বিএনপির শক্তি ও দুর্বলতা

আমি ভেতর থেকে এবং কাছাকাছি থেকে বিএনপিকে দেখে আসছি। এ দলে এত লোক আছে যে, দেশের সব দলের লোকসংখ্যা মিলিয়ে বিএনপির অর্ধেকও হবে না। মানুষ গিজগিজ করে বিএনপিতে। তবে এই লোকসংখ্যাকে ইটের পাঁজার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ইট গেঁথে সাংগঠনিক ইমারত তৈরি করতে হয়। সেই কসরৎ বা মেহনত করার মতন যোগ্য নেতার সংখ্যা বিএনপিতে খুব কম। এ কারণেই এত বেশিসংখ্যক নেতা-কর্মীকে বিএনপি সম্পদ হিসেবে গড়তে পারেনি। তারা দলের বোঝা হয়ে থাকছে। তাদের হিসেব ও খোঁজ রাখার গরজও বিএনপি খুব বেশি অনুভব করে না।

আত্মবিশ্লেষণ, আত্মানুসন্ধান ও আত্মসমালোচনা করলে বিএনপি দেখতে পাবে যে, দলে রাজনৈতিক দর্শন ও মতাদর্শগত অনুশীলন ও সংগ্রাম খুবই কম। ফলে আদর্শগত সচেতনতা ও দৃঢ়তা গড়ে উঠছে না। বিপদ-বিপর্যয় মোকাবিলায় সাহসী নেতাকর্মীর অভাব দেখা দিয়েছে। সাংগঠনিক তৎপরতা বলতে কর্মীদের মিছিল-সমাবেশে যোগদান আর নেতাদের বক্তৃতা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বিএনপিতে পদ-পদবিধারী নেতারা দলের কর্মী সৃষ্টির বদলে নিজস্ব স্তাবক ও লাঠিয়াল তৈরিতে বেশি আগ্রহী। এই স্তাবক ও লাঠিয়ালদেরকেই তারা সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে পদ পাইয়ে দেন তদবির ও লবিংয়ের মাধ্যমে। বাদ পড়ে যায় সত্যিকারের যোগ্য ও সম্ভাবনাময় দলীয় কর্মীরা। ওই প্রক্রিয়ায় বিএনপির সকল স্তরে দলীয় কর্মীর বদলে থোকায় থোকায় বিভিন্ন ‘ভাইয়ের সমর্থক’ উপদল সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য। ভাইদের ইশারায় তারা কর্মসূচিতে নামে কিংবা লুকিয়ে থাকে। বিএনপিতে এখন হাইকমান্ড অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে চলা কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে কম। কেবল ভাইয়েরা ইশারা দিলেই তারা ঝাঁকে ঝাঁকে হাজির হয় অমুক ভাই তমুক ভাইয়ের পক্ষ থেকে ‘লাল গোলাপ শুভেচ্ছা’ জানাতে।

কর্মসূচিতে লোক আনার জন্য সমন্বয় সভা ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সংগঠনের তেমন কোনো বৈঠক কখনো হয় না। রাজনীতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে ভুল-ত্রুটি নির্ণয় ও অভিজ্ঞতার আলোকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিএনপিতে প্রায় অনুপস্থিত। শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক অসুস্থ প্রক্রিয়া দলকে ক্রমান্বয়ে রক্তসঞ্চালনহীন ও স্থবির করে তুলছে।

নেতাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস ছড়ানো ও হেয় করার এবং কোন্দল সৃষ্টি ও গ্রুপিং প্রবণতাও দলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে রাখছে। এই প্রবণতার কারণে দেশ ও দলের চাইতে ব্যক্তি ও গ্রুপকে শক্তিশালী রাখার প্রয়াস দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ পরিষদ- জাতীয় স্থায়ী কমিটিকেও অকার্যকর করে রেখেছে। সাফল্য আত্মস্থ করা এবং ব্যর্থতার দায় না নিয়ে এর ওর ওপর চাপিয়ে দেয়ার ধারা দলকে সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রেখে তাদের পছন্দসই কথা বলে নিজেকে প্রিয় রাখার আত্মঘাতী ধারা সমানে চলছে। দলে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত পরিচ্ছন্ন ইমেজসম্পন্ন ত্যাগী, জ্ঞানী, দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান নেতার সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ইস্যু অনুযায়ী এডহক ভিত্তিতে কোনো কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপ হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। তাদের তৎপরতা বা পরামর্শে বিপর্যয় ঘটলে অন্য ব্যক্তি বা গ্রুপ সামনে চলে আসছে। কানাকানি ও দলাদলির অসুস্থ প্রবণতায় বিএনপিতে অনেক সময় ভিলেনকে হিরো এবং হিরোকে ভিলেন বানানো হচ্ছে।

এই সব বাস্তবতাই আমার বিবেচনায় বিএনপিকে বিজয়ের পথে এগুতে দিচ্ছে না। তবে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এবং ক্ষমতার আসন থেকে এত বৈরি চক্রান্ত ও আক্রমণ সত্ত্বেও বিএনপির মতো একটি শিথিল বন্ধনের দলকে অগোছালো ও সন্ত্রস্ত করলেও পরাজিত করা যায়নি। বিএনপিতে শত চেষ্টাতেও তেমন ভাঙন ধরাতে পারেনি ক্ষমতাসীনেরা। বিএনপির এ এক বিস্ময়কর সাফল্য। এর কারণ বিএনপির শক্তিকাঠামো সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের অজ্ঞতা। তারা ভেবেছে বিএনপির মূলশক্তি সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে। আসলে তা নয়। বিএনপির একটা শিথিল সাংগঠনিক কাঠামো আছে বটে কিন্তু এ দলের মূলশক্তি সেটা নয়। বিএনপির মূলশক্তি দলের সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে নানান শ্রেণি-পেশার অগণিত দেশবাসীর ভেতরে। তারা এ দলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এ দলকে তারা ভালোবাসে। গণমানুষের মূলধারার রাজনৈতিক দল এটি।

শতাব্দীর মহীরুহ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর আদর্শের পতাকা শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিয়ে যান। সেই পতাকা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ উড্ডীন রেখেছেন। আদর্শ ও রক্তের উত্তরাধিকার ধমনীতে বহন করে তাঁকে সহায়তা করছেন তারেক রহমান। এই পতাকাই বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার পতাকা। সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের পতাকা। আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যয়-প্রতিজ্ঞা, আস্থা-বিশ্বাসের পতাকা।
জনগণ মনেপ্রাণে কামনা করেন এই পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখতে বিএনপির স্খলিত হাত আরও দৃঢ় হবে।

লেখক: লেখক ও সাংবাদিক; বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।