সাবেক মৎস্যমন্ত্রীর ভাতিজার অবৈধ বালির রমরমা ব্যবসা , প্রশাসন নীরব!

 আমিনুল ইসলাম ইসলাম রানা, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে অবৈধভাবে বালি উত্তেলন এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা বছর জুড়ে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার রমরমা বানিজ্য চলছে। উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ ও সাবেক মৎস্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের ভাতিজা বাবলু বিশ্বাস এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করলেও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। প্রভাবশালী বালি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে কোনোভাবেই সরব হতে পারছে জেলা মৎস্য বিভাগ ও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটি। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় বেলকুচির উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধেও ভুক্তভোগীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার কডডার মোড় থেকে পোড়াবাড়ি হয়ে বেলকুচি এবং চৌহালীর এনায়েতপুর হয়ে জেলা শাহাজাদপুর ও বাঘাবাড়ির বড়ালনদী পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হুরাসাগর নদী। আগে নদী বলা হলেও এখন এটি মরা খালে পরিণত হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার অংশে হুরাসাগরের ২০ কিলোমিটার অংশে জেলা মৎস্য দফতরের খনন প্রকল্প ২০১৪ সালের জুন মাসে কাগজ-কলমে শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ সরকারিভাবে শেষ হলেও অবৈধভাবে খনন ও বালি উত্তোলন এখনও চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের সামনে সারা বছর তাদের কোটি কোটি টাকার রমরমা বালির ব্যবসা চলছে।

অভিযোগ উঠেছে, মৎস্য দফতর ও উপজেলা প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির কারণে সদরের সয়দাবাদ থেকে বেলকুচির বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন অব্যাহত থাকায় হুরাসাগর নদীর দু’পাড়ের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ নদী ব্যবস্থাপনা কমিশনের তৎপরতা এখানে দুর্বল। মৎস্য বিভাগ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশ বাহিনী জেনেও অভিযান চালাতে প্র্রায়ই গড়িমশি বা ঠেলাঠেলি করে থাকেন। বাংলা ড্রেজার ও ভলগেট দিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে যত্রতত্র বালি উত্তোলন করায় হুরাসাগর নদীর দু’পাড় ভেঙে শুধ বর্ষা মৌসুমই নয়, সারা বছরই বাড়িঘর, বসতভিটা ও কৃষি জমি ক্ষতির কবলে পড়ছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ, তার সমর্থক ও স্বজনরাসহ কয়েক ডজন সরকার দলীয় লোকজন হুড়াসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং সাবেক মৎস্যমন্ত্রীর ভাতিজা বাবলু বিশ্বাস ওরফে বাবলু মুন্সী বেলকুচির মেঘুল্লায় যমুনার পশ্চিম পাড়ে নদী তীর রক্ষা বাঁধের পাশে অবৈধ বালি উত্তোলন পয়েন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা বালু-খেকোদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা বা উৎকোচ নেওয়ায় অপকর্ম খুব একটা নজরদারিতে পড়ছে না। বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। গত বছর হুড়াসাগর নদীতে অবৈধ বালির ব্যবসা বন্ধ করতে গিয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও সাবেক জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হরেন্দ্র নাথ বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দের তোপের মুখে পড়েন। ওই সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার কিছুটা সোচ্চার হলেও পরবর্তীতে তিনিও চুপ মেরে যান বলেও স্থানীয়দের বিস্তর আক্ষেপ রয়েছে।

সম্প্রতি বেলকুচির রাজাপুর ইউনিয়নের সমেশপুর গ্রামের ভাঙন কবলিত অসহায় গ্রামবাসী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসে হুড়াসাগর নদীতে অবৈধ বালি ব্যবসা বন্ধে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এরপর দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে একদিন বিকেলে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু পাইপ ও একটি বাংলাড্রেজার জব্দ করা হয়। এরপর ফের আগের মত রাজাপুরের সমেশপুরে ও দৌলতপুরের মেঘুল্লায় ফের অবৈধভাবে বালি উত্তোলন ও বালি বিক্রি শুরু হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধানে গেলে সদরের সয়দাবাদ ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি এবং বেলকুচির মাইঝাইল, সমেশপুর, ক্ষীদ্রমাটিয়া, যোগনালা, বানিয়াগাতী ও মেঘুল্লাসহ হুড়াসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে বাংলাড্রেজার ও ভলগেট দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের দৃশ্য চোখে পড়ে। বেলকুচির মাইঝাইল ও সমেশপুরে বেশ ক’টি স্থানে হুড়াসাগরের খননকৃত বালির স্তুপ থেকে ট্রাকে করে বালি বিক্রির দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এসব পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করছেন বেলকুচি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ এবং তার সমর্থক ও পরিবারের লোকজন। চর-শমেশপুর গ্রামে এখনও বাংলাড্রেজার দিয়ে স্থানীয়রা বালি তুলে বিক্রির উদ্দেশে জমা করছেন বলেও দেখা যায়।

অপরদিকে, বেলকুচির মেঘুল্লায় নদী তীর রক্ষা বাঁধের পাশে গত ক’দিন থেকে বালি উত্তোলন বন্ধ থাকলেও কাকড়া মেশিন দিয়ে ট্রাকে বালি ভর্তি ও সরবরাহের দৃশ্য দেখা যায়।

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নদী রক্ষা কমিশনের সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বেলকুচিতে সরকার ঘোষিত কোনও বালু মহাল নেই। হুড়াসাগর নদীতে মৎস্য বিভাগের খনন প্রকল্প গত ২০১৪ সালের জুনে শেষ হলেও অবৈধ বালি উত্তোলন এখনও চলছে। এসবের বড় অংশই নিয়ন্ত্রন করছেন বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ ও সাবেক মৎস্যমন্ত্রীর ভাতিজা বাবলু বিশ্বাস। রাজাপুর, বানিয়াগাতী, ধুকুরিয়া বেড়া ও মেঘুল্লায় বালি উত্তোলনের খবর পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ৩টি স্পট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কোনও ধরনের দুর্বলতা নেই। বালুখেকোরা এতই প্রভাবশালী যে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারি না।’

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ব্রেনজন চাম্বুগং বলেন, ‘খবর পেলে আমরা প্রায়ই অভিযান চালিয়ে থাকি। এটিও দেখা হবে।’ তিনি জানান, খনন কাজের পর বালি বিক্রির প্রয়োজন পড়লে মৎস্য বিভাগকে আগে থেকেই ভূমি অফিসকে জানাতে হবে। খনন কাজের পর তাদের বালি বিক্রির নীতিমালা নেই।

বেলকুচির মেঘুল্লায় বালি তোলার বিষয়ে সাবেক মৎস্যমন্ত্রীর ভাতিজা বাবলু বিশ্বাস বলেন, ‘সরকারিভাবে আমি ইজারার জন্য কাগজপত্র তৈরি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। আমার নিজের ২০ বিঘা জমি থেকে বর্তমানে বালি উত্তোলন করছি। আমি বর্তমানে যে স্থান থেকে বালি তুলছি সেটা সরকারি নয়, ব্যক্তিগত।’

উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ বলেন, ‘টেন্ডারে কাজ পেয়ে আমরা হুড়াসাগর নদী খনন করি। খননের সময় সেসব বালি তুলে রাখা হয় সেগুলো এখন বিক্রি করা হচ্ছে। নতুন করে আর বালি তোলা হচ্ছে না। মেঘুল্লায় সাবেক মৎস্যমন্ত্রীর ভাতিজা বাবলু বিশ্বাস পাহাড় বানিয়ে সারা বছরই কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করছে। অথচ প্রশাসন দেখছে না।’

এসব বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হুরাসাগর নদী খনন কাজের প্রকল্প ২০১৪ সালের জুনে শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। অবৈধ বালি উত্তোলন হলে এখন তারা দেখবে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহামদ শামীম আলম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে আলোচনা করবো।’

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক কানরুন নাহার সিদ্দীকা জানান, ক’দিন আগে হুড়াসাগর নদীতে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আর এবিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন মৎস্য অধিদফতরের মহা-পরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ।

এদিকে ভাতিজার কার্যকলাপ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাবেক মৎস্যমন্ত্রী, বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, ‘বালুখেকোরা যে-ই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান করে সিন্ডিকেট গুড়িয়ে দেয়া দরকার।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।