বদির এমপি পদ নিয়ে আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে দুর্নীতির মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়ার পর তার সংসদ সদস্য পদে থাকা না থাকার বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা পাল্টাপাল্টি যুক্তি তুলে ধরেছেন। বুধবার ঢাকা মহানগর আদালতে রায় ঘোষণার পর দুদকের আইনজীবীসহ কয়েকজন বলেন, তিনি সংসদ সদস্য পদে নেই। অন্যদিকে পাল্টা যুক্তিতে বলা হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হলেই কেবল বদির সংসদ সদস্য পদ বাতিলের প্রশ্ন আসবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান  জানিয়েছেন, রায় ঘোষণার পরই বদি সংসদ সদস্য পদে নেই। তিনি জানান, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, ‘নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকলে, তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন।’ সুতরাং রায় ঘোষণার পর থেকে তিনি আর সংসদ সদস্য পদে নেই।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বদি আপিল করলেও তার সংসদ সদস্য পদ থাকার কোনো কারণ নেই। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তার পদ থাকার কথা নয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কয়েকজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের পর আমরা হাইকোর্টে গিয়ে পক্ষে রায় পাইনি। কারণ, আদালত বলেছেন তারা সাজাপ্রাপ্ত।

এদিকে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আওয়ামীপন্থী সিনিয়র আইনজীবীরা। তারা মনে করেন, আইনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য পদ নিষ্পত্তি হতে হলে আপিল বিভাগের রায়ে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হতে হবে বদিকে।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা যাবে না । সংবিধানে বলা আছে, একজন ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং দণ্ড ভোগ করার পর অন্তত পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য পদে অযোগ্য হবেন।

এ কারণে আপিলের আগেই নৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে বদি নিজে অথবা তার দল ব্যবস্থা নিতে পারে উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী বলেন, নৈতিকতার ব্যাপার আছে এখানে। নৈতিকতার কারণে দুভাবে হতে পারে, তিনি নিজে পদত্যাগ করতে পারেন, আবার তাকে দল থেকে পদত্যাগ করতে বলা হতে পারে। কিন্তু আইনগতভাবে আপিলের সুযোগ আছে এবং সর্বশেষ চূড়ান্তভাবে সাজা বহাল না থাকা পর্যন্ত সংসদ সদস্য পদ থাকবে।

উল্লেখ্য, নৈতিকতার প্রশ্নে এর আগে দুই মন্ত্রীর বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। মীর কাসেম আলীর রায় নিয়ে বিচারপতি ও বিচার বিভাগ নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে দণ্ডিত হন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ চলতি বছরের ২৭ মার্চ তাদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন। দণ্ড ঘোষণার ছয় মাসেরও বেশি সময় চলে গেলেও তারা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে দুর্নীতির দায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে ১৩ বছর কারাদণ্ড দেন নিম্ন আদালত। পরে হাইকোর্ট ওই সাজা বাতিল করেন। তবে হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। আবার ১৩ বছরের সাজাই বহাল থাকে। এখনো তিনি মন্ত্রী পদে রয়েছেন।

এখন সংসদ সদস্য বদির ক্ষেত্রেও আপিলে দণ্ড স্থগিত থাকার যুক্তি দিয়েছেন আইনজীবীরা। যুক্তিতে বলা হচ্ছে, মাত্র দণ্ড পেলেন বদি, আপিলের রায়ের পরই তার সংসদ সদস্য পদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ই চূড়ান্ত নয়। তিনি বলেন, বদি আপিল বিভাগে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সায়েদুল হক সুমন বলেন, দণ্ডিত এমপি আপিল করার পর তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে না।

নিম্ন আদালতে বদির আইনজীবী হিসেবে লড়াই করা নাসরিন সিদ্দিকী লিনা এরই মধ্যে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই মামলায় এফআইআরের সঙ্গে অভিযোগপত্রের তথ্যে গরমিল রয়েছে। এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। আমরা অবশ্যই উচ্চ আদালতে আপিল করব।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ মনোনীত মহাজোট সরকারের কক্সবাজার-৪ (টেকনাফ-উখিয়া) আসনের আলোচিত সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে দুদক মামলাটি দায়ের করেছিল দুই বছর আগে। মামলায় অভিযোগ ছিল অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের। তবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের রায়ে খালাস পেলেও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তাকে তিন বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের শাস্তির ঘটনা বিরল। অনেক আইনজীবীই বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এমনটি হয়নি। রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ যতই প্রভাবশালী হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

মামলা : এজাহারে বলা হয়, এমপি বদি আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বৈধতা দেখাতে কম মূল্যে সম্পদ কিনে বেশি মূল্যে বিক্রির মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। পরে দুদকের উপ-পরিচালক মো. আব্দুস সোবহান ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট রমনা থানায় বদির বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এই মামলায় দুদকের উপপরিচালক মঞ্জিল মোর্শেদ ২০১৫ সালের ৭ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে বদির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রে বদির ৬ কোটি ৩৩ লাখ ৯৪২ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, তিনি দুদকের কাছে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৫৩ হাজার ২৭ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।

মামলা দায়েরের পর ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর গ্রেফতার হয়েছিলেন বদি। পরে তিনি হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি পান। ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে দুর্নীতির এই মামলায় বদির বিচার শুরু করেন আদালত। দুদকের পক্ষে মোট ১৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

চলতি বছরের ১৯ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বিচারক রায় ঘোষণার জন্য ২ নভেম্বর তারিখ ধার্য করেন। ওই রায়ে তার সাজা ঘোষণা করেন আদালত।

বদি শুধু দুর্নীতি নয়, নানা কারণেই আলোচিত-সমালোচিত। ইয়াবা পাচারের হোতা হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায়ও তার নাম আসে। এছাড়া বিভিন্ন সময় শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে পিটিয়ে গণমাধ্যমে আলোচিত হন তিনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।