গুলিস্তানে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রধারী দুই ছাত্রলীগ নেতা – অবৈধ দোকান উচ্ছেদে সংঘর্ষ

রাজধানীর গুলিস্তানে গতকাল বৃহস্পতিবার ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদের সময় হকারদের সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মচারী ও একদল যুবকের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকটি ফাঁকা গুলিও হয়েছে। দুই যুবকের হাতে দেখা গেছে পিস্তল ও রিভলবার। তাঁদের একজনকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা গেছে।
171db82c2054d9fcc9ee4d113a340f9a-untitled-21

সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হলেও নগরের ব্যস্ততম ওই এলাকায় চলাচলকারীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রাজধানীর ভেতরে ও আশপাশের গন্তব্যে চলা গণপরিবহনের প্রধান কেন্দ্র গুলিস্তান। এ সংঘর্ষের কারণে এখানে প্রায় তিন ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। আশপাশের সড়কগুলোতেও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
24ee6caf5bc0c07f522056f7b737c1cc-photo-3

আগ্নেয়াস্ত্রধারী দুজনের মধ্যে একজন হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন। অন্যজন ওয়ারী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান। এঁদের মধ্যে সাব্বির হোসেন দাবি করেন, তিনি সেখানে গেলেও তাঁর সঙ্গে কোনো অস্ত্র ছিল না।

আর রাত পৌনে একটা পর্যন্ত পাঁচবার আশিকুরের মুঠোফোন নম্বরে ফোন করলেও তিনি ধরেননি।

সংঘর্ষের পর মেয়র সাঈদ খোকন ঘটনাস্থলে যান। তিনি উপস্থিত সংবাদিকদের বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান চলবে৷ এতে কেউ বাধা দিলে কঠোরভাবে তাদের দমন করা হবে৷

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ডিএসসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল মার্কেটে অভিযান চালান। সেখানে চলার পথে দোকান বসানো নয়জনকে মোট ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জব্দ করা হয় ওইসব অবৈধ দোকানের মালামাল। পাতাল মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এই উচ্ছেদে বাধা দেওয়ায় ও ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে অসদাচরণ করায় তাঁকে আটক করে নগর ভবনে নিয়ে যান আনসার সদস্যরা৷

সাব্বির হোসেন,আশিকুর রহমানআনোয়ারের মুক্তির দাবিতে বেলা দেড়টার দিকে মিছিল নিয়ে নগর ভবনে যান হকাররা৷ এঁদের কয়েকজন মেয়রের দপ্তরে ঢুকে পড়েন। তখন ডিএসসিসির কয়েকজন কাউন্সিলর, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা তাঁদের নগর ভবন থেকে সরিয়ে দেন৷ এরপর ডিএসসিসির কর্মচারীরা হকিস্টিক, বাঁশ ও লাঠি নিয়ে হকারদের ধাওয়া করেন। এতে হকাররা গুলিস্তানে ফিরে আসেন।
এদিকে বেলা দুইটার দিকে ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের দক্ষিণে সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন ডিএসসিসির কর্মী, তিনটি বুলডোজার ও চারটি পিকআপ। বুলডোজারগুলো অবৈধ দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগেই অনেক হকার মালামাল সরিয়ে নেন। উচ্ছেদের সমর্থক একদল যুবক বাঁশ, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে হকারদের পেটাতে থাকেন। হকাররা লাঠি, বাঁশ নিয়ে তাঁদের প্রতিরোধ করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এতে কিছুক্ষণের জন্য উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত থাকে। এ সময় হকারদের বিরুদ্ধে মিছিল করেন লাঠি, বাঁশ ও হকিস্টিকধারী যুবকেরা। হকারদের ভেতর থেকে কেউ ফাঁকা গুলি ছোড়েন। জবাবে মিছিলকারীদের মধ্যে দুই যুবককেও পিস্তল ও রিভলবার দিয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হকাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পথচারীরা দিগ্‌বিদিক ছুটতে থাকে। এ সময় পথচারীদের কেউ কেউ হামলার শিকার হয়।

পরে বেলা আড়াইটার দিকে সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনের সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। হকাররা আবার সংগঠিত হয়ে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে ইটপাটকেল ছোড়েন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন৷ তাঁদের মধ্যে ডিএসসিসির কর্মচারী মো. সোহাগ ও হকার মুরাদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

জলকামান ও সাঁজোয়া যান নিয়ে মতিঝিল বিভাগের বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র‍্যাব সংঘর্ষস্থলের আশপাশে ছিল। তবে তারা তাদের অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত থেমে থেমে চলা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ পাতাল মার্কেটের সামনে থেকে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বিকেল চারটার দিকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার এস এম শিবলী নোমান। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়নি। তারা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিস্থিতি এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ ঘটনায় কোনো মামলা কিংবা কাউকে আটক করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার অভিযোগ করেন, উচ্ছেদ অভিযানের সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল কর্মী হকিস্টিক, বাঁশ ও লাঠি দিয়ে হকারদের পেটান। তাঁরা হকারদের বিরুদ্ধে মিছিলও করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবলীগের (দক্ষিণ) একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা উচ্ছেদ অভিযানে সহায়তা করতে গিয়েছিলেন। তখন হকারদের মধ্য থেকে গুলি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় গুলি হয়েছে কি না, জানতে চাইলে মেয়র সাঈদ খোকন প্রথম আলোকে বলেন, ওই সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। গুলি হয়েছিল কি না, সেটাও তিনি জানেন না।

ভ্রাম্যমাণ আদালত এরপর গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর ও ঢাকা ট্রেড সেন্টার দক্ষিণ, ফুলবাড়িয়া বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডের চারপাশ ও সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে থেকে অবশিষ্ট চার শতাধিক অবৈধ দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেন। এ সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ থাকায় হকাররা বাধা দেননি৷ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাঈদ, মামুন সরদার ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ৷
আবু সাঈদ বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে অভিযান চালাচ্ছিলেন। আনোয়ার হোসেনের বাধার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

খালিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, উচ্ছেদ অভিযান শেষে মুচলেকা নিয়ে পাতাল মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে৷ গুলিস্তানে আর হকার বসতে দেওয়া হবে না৷

উচ্ছেদ অভিযান শেষে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, হকাররা পথ আটকে রাখায় রোগী বহনকারী গাড়ি চলাচল, শিশুদের স্কুলে যাতায়াতসহ পথচারীদের চলাচলে বাধার সৃষ্টি হচ্ছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে নাগরিকদের অসুবিধা তিনি মেনে নেবেন না। উচ্ছৃঙ্খলভাবে কেউ রাস্তা দখল করতে চাইলে তাকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। তিনি বলেন, গুলিস্তান এলাকা দিয়ে লাখো মানুষ চলাচল করে। এ এলাকার ফুটপাত পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিদিন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাসহ যা যা করা দরকার সব করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবু আহমেদ মন্নাফী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন৷

prothom alo

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।