লগি-বৈঠা : নির্বাচনের প্রতীক , অন্ধত্বের প্রতীক , ভয়াবহতা ও উন্মত্ততার প্রতীক

১.
একটি দেশের সকল নাগরিকের অক্ষরজ্ঞান জানা থাকলে সেদেশের নির্বাচনে কোন ছবিযুক্ত প্রতীক রাখার প্রয়োজন হয় না । একবিংশ শতাব্দীতে এমনিতেই এটি হলো এক ধরণের অন্ধত্বের প্রতীক । আর সেই নির্বাচনী প্রতীক যখন অন্ধ আবেগ ও আক্রোশকে ধারণ করে ,তখন তা আরো ভয়ংকর হয়ে পড়ে ।

এমনই কিছু ভয়ংকর কান্ড এই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর । একটি দলের নির্বাচনী প্রতীক হলো নৌকা। সেই নৌকার আনুষঙ্গিক উপকরণ হলো লগি-বৈঠা । দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সেই লগি বৈঠা নিয়ে কর্মী সমর্থকদের ঢাকায় রওনা হওয়ার আহ্বান জানানো হয় । তাদের সেই আহ্বান মতো লগি বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে বিরোধী দলের কর্মীদের সাপের মত পিটিয়ে হত্যা করা হয় । শুধু তাই নয় , হত্যার পর লাশের উপর পা তুলে নারকীয় উল্লাশ প্রকাশ করা হয় । এটা দেখে বিশ্ববাসী বিস্ময়ে বিমূঢ হয়ে পড়ে ।

কাজেই আজকের বিশ্বজিত ও খাদিজাদের খুনী বদরুলরা হঠাৎ সৃষ্টি হয়ে পড়ে নি । অনেক বড় ফ্যাক্টরি দিয়ে অনেক যত্ন করে এদের সৃষ্টি করা হয়েছে ।

২.
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তি আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে । এর চাপেই বোধ হয় দেশের সর্বোচ্চ বিজ্ঞানমনস্ক প্রফেসর জাফর ইকবালকে খাদিজার জন্যে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় প্রার্থনা করতে হয়েছে । যদিও এখানে শব্দ চয়নে তিনি ছিলেন বেশ হিসাবী । লক্ষ্য রাখা দরকার যে খাদিজার জন্যে তিনি ‘প্রার্থনা’ করেছেন কিন্তু ‘দোয়া’ করেন নি । দোয়া করলে বিজ্ঞানমনস্কতার যতটুকু ক্ষতি হয় , প্রার্থনায় সেই ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম ।

যাই হোক , তারপরেও খাদিজার জন্যে প্রার্থনা করা এই প্রফেসর সাবকে প্রশংসা না করে পারা যায় না । তিনি বদরুলদের সৃষ্টির জন্যে কোনরূপ ভণিতা না করে এবার সরাসরি এই সব ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরির কারখানাকেই নাম ধরে দায়ী করেছেন । শুধু তাই নয় – বদরুলদের কৃতকর্মের দায় অস্বীকার করার জন্যে তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নানা প্রচেষ্টারও কড়া সমালোচনা করেছেন ।

বরাবরের মত খাদিজা -বদরুল ইস্যুতে সুপার হিট মন্তব্য করেছেন আওয়ামীলীগের সকল মুশকিলের আছান হিসাবে চাটগায়ের হাছান । তিনি যথার্থই বলেছেন , ‘ বদরুল ছাত্রলীগের কেউ না , শিবিরের হলেও হতে পারে । ‘

৩.
গুণধর এই হাছানদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে উক্ত প্রফেসর সাব তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলেছিলেন , ” নতুনদের হাতে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ভার দিয়ে আমরা বুড়রোরা এখন কোন প্রিয় কবির কবিতার বই পড়ব । ”

দেশে গণতন্ত্র , বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের বারোটা বাজলেও মূল ধারার মিডিয়া এগুলি নিয়ে এই ধরনের রোমান্টিক গুণীজনদের কবিতা পড়ায় কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নি । ‘নাটোরের বনলতা সেন’রা যখন এই সব সুশীলদের রোমান্টিক হৃদয়ে দুদন্ড শান্তি উপহার দিচ্ছিল , তখনই বেরসিক সোশাল মিডিয়া সামনে টেনে আনল কুমিল্লার তনু , চাটগাঁয়ের মিতু ( এসপির স্ত্রী ) এবংসিলেটের খাদিজাদের ।

কবিতার বনলতা সেনদের পাখির নীড়ের মত চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রক্তাক্ত তনু ,মিতু ও খাদিজাদের জন্যে প্রার্থনায় বসতে হয়েছে কাব্য রসিক এই রোমান্টিক সুশীলদের।

যার চলন বাঁকা তাকে তুলে না ধরে , যাকে দেখতে নারি তার চলনকেই বাঁকা হিসাবে তুলে ধরেছেন আমাদের বিজ্ঞান মনস্ক প্রফেসররা । আজকের বদরুলরা আমাদের এই জ্ঞানীগুণীদেরই সেই সব সকল প্রচেষ্টার ফসল । এই প্রফেসর সাবরা প্রতিপক্ষ ছাত্রদের নসিহতের জন্যে অনেক লিখেছেন , তোমরা যারা শিবির কর । কিন্তু যারা তাদের পরামর্শ শুনতেন , তাদের জন্যে কখনই এরূপ কোন নসিহত নামা লিখেন নি – তোমরা যারা ছাত্রলীগ কর ।

আসলে অভাগা এই জাতিকে কাটছে বদরুলরা , ছিলাচ্ছে র্য্যাব-পুলিশ-বিজিবি আর লবণ লাগাচ্ছে এই সব বিজ্ঞানমনস্ক প্রফেসর সাহেবরা । খাদিজা তার অপছন্দের কথা জানানোর আস্পর্ধা দেখানোয় ছাত্রলীগ নেতা বদরুল তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়েছে । এই খাদিজার মত একইভাবে কিংবা তার চেয়েও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন পুরো দেশটি । নিজ নিজ পছন্দ অপছন্দের কথা বললেই বদরুলের মতই জিঘাংসা নিয়ে নিজ নিজ চাপাতি নিয়ে এগিয়ে আসে র্যাব-পুলিশ-বিজিবি ।

কাজেই এই প্রফেসর সাবকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় , হে মহাত্মা ! বদরুলদের পয়দা করার জন্যে আজ শুধু ছাত্রলীগকেই দুষলেন ? নিজের ঘাড়ে এই দোষ একটুও নিলেন না ?

Minar Rashid
Political Analyst
Marine Engineer

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।