতাম। না হলে, ওদের প্রাইভেট এর টাকা দিতে আব্বার কষ্ট হয়ে যাবে।

পড়ালেখার পার্ট চুকিয়েই একটা চাকুরী নিলাম। ছোট বোনটা বড় হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে দিতে হবে। বছর দুয়েক চাকুরী করার পর কিছু টাকা জমল। ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিলাম বোনটার। গহনা দেবার মত উপায় ছিল না আমার তখন। ছেলেরা যৌতুক নিবে না, শুধু বাইকের খুব শখ তার! আমি একটা বাইক কিনে দিয়েছিলাম জমানো আর ধার করা টাকায়। বিয়ের পরদিনে যখন ছেলে বাড়ি গেলাম, কত কথাই না শুনতে হল আমাকে। চাকুরী করি, তবু বোনকে কিছু দিলাম না!

ছোট ভাইটা সরকারী কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন পেল না। আব্বাও তখন রিটায়ার্ড করেছে। ও তখন বায়না ধরল, যে করেই হোক তাকে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে হবে। আব্বার এক কালীন পাওয়া টাকা গুলোই তখন ভরসা। আব্বা কোনভাবেই তার শেষ সম্বল হাড়াতে রাজি না।

আমি আব্বার সাথে কথা বললাম একদিন, শুধু আমি আর তিনি। ছোটবেলায় আমিও কখনও কখনও তার দোষ ধরেছি, এই করে না সেই করে না আমাদের জন্য। সেদিন আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। পিতা হবার পুরো অনুভূতিটা বুঝেছিলাম তিল তিল করে। ছোট ভাইকে ভর্তি করলাম পড়বার জন্য।

বয়সটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে করবার প্রয়োজন এবং ইচ্ছে ছিলনা বলব না, সাহস করে করা হয়ে উঠেনি। সংসারের টান, অর্থের প্রয়োজন, খরচের রশি ধরে রাখা! বিয়েটা যখন করি, ছোট ভাইটার পড়া তখন শেষের দিকে। বিয়ের অনুষ্ঠানে নিজেকে খুব বেমানান মনে হয়েছিল, মাথার চুল অনেকটাই নাই তখন।

বোনটার বাসায় আগে খুব যেতে ইচ্ছে করত। শেষ যে বার গিয়েছিলাম, ফেরবার সময় সে হাসতে হাসতে বলেছিল, ”ভাইয়া একটু ভাল কাপড় পরে আসতে পার না।” কোন উত্তর ওকে করা হয় নি। কারন, ও কোনদিনই জানার চেষ্টা করবে না – আমার ভাল পোষাক পরতে শেখার বয়সটায় আমি ওদের ভাল পোষাক পরাতে ব্যস্ত রেখেছি। নিজের কিছুই শেখা হয় নি – শুধু পোষাক হইলেই চলে ছাড়া।

ভাইটাও ভাল চাকুরী করে। বিয়ে করেছে নিজের পছন্দে। আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। বাবা-মা যখন বেঁচে ছিলেন ওর বাসায় খুব একটা যেত না। গেলেও থাকতে চাইত না।

আমার বয়স এখন ৬০ এর কাছাকাছি। আজকে আমার বড় ছেলেটার গ্র্যাজুয়েশন সিরেমনি। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাচ্ছি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাথে আমার ছোট মেয়েটা যার বিয়ের কথা চলছে।

……………
তিথি লেখাটা পুরো পড়া শেষ করল। ওর চোখের কোনাটা ভিজে উঠল। ওর বড় ভাইয়ের মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
তিথি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় যাচ্ছে ভাড়া সিএনজিতে। সিএনজির বসার জায়গার পেছনে একটা ছোট ডায়েরী পরে ছিল। সেই ডায়েরিটা থেকেই লেখাটা পড়ছিল সে।

 লেখকঃ
কৃষি গবেষক
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।