যতদিন রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার থাকবে ততদিন ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা ঘটবে

ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আর্ন্তজাতিক ইন্ধন আছে বলে মন্তব্য এসেছে চট্টগ্রামে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে।

সোমবার (০৭ নভেম্বর) বিকেলে নগরীর চেরাগি মোড়ে আয়োজিত ওই সমাবেশে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, এই হামলা নিছক কোন সাম্প্রদায়িক হামলা নয়।  এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।  আর্ন্তজাতিক ইন্ধনও আছে।  বাংলাদেশের রাজনীতিতে যতদিন ধর্মের ব্যবহার থাকবে ততদিন এই ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা ঘটবে।

সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগ, চট্টগ্রাম এই প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।  ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ পাঁচ দফা দাবিতে ২০১২ সালে গড়ে উঠা সংগঠনটির হাত ধরে চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল।

প্রতিবাদ সমাবেশে একাত্তরের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সিপিবি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি মো. শাহআলম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে, এরপরও আমাদের রামু দেখতে হয়েছে, নাসিরনগরও দেখতে হল।  মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি জামায়াত ইসলামী এখন বিভিন্ন দলের মধ্যে ঢুকে গেছে।  পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যেও তারা ঢুকে গেছে।

তিনি বলেন, দেশে যেসব সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে এর পেছনে আর্ন্তজাতিক ইন্ধন আছে।  বিশ্বজুড়ে আইএস, তালেবান, আল কায়েদার জন্মদাতা কারা ? জাতিবিদ্বেষের ইন্ধনদাতা কারা ? এখন আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানিতেও জাতিবিদ্বেষী শক্তির উত্থান হচ্ছে।  বাংলাদেশে চলছে মুসলিম মৌলবাদ আর ভারতে জন্ম নিচ্ছে হিন্দু মৌলবাদ।  মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান নেই সেখানে আছে ওহাবী-সুন্নী দ্বন্দ্ব।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মৌলবাদ প্রতিরোধ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যেতে হবে।  আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় বলেছিলাম, ধর্ম হবে যার যার কিন্তু রাষ্ট্র হবে সবার।  সেই চেতনাই একমাত্র মুক্তির পথ।

‘হতাশ হওয়ার কিছু নেই।  ধৈর্য ধারণ করতে হবে।  আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে মৌলবাদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। ’ বলেন শাহআলম।

সমাবেশে সিপিবি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অশোক সাহা বলেন, কারও কারও ধারণা সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে লুটপাটের জন্যই এই হামলা চালানো হয়েছে।  আমরা সেটা মনে করিনা।  আমরা মনে করি এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।  আমাদের ধর্মবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সমস্ত জনগণকে রাজনৈতিকভাবে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।  নির্লিপ্ত থাকলে ৬৪ জেলায় আবারও বোমা হামলা হবে, অগোচরে হোলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটে যাবে।

‘এই মুহুর্তে প্রগতিকামী, অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী, সাম্যবাদী, বামপন্থী সব মানুসকে একত্রিত হতে হবে।  প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হবে। ’ বলেন অশোক সাহা।

কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল বলেন, ধর্মের আগুন নিয়ে খেলার পরিমাণ পাকিস্তান, আফগানিস্তান ভোগ করছে।  আমরা পাকিস্তান-আফগানিস্তানে ধর্মের ভয়ংকর রূপ দেখেছি।  এই বাংলাদেশ যেন পাকিস্তান-আফগানিস্তান না হয়, সেজন্য এই নোংরা খেলা বন্ধ করতে হবে।  ভোটের রাজনীতির জন্য ধর্ম নিয়ে খেলা বন্ধ করতে হবে।

উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ সভাপতি সুনীল ধর বলেন, কিছু হলেই সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, এটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।  হামলা-নির্যাতন চালিয়ে দেশকে সংখ্যালঘুশূন্য করার পাঁয়তারা করছে একটি মহল।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্খা থেকে।  কিন্তু দু:খের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায় থাকার পরও বারবার আমাদের সাম্প্রদায়িক হামলা দেখতে হচ্ছে।  আরও দু:খের বিষয় হচ্ছে এর সঙ্গে দলটির অনেক নেতাকর্মীও জড়িয়ে পড়ছে।

প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে দ্বৈতস্বত্তা আছে।  সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতা রেখে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না।  অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র চাইলে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগ, চট্টগ্রামের আহ্বায়ক শরীফ চৌহানের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক প্রীতম দাশের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক মো.ইদ্রিস, ন্যাপ নেতা মিটুল দাশ গুপ্ত, সাংস্কৃতিক সংগঠক উৎপল বড়ুয়া, খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ সোহেল এবং জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম সরওয়ার।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ-সভাপতি প্রবাল দে, খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক রূপক চৌধুরী ও সহ সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলোকময় তলাপাত্র, প্রজন্ম ৭১’র সভাপতি সলিল চৌধুরী, শিক্ষিকা সালমা জাহান মিলি, সংস্কৃতিকর্মী হাবিব বিপ্লব, নবান্ন উৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন ও সদস্য সচিব রুবেল দাশ প্রিন্স, পরিবেশ ছাত্র ফোরামের সৈয়দ আতিকুর রহমান এবং  সংবাদকর্মী জুবায়ের জুয়েল।

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবারও চেরাগি চত্বরে এসে শেষ হয়।  মিছিল থেকে সংখ্যালঘুদের নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে স্লোগান দেয়া হয়।

banglanews

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।