না সংলাপ না নির্বাচন

পুরো ঢাকা শহর আলোকজ্জল হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে। চমক দিয়েই এলেন দলের নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। জনগণের দল হিসেবে এতে মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। সংসদ ফের কার্যকর হয়ে উঠবে এমন আশা দেখতে পায় মানুষ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বললেন, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন আর করবেন না। সাবেক প্রেসিডেন্ট বি চৌধুরী এজন্যে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ও পারস্পরিক সৌহার্দের পরিচয় দিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিজেও সাংবাদিকদের বলেছেন,‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের মতের বিভেদ থাকতে পারে। তবে রাজনীতিতে সৌজন্য হারিয়ে যাবে, এটা ঠিক না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা কাজের পরিবেশ থাকা ভালো। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোরও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে, আমিও তাদের শুভেচ্ছা জানাই।’

এধরনের মন্তব্যে মানুষের প্রত্যাশার পারদ আরো চড়ে যায়। তারা এধরনের বক্তব্যকে ইঙ্গিত মনে করেন যে সত্যিই রাজনীতিতে হয়ত ফের সংলাপ ফিরে আসবে, সকল দলের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। একই ধরনের আশায় হয়ত ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে ভুল বুঝতে পেরে পরবর্তী স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নেয়, তাতে দলটির আরো সন্দেহ বেড়ে যায় যে আগামী নির্বাচনও হয়ত ৫ই জানুয়ারির রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে।

এই রাজনৈতিক এ দোলাচল থেকে বের হয়ে আসার একটা উপায় শুধু যে সকল দলের জন্যে জরুরি, তা নয় বরং বর্তমান সরকার যে উন্নয়নের গতিধারায় দেশকে নিয়ে গেছে তার স্থিতি ও স্থায়ীত্ব পেতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা। তাহলে কি ফের সংলাপের প্রশ্ন এসে যায় এবং এখান থেকেই সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে প্রশ্ন করেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো সুযোগ আছে কি না?

পত্র পাঠ বিদায় কিংবা সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুত্র হারানোর শোকে কাতর বেগম খালেদা জিয়াকে শোক জানাতে গেলে, দরজা খোলেনি। এই দরজা চিরতরে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এ দরজা খোলার দায়িত্ব কার? ভুল যে করে শোধরাবার দায়িত্ব অনেকটা তার। কেউ যদি বারবার ভুল করে তাহলে জনগণকে তা শোধরাবার সুযোগ নিতে হয়।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির কাজ এখন প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে’ আর বিএনপির তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতায় রয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে তিলক আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের কপালে এঁটে আছে তা কারো জন্যে শোভাবর্ধক নয়। কারণ এ অবস্থায় সংসদ কার্যকর হয়ে উঠতে পারছে না। পারছে না নির্বাচন কমিশনও স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করতে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর যতগুলো নির্বাচন যেভাবে হয়েছে তাতে এ নির্বাচন কমিশনে আর কেউ আস্থা পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হলেও এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে তা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভেতর দিয়েই। ইরাকের মসুলের চারপাশ যৌথবাহিনী আইএস জঙ্গিদের ঘিরে ফেলার পর জঙ্গিরা নতুন কোনো স্থান পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনের মত দেশগুলো বিষয়টি মাথায় রেখে সাবধান হয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। জঙ্গিদের প্রতি সরকারের পাশাপাশি সকল রাজনৈতিক দল ও এদেশের মানুষের ‘জিরো টলারেন্স’ থাকার পরও প্রতিবেশি একটি দেশ থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা অব্যাহত রাখার জন্যে অপচেষ্টা রয়েছে।

এক্ষেত্রে শুধু উন্নয়ন নয়, চিরতরে জঙ্গি তৎপরতা সমূলে বিনাশ করতে রাজনৈতিক সমঝোতা যখন জরুরি তখন বড় রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা না হয়ে উঠতে পারলে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে অশুভ শক্তি। তাহলে নির্বাচন, সংসদ ও গণতন্ত্র কি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে? এর দায় রাজনৈতিক দলগুলোকে যেমন নিতে হবে তেমনি এ অসহ্য বোঝা বইতে হবে জনগণকে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে আটকে থেকে।

অথচ ভোটের অধিকার এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণ মিলেই অনেক কষ্ট করে নিয়ে এসেছিল। এখন সর্বদলীয় সরকার বা আস্থার নির্বাচন কমিশন ফের সেই ভোটের অধিকারে এদেশের মানুষের উত্তরাধিকারকে ফিরিয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক পথপরিক্রমা তৈরি করেছে, তা অনুসরণ করছে পাকিস্তান। আমরা কি সেই তিমিরেই পড়ে থাকব? সন্ত্রাস কবলিত একটি দেশে সকল দল মিলেমিশে নির্বাচন করে উদাহরণ সৃষ্টি করছে, বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে থাকবে কেন?

রাজনৈতিক এ বন্ধ্যাত্ব থাকলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ কোনো কাজে আসবে না। এর প্রমাণ হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশ কেবল দুই ধাপ এগিয়েছে। প্রতিবেশি দেশ ভারত এক ধাপ আগালেও আগের বছর ১৩ ধাপ এগিয়েছিল বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আমলাদের পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশে এমন নির্দেশনা অনুপস্থিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।