একনজরে হিলারি ও ট্রাম্প পরিচিতি

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন আর রিপাবলিকবান প্রার্থী ডোনান্ড ট্রাম্প। মার্কিন দ্বিদলীয় রাজনীতির ঘূর্ণিপাক বলে দেয়, আরও অনেক প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-এর দৌড়ে অংশ নিলেও হিলারি-ট্রাম্পের মধ্যেই কেউ একজন প্রেসিডেন্ট হবেন। আজ মঙ্গলবার ৫৮তম  মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিন্টন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে যিনি বিজয়ী হবেন, তিনি ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। জরিপের তথ্য বলছে, উইকিলিকস এবং এফবিআই-এর ভূমিকার বিপরীতে সে দেশে প্রধান দুই দল ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অনাস্থা দেখা গেছে। আর প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা কম হওয়ার বিচারেও এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই দুই প্রার্থী মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনপ্রিয় প্রার্থী। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচন স্বতন্ত্র। অতীতে কখনও এতোখানি পারস্পরিক ব্যক্তি আক্রমণ ও ঘৃণার শিকার হননি কোনও প্রার্থী। এদিকে মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে প্রধান দুই দলের একটি। হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রথম নারী প্রার্থী।

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন, ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগোর এজওয়াটার হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটকাল থেকেই রাজনীতির প্রতি তার অগাধ আগ্রহ ছিল। ১৩ বছর বয়সী হিলারি ১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের পক্ষে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি ভোটিং কারচুপির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। আর তা নিয়ে প্রশ্নও তোলেন। এরপর ১৯৬৪ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্যারি গোল্ডওয়াটারের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে হিলারি ওয়েলেসলি কলেজ থেকে ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৭৩ সালে ইয়ালে ল’ স্কুল থেকে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭১ সাল থেকেই বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি মার্কিন কংগ্রেসের লিগ্যাল কাউন্সেলে বছরখানেক কাজ করার পর ১৯৭৫ সালে আরকানসাস অঙ্গরাজ্যে চলে আসেন এবং সেখানেই ক্লিনটনকে বিয়ে করেন। তিনি আরকানসাসে একাধিক আইনি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।

হিলারির প্রাথমিক রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে উঠে হাই স্কুলে তার ইতিহাসের শিক্ষকের হাত ধরে। তার বাবার মতোই ওই শিক্ষকও ছিলেন একজন কমিউনিস্ট বিরোধী। ১৯৬২ সালে শিকাগোর অর্কেস্ট্রা হলে মার্কিন লুথার কিং জুনিয়রের সঙ্গে তার একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল। বিল ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসলে, হিলারি হন ফার্স্ট লেডি। ওই সময় থেকেই তিনি আরও সক্রিয়ভাবে ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন।

ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন আলোচনায় আসেন ১৯৯৮ সালে। যখন তার স্বামী, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং মনিকা লিউনস্কির মধ্যকার যৌন সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউজের শিক্ষানবীশ মনিকা লিউনস্কির যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিল প্রথম দিকে তা অস্বীকার করলেও, পরে তীব্র বিতর্কের মুখে তিনি মার্কিন জনগণ এবং তার পরিবারের কাছে তার ‘ভুল’ স্বীকার করে ক্ষমা চান। নারী অধিকার ও বিভিন্ন ইস্যুতে নারীদের পক্ষে দাঁড়ালেও, ওই সময়ে হিলারিও তার স্বামীর পক্ষে দাঁড়ান। আর সংবাদমাধ্যমে বিলকে ক্ষমা করে দিতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি মনিকাকেই তখন দোষারোপ করেন, তিনি নাকি জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য এই বিষয়টিকে সামনে তুলে ধরেন! মনিকা আদালতে দেওয়া তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, যে সাতবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার যৌন সম্পর্ক হয়, এর মধ্যে কয়েকবার হিলারি বাসভবনেই থাকা অবস্থায়ই তারা যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।

২০০০ সালে প্রথম নারী সিনেটর হিসেবে হিলারি নিউ ইয়র্ক থেকে নির্বাচিত হন। তার প্রতিপক্ষ ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী রিক লাজিও। ওই সময়ে টুইন টাওয়ার হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশের আফগানিস্তানে আগ্রাসন এবং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ সমর্থন দিয়েছিলেন হিলারি। ২০০৬ সালের সিনেট নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান জন স্পেনসারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।

সমর্থকদের সঙ্গে হিলারি
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থিতার লড়াইয়ে বারাক ওবামার কাছে হেরে গেলেও নারী প্রার্থী হিসেবে তিনি সর্বাধিক ডেলিগেটের সমর্থন লাভ করেছিলেন। পরে ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এবার দলীয় প্রার্থিতা বাছাইয়ের দৌড়ে বার্নি স্যান্ডার্সকে হারিয়ে মনোনয়ন জেতেন হিলারি।  পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ২০১১ সালে লিবিয়ার আগ্রাসনকেও সমর্থন দিয়েছিলেন।দ্য ডুরানের প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্র কাতারে চালানের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর কাতার মুসলিম ব্রাদারহুড এবং লিবিয়ার বিদ্রোহীদের প্রতি বন্ধুসুলভ দেশ হিসেবে পরিচিত।আর উইককিলিকস-এর ফাঁসকৃত তথ্যের বরাত দিয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ডেমোক্র্যাসিন নাউকে বলেন, লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টায় ওই অস্ত্র সরবরাহের অনুমতি দিয়েছিলেন হিলারি। পরে ওই অস্ত্র আবার সিরিয়ার আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য সেদেশে সরবরাহ করা হয়েছিল। মূলত এ অস্ত্রগুলো আল কায়েদা ও আইএসসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোর হাতে পৌঁছায়। হিলারির যেসব ইমেইল ফাঁস করে উইকিলিকস, তার মধ্যে এক হাজার সাত শ’রও বেশি ইমেইলে কেবল লিবিয়া প্রসঙ্গেরই উল্লেখ আছে বলে অ্যাসাঞ্জ দাবি করেন।

তবে বিভিন্ন সময়ে হিলারির বিরুদ্ধে আইএসকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ উঠলেও বরাবরই তিনি তা অস্বীকার করেছেন। বেনগাজিতে জঙ্গি হামলার পর ২০১৩ সালে সরকারিভাবে দেওয়া সাক্ষ্যেও অস্ত্র চালানের ব্যাপারে কিছু জানার কথা অস্বীকার করেছিলেন তিনি।

এদিকে, ক্লিনটন ফাউন্ডেশন-এর বিরুদ্ধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এফবিআই-এর তদন্ত চলছে। অভিযোগ রয়েছে, হিলারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময়ে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি করা হয়েছে।এরইমধ্যে উইকিলিকসের ফাঁসকৃত তথ্যের মধ্য দিয়ে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সৌদি-কাতার সংশ্লিষ্ট তহবিল নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মার্কিন পত্রিকা ডেইলি কলার ‘ডিসগ্রেসড ক্লিনটন ডোনার গট থার্টিন মিলিয়ন ইউএস ডলার ইন স্টেট ডিপার্টমেন্ট গ্রান্টস আন্ডার হিলারি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পর তা নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ২০০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন বিল আর হিলারি ক্লিনটন। ওই সময়ে তাদের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ১৩৬.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া আফ্রিকার এইডস বিরোধী কর্মসূচির জন্য পাওয়া এক বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের লিলট রকে অবস্থিত ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের বার্ষিক আয় ১৮৪ মিলিয়ন ডলার এবং মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৫৪ মিলিয়ন ডলার।

হিলারির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯-২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত সার্ভার ব্যবহার করে ইমেইল আদান-প্রদান করেছিলেন। হিলারির ব্যক্তিগত সার্ভার ব্যবহার করে ইমেইল আদান-প্রদানের কারণে আইন ভঙ্গ হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত শুরু করে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই। জুলাই মাসে প্রথম ধাপের তদন্ত সম্পন্ন করে অপরাধের অভিযোগ থেকে এফবিআই হিলারিকে রেহাই দিয়েছিল। তবে ২৮ অক্টোবর কোমি নতুন করে হিলারির ইমেইল তদন্তের বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসকে চিঠি লিখে অবগত করেন। পরে তিনি জনসমক্ষে তদন্তের কিছু বিষয় তুলে ধরেন। সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইমেইলের বিষয়ে আদালতের আদেশ আসার পরও প্রায় ৩০ হাজার ইমেইল মুছে ফেলা হয়েছিল হিলারির ইমেইল সার্ভার থেকে। ওই মুছে ফেলা ইমেইলগুলো খোঁজ পরে অপর একটি মামলার তদন্তের সময়ে এফবিআই পেয়েছিল।

রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড জন ট্রাম্প, ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউ ইয়র্কের নিকটবর্তী কুইনসের জ্যামাইকা এস্টেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফ্রেড ট্রাম্প ছিলেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। পেনসিলভ্যানিয়া ইউনিভার্সিটির হোয়ার্টন স্কুল অব ফিন্যান্স এন্ড কমার্স থেকে তিনি ইকোনমিকস-এ ব্যাচেলর অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

৭০-এর দশকে ট্রাম্প সফলতার সঙ্গে পারিবারিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ে অংশগ্রহণ করেন। তবে ব্যবসা ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে তিনি মিস ইউনিভার্সের স্পন্সর ছিলেন। তিনি ‘এপ্রেনটিস’ নামে একটি টিভি রিয়েলিটি শো সঞ্চালনা ও পরিচালনা করেছেন। রেসলিং ম্যাচ উপস্থাপনার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। সবমিলিয়ে এখন তার মোট সম্পদের পরিমান প্রায় নয়শত কোটি ডলার।

ট্রাম্প হলিউদের কয়েকটি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ২০০৩ সালে এনবিসি-র জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘এপ্রেনটিস’-এর নির্বাহী প্রযোজক হন ট্রাম্প। প্রথমে তাকে প্রতি পর্বের জন্য ৫০ হাজার ডলার করে দেওয়া হলেও, প্রথম সিজনের পর থেকে তাকে প্রতি পর্বের জন্য ১০ লাখ দলার করে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির থেকে বলা হয় ওই সময়ে ‘এপ্রেনটিস’-এর জন্য ট্রাম্পকে এনবিসি ইউনিভার্সেল ২১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ দিয়েছিল।

জনপ্রিয় রেসলিং শো ডব্লিউডব্লিউই-এর মালিক ভিন্স ম্যাকমোহনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক বন্ধুত্ব রয়েছে। ২০০৯ সালে ম্যাকমোহন জানান, তিনি ডব্লিউডব্লিউই-এর মালিকানা ট্রাম্পের কাছে বিক্রি করেছেন।

.ট্রাম্প

২০১৬ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন জানাচ্ছে, ট্রাম্পের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৭০ কোটি ডলার। আর ব্লুমবার্গের মতে, ওই সম্পদের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার। ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ১৫৬তম ধনী ব্যক্তি আর পুরো বিশ্বের মধ্যে তার অবস্থান ৩২৪তম। তবে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, তার মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী রাজনীতিকদের মধ্যে অন্যতম ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ব্যবসায়ী হিসেবে সফল হলেও, রাজনীতিতে ট্রাম্পেরর অভিজ্ঞতা বিভ্রান্তিকর।১৯৭০-এর দশকে তিনি তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ওই পার্টিতে যোগ দেন। আর ১৯৯৯ সালে পার্টিতে সংস্কারের ডাক দেন। ২০০১ সালে রিপাবলিকান পার্টি ত্যাগ করেন। তখন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কার্যত তিনি ছিলেন একজন ডেমোক্র্যাট। ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাক্সচনে তিনি রিপাবলিকান জন ম্যাককেইনকে সমর্থন দেন। ২০০৯ সালে দল পরিবর্তন করে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি পাঁচ মাস রিপাবলিকান দলের বাইরে ছিলেন। ২০১২ সালে আবার ফিরে আসেন দলে।

২০১৫ সালের ১৬ জুন ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের প্রার্থিতা দৌড়ে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি তখন এক পৃষ্ঠার একটি আর্থিক বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন। তাতে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯০০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই ঘোষণার পর ফোর্বস জানায়, তার সম্পদের পরিমাণ এতোটা নয়, প্রকৃতপক্ষে তা ৪১০ কোটি ডলার।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর আগের যারাই প্রার্থী হয়েছেন, তারা নিজেদের আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেছেন। তবে ট্রাম্প তার আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেননি। এই আয়কর বিবরণী প্রকাশ করাটা বাধ্যতামূলক না হলেও, তা প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয়।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’। তিনি নিজেকে একজন রক্ষণশীল হিসেবে ঘোষণা করেন। মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব, অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কট্টর অবস্থান এবং মার্কিনিদের কর্মসংস্থানের সংকটকে কেন্দ্র করে তিনি তার নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন। তার কিছু নির্বাচনি সমাবেশ থেকে বিরোধীদের ওপর আক্রমণও করা হয় বলে অভিযোগ উঠে।

প্রার্থিতা বাছাইয়ের দৌড়ে অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীরা একজোট হয়ে ট্রাম্পকে বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে  মে মাসের শেষের দিকেই ট্রাম্প প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডেলিগেটের সমর্থন নিশ্চিত করেন। কিন্তু জুলাইয়ে দলীয় কনভেনশনের আগেও তাকে প্রার্থী না করার চূড়ান্ত না দিতে প্রচারণা চলতে থাকে। ওই কনভেনশনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের নাম ঘোষণা করা হয়।

আগস্টে ট্রাম্পের প্রচারণা শিবিরকে তহবিল না যোগানোর আহ্বান জানিয়ে রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কমিটি বরাবর চিঠি লিখেছেন ৭০ জনেরও বেশি রিপাবলিকান নেতা। চিঠিতে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘বিভেদ তৈরির প্রবণতা’ আর ‘অযোগ্যতা’র কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প দলকে ডোবাবেন।

এর আগে নির্বাচিত হলে ট্রাম্প ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বেপরোয়া প্রেসিডেন্ট হবেন’ উল্লেখ করে ৫০ জন রিপাবলিকান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ একটি খোলা চিঠিও লেখেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘তার (ট্রাম্পের) সাধারণ জ্ঞান কম এবং মার্কিন সংবিধান, মার্কিন আইন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি বিশ্বাসের অভাব রয়েছে।’

চলতি বছরের ৭ অক্টোবর ১১ বছর আগে ট্রাম্পের এক নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের অডিও প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন ট্রাম্প। ২০০৫ সালে ধারণ করা অডিও সাক্ষাৎকারটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ফাঁস করে। এতে দেখা যায়, মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এনবিসি-র উপস্থাপক বিলি বুশকে ট্রাম্প বলেন, ‘তারকারা নারীদের নিয়ে যা খুশী করতে পারে; আর এতে ওই নারীরাও বাধা দেবে না।’ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এক বিবাহিত অভিনেত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে তার আগ্রহের কথাও জানান। মিস ইউনিভার্সসহ কয়েকটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক ট্রাম্প সুন্দরী নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষাও জানিয়েছিলেন। ওই অডিও প্রকাশের পর ট্রাম্প এক ভিডিওতে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তার স্ত্রী মেলানিয়াও ক্ষমা চেয়ে তাকে সমর্থন দিয়েছেন। এরপর অন্তত ১৩ জন নারী সংবাদমাধ্যমের সামনে জানান, তারা বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া অবশ্য দাবি করেন, ওই নারীরা মিথ্যে বলছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ তুলে মামলা করেন ৩৫ বছর বয়সী এক নারী। জেন ডো (ছদ্মনাম) নামের ওই নারীর অভিযোগ, ১৯৯৪ সালে তার বয়স যখন ১৩ বছর ছিল, তখন তাকে ধর্ষণ করেন ট্রাম্প। ট্রাম্প অন্তত চারটি পার্টিতে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।  ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, আদালতের আদেশে ১৬ ডিসেম্বর ওই প্রাক-বিচার সভা করতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হয়েছেন। আর এই বিতর্কিত বক্তব্যের একটা লম্বা তালিকা রয়েছে।

গত নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জন নিহত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। এমনকি তিনি ২০০৪ সালে ইরাকে নিহত মার্কিন সেনাবাহিনীর মুসলিম ক্যাপ্টেন হুমায়ুন খানের পরিবার সম্পর্কেও তীর্যক বক্তব্য করেন।

ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ‘ক্ষমাহীন’ অবস্থানে রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন বিভিন্ন নির্বাচনি সমাবেশে। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে অভিবাসন সংকট ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলা হবে। আর ওই দেওয়াল নির্মাণের অর্থও নাকি মেক্সিকোকেই দিতে হবে! মেক্সিকো সফরে গিয়েও তিনি একই অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও জানিয়েছেন, ওবামা প্রশাসন যে আট লাখ অভিবাসীকে কর্মসংস্থানের অনুমতি দিয়ে একটি প্রকল্প চালু করেছিল, তা-ও তিনি বাতিল করবেন। ট্রাম্পের দাবি, অভিবাসীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মার্কিনিদের বেকারত্ব বাড়ছে। তিনি হিলারির সঙ্গে হওয়া নির্বাচনি বিতর্কেও এই বিষয়টিকে তুলে ধরেন।

নাগরিকদের অস্ত্র বহনের অধিকারের প্রশ্নেও সরাসরি সমর্থন দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে মার্কিন নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় ও বহনের বৈধতা দেওয়া হয়। হিলারি তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে ওই সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করবেন। এর বিপরীতে ট্রাম্প বলছেন, ‘হিলারি সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বিলুপ্ত করতে চান। নির্বাচিত হলে তিনি তার পছন্দের বিচারকই বেছে নেবেন। আপনারা কিছুই করতে পারবেন না। তবে এখানে দ্বিতীয় সংশোধনীর পক্ষের লোকজন থাকতে পারেন।’

দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মস্থান নিয়ে মন্তব্য করে আসছিলেন ট্রাম্প। ওবামার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে নয় বলে প্রচার অভিযান চালানো হয়।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বশেষ নির্বাচনি বিতর্কে ট্রাম্প প্রতিপক্ষ হিলারিকে ‘নোংরা নারী’ বলে উল্লেখ করেন। অপরদিকে, ট্রাম্পকে হিলারি সমালোচনা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ‘পুতুল’ বলে। এর আগে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘ওবামার চেয়ে অনেক যোগ্য প্রেসিডেন্ট পুতিন।’ আর হিলারি, ডেমোক্র্যাট শিবির এবং মার্কিন প্রশাসন আগে থেকে দাবি করে আসছে উইকিলিকসের ইমেইল ফাঁসের সঙ্গে রাশিয়া জড়িত।

নির্বাচনি বিতর্কে নারী ও এলজিবিটি সম্প্রদায়ের অধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থানের কথা জানান হিলারি ক্লিনটন। তবে ট্রাম্প গর্ভপাত ও এলজিবিটি অধিকারের বিপক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এই প্রশ্নে অবশ্য অন্য রিপাবলিকানদের সমর্থনও পেয়েছেন ট্রাম্প। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাতকে বৈধ করার যে রুলিং রয়েছে সেটি পরিবর্তনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মার্কিন রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বিতর্কটির জন্ম দিয়ে  ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল আশানুরূপ না হলে তা না মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফলাফল যথাযথ হয় কিনা, তা খতিয়ে দেখে তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাম্প আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, ‘এবারের নির্বাচনে ১০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিও ভোট দেবেন।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘এখানে এমন সব মানুষ ভোট দিচ্ছেন, যারা এমনকি আমাদের দেশের নাগরিকও নন।’ এর আগে কোনও প্রার্থীকে এমনভাবে নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়নি।

এমনি বহু বিতর্কিত অবস্থানের পরও এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে যাচ্ছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সূত্র: ফক্স নিউজ, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, বস্টন গ্লোব, সিএনএন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।