নাফ নদীর ওপারে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ ‘আমাদের বাঁচাও’ !

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর ত্রিমুখী নৃশংসায় দিশেহারা রোহিঙ্গাদের টেকনাফের নাফ নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে আর্তনাদÑ ‘আমাদের বাঁচাও’। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর তাড়া খেয়ে এখন হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসছে। একটু আশ্রয়ের জন্য হাতজোড় করে মাথা গোঁজার ঠাই চাইছেন। নাফ নদীর উভয় পাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের কান্নায়। স্বদেশে অসহনীয় জুলুমে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে জল ও স্থলপথে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। সীমান্তে নাফ নদী ও সাগরে মিয়ানমার-বাংলাদেশের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করছেÑ রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে।

এ দিকে বিজিবি মহাপরিচালক বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে টহল জোর করা হয়েছে।

আবার মিয়ানমার সীমান্তের অবস্থা ভয়াবহ। নৌ, স্থল, আকাশ পথে চলছে নৃশংস আক্রমণ। ফলে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। রাখাইন প্রদেশজুড়ে বিশেষ করে উত্তর মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় আতঙ্ক কাটছে না। সে দেশের সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রাকারী বিভিন্ন বাহিনীর দমন পীড়ন ও নির্যাতনে অসহায় রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। নাফ নদী ও সাগরে ভাসছে নারী-পুরুষ ও শিশু বোঝাই অনেক নৌকা। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা রাখাইন প্রদেশ ছাড়ার ল্েয বিভিন্ন সীমান্তে ভিড় করে আছে। তাদের প্রধান গন্তব্য বাংলাদেশ। কিন্তু বিজিবি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপর।

সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন সূত্রে এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যে তথ্য দিচ্ছেন তা রীতিমতো লোমহর্ষক। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার এক নারী বলেন, ‘গত শনিবার মিায়ানমার পুলিশ ও সেনাবাহিনী পাড়ায় ঢুকে বর্বরতা চালায়। বাড়িঘরে আগুন দেয়। পুরুষদের ধরে নিয়ে যায়। কোলের শিশুদের কেড়ে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করছে। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্বামী ও ছেলেকে খাবার সময় তুলে নিয়ে সামনেই হত্যা করেছে। সেই ভয়াবহ নির্যাতন-নির্মম গণহত্যা, অমানবিক অত্যাচার ও তাণ্ডবে টিকতে না পেরে প্রাণভয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে তিন মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিই। এমন বর্ণনা দেন নদী-পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তিন দিন পর আশ্রায় নেয়া মিয়ানমারের মংডুর কেয়ারিপাড়ার সুরা আকতারে (৬০)। তার চোখমুখে অজানা শঙ্কা আর আতঙ্ক। শুধু সুরা আকতার নন, গতকাল ভোরে এক নৌকায় এসেছেন আরো ১৭ নারী, শিশু ও ৪ পুরুষ। নাফ নদীতে আরো ১০-১২ নৌকায় বহু মানুষ ভাসতে দেখেছেন বলে জানান তিনি। প্রতিটি নৌকায় নারী-শিশু বেশি ছিল।

আরেক নারী আরেফা বেগম বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী ধরতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা ধর্ষণ-নির্যাতনে লিপ্ত। তারা পাড়া ঘিরে কিশোরী-যুবতীদের ধর্ষণ করছে। নির্যাতন চালাচ্ছে। স্বর্ণালঙ্কার, টাকা লুটে নিচ্ছে। এরপর ঘরে আগুন দিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে গুলি করে, গলা কেটে হত্যা করছে। মায়ের কোল থেকে শিশুদের কেড়ে নিয়ে আগুনে নিপে করছে।

এ দিকে মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাতের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যাবেণ করতে কক্সবাজারে এসেছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। তিনি গতকাল বিকেলে টেকনফের শাহপরীদ্বীপসহ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।

এর আগে দুপুরে কক্সবাজারের টেকনাফ বন্দর রেস্ট হাউজ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। যা এখনো চলছে। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঢালাওভাবে যেভাবে অনুপ্রবেশের কথা বলা হচ্ছে তা সঠিক না।
তিনি বলেন, এক দেশ থেকে আরেক দেশে লোক বৈধভাবে আসতেই পারেন। যদি বৈধভাবে না আসেন তাহলে আমাদের অনেক সমস্যা থেকে যায় সীমান্তে। তাই আমরা সীমান্তে টহল জোরদার করেছি।
বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এ অবস্থায় রাখাইন প্রদেশ থেকে বৈধ পাসপোর্টবিহীন কাউকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, বিজিবির কড়া নজরদারি সত্ত্বেও দালালদের সহায়তার সীমান্তের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করেছেন। এসব দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ এবং প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েনের কথা জানান তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে যেসব রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে, তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে সে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি গত দু’দিনে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ৪১ রোহিঙ্গাকে আটকের পর স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। নাফনদী থেকে রোহিঙ্গাবাহী চার নৌকা ফেরত পাঠনো হয়েছে।

নয়া দিগন্ত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।