এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল , নাকি উদ্বাস্তু শিবির !

বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও তীব্র সিট সঙ্কটে মানবেতর জীবনযাপন করছে এখানকার সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ভর্তি হওয়ার পর থেকে রুম না পেয়ে তারা বসবাস করছে হলের ডইনিং এবং অতিথি কক্ষে। আবার কোন কোন হলে দেখা গেছে টিভির কক্ষ ও পত্রিকা পড়ার কক্ষেও শেষ ঠাঁই হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
258373_1
নবীন এসব শিক্ষার্থীদের বসবাসের এ চিত্র যেন উদ্বাস্তু শিবিরকেও হার মানায় এমনটাই বলছেন জাবির সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। নতুন এ পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে নিয়মিত অসুস্থ হয়ে পড়ছে তারা।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্রীদের জন্য ৭টি করে মোট ১৪টি হল রয়েছে। জাবির এই হলগুলো বর্তমানে আবাসিক সঙ্কটে বিপর্যস্ত।

জানা যায়, জাবির ১৪টি হলের সিট সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ হাজারের মত। আর ক্যাম্পাসে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। তারমধ্যে অনেক আগে পড়াশুনা শেষ করা বহু শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির ছত্রছায়ায় হলের সিট দখল করে আছেন। যার কারণে সিট সঙ্কট দিন দিন বেড়েই চলছে।
সরেজমিনে হলগুলো ঘুরে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যেসব চিত্র উঠে এসেছে:
ju2

ছেলেদের হল:
মীর মশাররফ হোসেন হল: জাবি ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় হল এটি। কিন্তু হলটিতে সিট সঙ্কট চরমে। এ হলের প্রথম বর্ষের কেউই সিট পায়নি। ফলে এ হলের প্রায় ১২০ জন নবীন শিক্ষার্থী হলের খাবারের কক্ষের মেঝেতে বিছানা পেতে থাকছে।
আর দ্বিতীয় বর্ষের যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা সিট পেয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখনও সিট পায়নি। তারা ২ জনের রুমে গাদাগাদি করে ৮-১০ মিলে থাকছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল: এ হলের প্রথম বর্ষের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী থাকছেন হলের পড়ার কক্ষে। যার ফলে হলে কোন পড়ার কক্ষ নেই। আর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা থাকছেন গাদাগাদি করে ৪ জনের রুমে ১৩ জন করে।
মওলানা ভাসানী হল: এ হলের নবীন ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য নিচতলার ১১০, ১১১, ১১২, ১১৩ এ চারটি রুম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৪ জনের জন্য তৈরিকৃত এ রুমগুলোতে প্রথম বর্ষের এসব শিক্ষার্থীরা ১৫ থেকে ২০ জন করে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ৪ জনের রুমে ৬ থেকে ৮ জন করে থাকছে।

শহীদ রফিক জব্বার হল: এ হলটিতে প্রথম বর্ষের প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী হলের ডাইনিং রুমের একপাশের মেজেতে বিছনা করে থাকে।
কামাল উদ্দিন হল: এ হলে ৬০ জন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী উঠেছে। তারা হলের ডাইনিং রুম ও হল সংসদের জন্য বরাদ্ধকৃত রুম দুটিকে গণরুম করে থাকে।

শহীদ সালাম বরকত হল: এ হলে উঠছে এবার প্রায় ৪০ জন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তারা হলের টেবিল টেনিস খেলার রুমে বসবাস করছে।
আল বেরুণী হল: এ হলে প্রায় ৫০ জন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী উঠেছে। তারা হলের কমনরুমকে গণরুম করে থাকছে। আর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ৪ জনের রুমে ৮ থেকে ১০ জন করে থাকছে।

হলগুলো ঘুরে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইলাম তাদের অবস্থা। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্রেকিংনিউজকে বলেন, “বুকভরা আশা আর স্বপ্ন নিয়ে এসেছি বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। কিন্তু এসে এখানে মেঝেতে ঘুমোতে হচ্ছে। পড়াশুনার জন্য পাচ্ছি না কোন পরিবেশ। হঠাৎ করে মেঝেতে ঘুমানোর ফলে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছেলেদের এ হলগুলোর সিট বণ্টন করে ছাত্রনেতারা। তারা একা এক রুম দখল করে থাকলেও হল প্রশাসন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। যার ফলে দিনে দিনে সিট সঙ্কট বেড়েই চলছে।

এ ব্যাপারে শহীদ রফিক জব্বার হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ এস এম আবু দায়েন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘যারা ইতোমধ্যে মাস্টার্স শেষ করছে তাদের হলে থাকার কোন বৈধতা নেই। তারপরও অনেকে থিসিস করার কথা বলে হলে থাকছে। যার ফলে সিট সঙ্কট লেগেই আছে।’
মেয়েদের হল:
প্রীতিলতা হল: মেয়েদের এ হলটিতে প্রথম বর্ষের প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী উঠেছে। যারা হলের দ্বিতীয় তলার নামাজ রুম, তৃতীয় তলার টিভি রুম, চতুর্থ তলার পড়ার কক্ষ এ তিনটি কক্ষে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বেগম খালেদা জিয়া হল: এ হলটিতে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৯০ জন ছাত্রী তিনটি গণরুমে থাকে। হলের নামাজের রুম, টিভি রুম ও জিনিসপত্র রাখার রুমকে তারা গণরুম হিসেবে ব্যবহার করে থাকছে।

জানা যায়, নামাজ রুম ও টিভি রুমে পায় ৩৫ জন করে আর জিনিসপত্র রাখার কক্ষ দুটিতে ৮ জন করে মেঝেতে বিছানা পেতে থাকছে।
শেখ হাসিনা হল: এ হলটিতে ১২০ জন নবীন শিক্ষার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা হলের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত কমনরুম, নামাজের রুম, পত্রিকার রুম এবং সাইবার রুমের মেজেতে বিছানা পেতে থাকছে।

জানা যায়, কমনরুমে ৫০ জন, পত্রিকার ও নামাজ রুমে ১০-১৫ জন করে এবং সাইবার রুমে ৪০-৪৫ জন করে থাকছে।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল: এ হলে প্রায় ৯০ জন নবীন শিক্ষার্থী উঠেছে। তাদের মধ্যে হলের ১১৪ নম্বর রুমে ৩৪ জন, ১১৩ নং রুমে ২৫ জন, ১১৫ নং রুমে ১৮ জন ও ২০১ নং রুমে ১৫ জন করে বসবাস করছে।
ফজিলাতুন্নেসা হল: এ হলটিতে এবার মাত্র ১৫ জন নবীন ছাত্রী উঠেছে। তাদেরও সিট দিতে পারেনি প্রশাসন। তারা হলের টিভি রুমকে গণরুম করে মেজেতে বিছানা পেতে থাকছে।

সুফিয়া কামাল হল: নতুন নির্মাণ হওয়া এ হলটিতে ১০-১৫ জন ছাত্রী এখন গণরুমে থাকছে। তবে শিগগিরই তারা রুম পাবে বলে জানা গেছে।
হলের এ আবাসন সঙ্কট নিয়ে ছাত্রীরা ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘জুনিয়র ব্যাচ ক্যাম্পাসে আসবে কয়েকদিন পর, অথচ আমরা এখনও গণরুমে থাকছি। একসঙ্গে এতগুলো মানুষ থাকার ফলে দিন দিন নানা ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। পড়ার জন্যও পাচ্ছি না সুষ্ঠু পরিবেশ।’
এ সমস্যা সমাধানে জানতে চেয়েছিলাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ফারুক আহমেদ কাছে। তিনি ব্রেকিংনিউজকে জানান, আবাসন সঙ্কট নিরসনকল্পে বর্তমানে দুটি হল নির্মাণাধীন রয়েছে। আশা করি, আবাসন সঙ্কট নিরসনে এই হল দুটি কার্যকর অবদান রাখবে।
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বিশ্বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। আরও বেশি হল নির্মাণ করা দরকার। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকার প্রতি বছর নতুন নতুন হল নির্মাণ করার অনুমোদন দেয় তাহলে এই সমস্যার সমাধান অতি দ্রুত লাঘব করা সম্ভব হবে।’

ব্রেকিংনিউজ.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।