নাসিরনগরে গ্রেফতারের নামে হয়রানি, ৭ গ্রাম পুরুষশূন্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাচাইবাছাই না করেই ও বেপরোয়াভাবে যাকে-তাকে গ্রেফতার করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। মাইক্রোবাসচালক, রিকশাচালক, পিঠা বিক্রেতা, দিনমজুর থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া পেশার মানুষেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রেফতার আতঙ্কে নাসিরনগরের সাতটি গ্রাম সন্ধ্যার পর পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে। তবে গণগ্রেফতার বা হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাসিরনগরের ঘটনার পর উপজেলার শ্রীঘর, বুড়িশ্বর, আশুরাইল, দাঁত মণ্ডল, নূরপুর, কুলিকুন্ডা ও হরিপুর এই সাত গ্রামে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে পুলিশ বেপরোয়াভাবে যাচাই বাছাই না করে নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করছে। তাই আতঙ্কগ্রস্ত গ্রামবাসী রাতের বেলায় খোলা ধানি জমি কিংবা হাওর অঞ্চলের দুর্গম বাড়িঘরে লুকাচ্ছে, অনেকে নৌকায় করেও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি গ্রামে সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। পুরো এলাকায় এখন পুলিশ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

উপজেলার ফুলপুর গ্রামের মাইক্রোবাস চালক মো. জুয়েল মিয়ার সমন্ধি (স্ত্রীর ভাই) শৈকত আহমেদ ইস্তেহার বলেন, ‘আমার বোনের জামাই জুয়েল মিয়া হামলার ঘটনার দিন নাসিরনগর সদরে অবস্থান করছিল। হামলার সর্ম্পকে সে কিছুই জানতো না। সে যখন সেদিন দেখতে পেল একদল লোক লাঠি সোটা নিয়ে উপজেলা সদরে এসে বাড়িঘর ভাঙচুর করছে, তখন সে তার পূর্ব পরিচিত হিন্দু বন্ধুদের বাড়িঘর রক্ষার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি একাধিক হিন্দু পরিবার দেখেছেও। কিন্তু কোনও কারণ ছাড়াই গত ৪ নভেম্বর শুক্রবার রাতে পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম। পুলিশ বলছে ভিডিও ফুটেজ দেখে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ জুয়েলের ব্যাপারে কোনও ভিডিও ফুটেজ ছিল না।’

নূরপুর গ্রামের সৈয়দ আশিক মিয়া বলেন, ‘আমার বোনের জামাই ৪ নভেম্বর উপজেলার হাওর এলাকা চাতলপাড় থেকে নূরপুর আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তিনি কাতারপ্রবাসী। গত মার্চ মাসে দেশে আসেন। কিন্তু ৪ নভেম্বর রাতে বাড়িতে এসে হঠাৎ দরজা নক করে একদল পুলিশ। দরজা খোলার পর পুলিশ তাকে বলছে বের হয়ে আসেন। তখন তিনি ভাবলেন কারও বাড়ি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য হয়তো পুলিশ তাকে ডেকে থাকতে পারেন। তখন তিনি পুলিশকে বললেন আমি এই বাড়ির জামাই, কাউকে আমি চিনি না। পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে গেলেন। পরের দিন তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়।’

কলেজ মোড় এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, ‘নূরপুর গ্রামের গণিমিয়া কলেজ মোড়ে পিঠা বিক্রি করতো। শুনলাম তাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সে হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল না।’
নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় গণগ্রেফতারের অভিযোগ

গণগ্রেফতার সর্ম্পকে জানতে চাইলে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু জাফর বলেন, ‘পুলিশ কাউকে হয়রানি কিংবা গণগ্রেফতার করছে না। ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে গ্রেফতার করা হবে না।’

বেশ কয়েকটি গ্রাম গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে কিনা জানতে চাইলে ওসি জাফর বলেন, ‘নিরপরাধ মানুষ অবশ্যই বাড়িতে থাকবে। অপরাধীরা পালিয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’

উল্লেখ্য ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় হামলাকারীরা উপজেলা সদরের ঘোষপাড়া, নমশুদ্র পাড়া, কাশিপাড়া, দাসপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০টি মন্দিরসহ শতাধিক বাড়িঘরে লুটপাট চালায় ও ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পরের দিন ৩১ অক্টোবর সোমবার স্থানীয় গৌর মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী এবং দত্তবাড়ির কাজল জ্যোতি দত্ত বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় অজ্ঞাত নামা ১ হাজার থেকে ১২শ’ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার চার দিনের মাথায় ৩ নভেম্বর দিনগত রাতে আবারও একই এলাকার ৬টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই চারটি মামলায় কথিত ভিডিও ফুটেজের রেফারেন্স উল্লেখ করে মোট ৭৮ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে বিভিন্ন মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। রবিবার (১৩ নভেম্বর) আরও একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে।

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।