স্থানীয় এমপি ও আওয়ামিলীগ নেত্রীর বিরোধের জেরে ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় মন্দির ভাংচুর! বিডিটুডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

গত শুক্রবার কাবা শরীফের একটি ছবির উপরে একটি মুর্তির ছবি সেটে দিয়ে তা ফেসবুকে ছাড়ে বাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার রসরাজ। সে হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে।

এই ছবি রসরাজের ফেসবুক বন্ধুতালিকায় থাকা স্থানীয় কয়েকজন মুসলমানের দৃষ্টিগোচর হলে তারা এর প্রতিবাদ জানান এবং এভাবে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। ‘এক হিন্দু যুবক কাবা শরীফের অবমাননা করেছে।’

স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় মুসলমানরা ক্ষিপ্ত হন। আস্তে আস্তে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শনিবার এলাকাবাসী রসরাজকে ধরে পুলিশে দেন এবং তার শাস্তি দাবি করেন।

শাস্তি নিশ্চিত করতে স্থানীয় একটি সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত রোববার নাসিরনগর সদরে বিক্ষোভের ডাক দেয়। অন্য একটি ইসলামি সংগঠনও একই রকম বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে।

রোববার সকাল ১০টার দিকে সমাবেশের জন্য সংগঠনগুলোর লোকজন জড়ো হতে শুরু করেন সদরে। আয়োজক সবাই দাঁড়ি-পাঞ্জাবি-টুপিওয়ালা লোকজন। স্থানীয় আলেমসমাজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।
সমাবেশের এক পর্যায়ে স্থানীয় মানুষজনও জড়ো হতে শুরু করলে কয়েক হাজার লোকের সমাবেশ হয়ে যায়।
দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ করে একদল যুবক লাঠিসোটা নিয়ে পাশের হিন্দু বসতিতে হামলা চালায়। তারা এসময় ওই এলাকার বেশ কয়েকটি মন্দিরে ভাঙচুর করে।
রোববার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তদন্ত করে র‌্যাবের একটি টিম। সেখানে থাকা একজন কর্মকর্তা বলেন, ৪০ থেকে ৫০টি বাড়িতে পুরোদমে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। লোকজনকে মারধর করা হয়েছে। তার দেয়া তথ্য মতে, চারটি মন্দিরের সবগুলো মুর্তি ভেঙে চুর্ণবিচুর্ণ করা হয়েছে।

ঘটনার কারণ সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক হিসেবেই ধরা পড়েছে। স্থানীয় এমপি এবং একজন আওয়ামী লীগ নেত্রীর মধ্যকার দীর্ঘ দিনের বিরোধের জেরে স্থানীয় হিন্দু পরিবারগুলোর ওপর ক্ষোভ মেটানো হয়েছে।’
ওই কর্মকতা বলেন, হিন্দু লোকজন বিভিন্ন নির্বাচনে নেত্রীকে সমর্থন দেয়ায় এমপির লোকজন তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। রসরজের ঘটনার সুযাগে গত দুদিন ধরে এলাকায় এলাকায় উস্কানি দেয়া হয় সাধারণ মানুষকে। এবং সেই উস্কানি দিয়ে আবার নিজেরা হামলা চালিয়ে সেটিকে ‘বৈধতা’ দেয়ার চেষ্টা করেছেন এমপি।
র‌্যাবের এই কর্মকর্তার ভাষ্যের সাথে মিলে যাচ্ছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দেয়া তথ্যও। বিডিনিউজ তাদের “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মন্দির-ঘরবাড়ি ভাংচুর-লুটপাট” শিরোনামে খবরটির মাঝখানে লিখেছে, “স্থানীয়রা জানায়, হামলাকারীদের বেশিরভাগই যুবক বয়সের এবং তাদের পরনে ছিল প্যান্ট-শার্ট।”
যদিও বিডিনিউজ তাদের সংবাদের মূল সুরে সমাবেশকারী ইসলামী সংগঠনগুলোর নাম জিইয়ে রেখেছে।

কালের কণ্ঠও একই রকম তথ্য দিয়েছে, “ হামলাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই যুব বয়সের ও তাদের পরণে প্যান্ট শার্ট ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। কেউ একজন ঘোড়ায় চড়ে এসে হামলা চালান।”
প্রথম আলো তাদের “নাসিরনগরে হিন্দু বাড়িঘরে ভাঙচুর-লুটপাট” শিরোনামে সংবাদে লিখেছে–
“ইউএনও চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় কওমি মাদ্রাসা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নেতারা উপজেলা সদরে সমাবেশ করার অনুমতি নিয়েছিলেন। সমাবেশ চলার সময়ে এই হামলা হয়েছে। তবে সমাবেশের কেউ হামলায় অংশ নেয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এলাকায় বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”

উপরের তথ্যগুলো থেকে মোটামুটি পরিস্কার নাসিরনগরে বিক্ষোভ সমাবেশ পাঞ্জাবিওয়ালা আলেমরা আয়োজন করলেও, হামলা চালানো লোকজন পাঞ্জাবি পরা ছিলো না, শার্ট-প্যান্ট পরাবস্থায় ছিল। এতে স্পষ্ট হয়, সমাবেশ থেকে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। ইউএনও’ও তাই বলছেন। যদিও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা সমাবেশকারী এবং স্থানীয় জামাত শিবিরতে দায়ী করেছেন।

বিডিটুডে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।