নষ্ট ছেলেদের কেন দুষ্টু বলছি

পুরুষের নষ্টামি, ভ্রষ্টামি, বদমাইশি, বজ্জাতিকে প্রশ্রয় দেয় সমাজ। তাদের অন্যায়, অপরাধ সুন্দর শোভন শব্দের আড়ালে লুকোয়। তাদের কদর্যতা দেখতে দেয় না, দেখেও না। যদিও এই আচরণ, অসভ্যতা নির্দেশ করে। তবু সমাজ তা করে, করে নিজে পুরুষতান্ত্রিক বলে।

ইভটিজিং তেমনি এক ধরনের অসভ্যতা। নষ্টামি, ভ্রষ্টামি, বদমাইশি পুরুষের, নারীর প্রতি। সমাজ পুরুষের ভালো-মন্দ দেখে না, বিচারও করে না। তার সব কাজকেই আদর করে, চুমু খায়, বাহবা দেয় পৃষ্ঠপোষকতা করে। সে কারণেই ইভটিজিংয়ের মতো অন্যায়, অসভ্যতাকে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট না বলে, রোমান্টিসাইজ করে ইভটিজিং বলে।

চোখ টিপ দেয়া থেকে শুরু করে নিতম্বে চাপ দেয়া সবই ইভটিজিংয়ের আওতাভুক্ত। সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বলতে তবে আপত্তি থাকবে কেন ? অথচ অনেকের আপত্তি তো আছেই, আছে রীতিমতো বিতর্কও । যদি প্রশ্ন করা হয়, পুরুষেরা এ ধরনের আচরণ কেন করে? তবে হাজারটা উত্তর পাওয়া যাবে। একটা নির্দিষ্ট বয়সের ছেলেরা করে, সে রকম কিছু না দুষ্টুমি, পরিবারের অশিক্ষা, এটা ছেলেদের মানসিক সমস্যা, বয়সের দোষ, এক ধরনের ফান- এমন অসংখ্য উত্তর পাওয়া যাবে, যায়। যার একটিও গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ সমাজ পুরুষের অগ্রহণযোগ্য অনেক কিছুকেই গ্রহণ করে, অনুমোদন দেয়, আহ্লাদ করে শুধুমাত্র পুরুষ বলে।

পুরুষেরা ‘পুরুষ’। তারাই শ্রেষ্ঠ, উন্নত, উত্তম এমন ধারণা তো তাকে দীর্ঘদিন দিয়ে আসছে সমাজ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো। কিন্তু তার এই শ্রেষ্ঠত্ব যে শ্রেষ্ঠত্ব নয় সব বিচারে, তা সে নিজেও টের পায় ভেতরে ভেতরে। তৈরি হয় কমপ্লেক্স। নারীকে চায় সে দমন করতে, অবদমনের মধ্যে রাখতে। জাহির করতে চায় নিজের কর্তৃত্ব মেয়েদের ওপর। আর তা করতে গিয়েই এমন সব আচরণ করে। এ ধরনের আচরণ মনোবিকার তো বটেই। দেখা গেছে, অনেক ইভটিজার ক্লিনিক্যালি সাইকোপ্যাথের আওতায় পড়ে।

লৈঙ্গিক রাজনীতি সমাজে মেয়েদের পিছিয়ে রাখে। এই কারণে যে, তারা যেন লিঙ্গের শাসন-শোষণ মেনে নেয়। মানিয়ে নেয়। কিন্তু ‘যোগ্যতা’ এমনই এক আগুন, যাকে কতক্ষণই আর রাখা যায় ছাই চাপা দিয়ে। মেয়েরা এগিয়ে আসছে। আসবে আরো সামনে, বিরোধিতার বিরুদ্ধাচরণ করেই। এটা ভালো লাগে না পুরুষের, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের। সে নারীর মেধা, যোগ্যতা, প্রতিভাকে ভয় পায়। যদি অধীনস্থতা না মানে পুরুষের, তাহলে কী হবে! কী বিপদেই না পড়বে পুরুষ! কাকে সে এখন ঘরে রাখবে, যৌন দাসী বানাবে, নির্যাতন করবে, নিপীড়ন করবে। ভুগবে কে, ভোগাবে কাকে?

খাদিজার এলোপাতাড়ি কোপের ক্ষত শুকোতে না শুকোতেই মিরপুর বিসিআইসি কলেজের আরো দুই তরুণী অশ্লীল আক্রমণের শিকার। যমজ দু-বোন ঘরে ফিরছিল কলেজ শেষ করে। বখাটেরা তাদের গতিরোধ করে, অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। দু-বোন প্রতিবাদ করতে গেলে হেনস্তা করে তাদের, পেটায় বাঁশ দিয়ে।

আমাদের বাস যে তথাকথিত ভদ্রলোকের সমাজে, তা আদৌও কতটা ‘ভদ্র’, ‘শালীন’, ‘শোভন’ তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আছে আপত্তি। সমাজ আসলে উৎকট পুরুষতান্ত্রিকতার অধীনেই আছে। পুঁজিবাদের কঠিন, কঠোর খপ্পরেই বসবাস করছে। যে সমাজে এখনো ফতোয়া চলে গ্রামে গ্রামে, সে সমাজ কেমন সমাজ! ২০১৬ হলেও আমরা আদতে বাস করছি মধ্যযুগে। দালান কোঠা, শপিংমল, লেটেস্ট মডেলের গাড়ি, দামি আসবাব আধুনিকতা নয়। আধুনিকতা থাকে মগজে, চিন্তায় চেতনায়, বিজ্ঞানমনস্কতায়।

সত্যি বলতে, সমাজের অনেকাংশই এখনো নারীবিরোধী। আমাদের শিক্ষাও তো নারী বিরোধী শিক্ষাই। পুরুষতান্ত্রিকতার মন্ত্রে ঠাসা। লোকে তো আসলে চারপাশ থেকেই শেখে। শেখে একেবারে শৈশব থেকে। প্রচলিত আইনগুলো কী নারীর পক্ষে। নাকি অনেকগুলোই তাদের অধিকারের বিপক্ষে। ইভটিজিংয়ের ঘটনার প্রতিকার চাইবার জন্য সরাসরি কোনো আইনের বিধান নেই। যা আছে তা দুর্বল। পারে না দাঁড়াতে।

সমাজে নারী পুরুষের সুন্দর সম্পর্ক নেই। বরং বৈষম্য আছে, বিষমভাবে। ছেলেমেয়েদের শৈশব থেকেই আলাদা করে রাখি আমরা। এক দলকে বোরকা পরাই, বন্দি করি, অন্য দলকে মুক্ত, স্বাধীন রেখে। মিশতে দেই না তাদের। খেলতেও দিতে চাই না, একসঙ্গে। আমি শুধু এই শহরের কথা বলছি না, বলছি পুরো দেশের কথা। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার কথা। ছেলে এবং মেয়েতে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ, সুন্দর সম্পর্ক না থাকাতে, নিষেধ থাকাতে, ছেলেরা বিকৃত উপায়গুলোই আশ্রয় করে কৌতূহল নিবারণ করতে। ফলে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয় না। বরং বিকৃতিই বাড়ে।

শুরুতেই বলেছি, পুরুষের নষ্টামিকে ‘দুষ্টুমি’ হিসেবে দেখতে সমাজ ভালোবাসে। বাংলা ছবিতে প্রেম হয় ইভটিজিং থেকে। পর্দায় দেখা যায়, অপু বিশ্বাস কিংবা পরিমনিকে ইভটিজিং করে শাকিব । সেই থেকে প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে। ইভটিজারদের আদর করে, আহ্লাদ করে, প্রশ্রয় দিয়ে পাড়ার ‘রোমিও’ বলি আমরা। আসলে বলি না, পৃষ্ঠপোষকতা করি আমরা পুরুষতান্ত্রিকতা। অথচ মেয়েদের লুকোতে বলি, আড়ালে যেতে বলি, অলক্ষ্যে যেতে বলি, চাদর পরতে বলি, বোরখা পরতে বলি, অযৌক্তিকভাবে। মেয়েরা কি লুকোলেই, আড়ালে গেলেই, ঘরে সেধিয়ে থাকলেই সমাধান হবে। নাকি সমাধান হয় এভাবে? মেয়েরা কেবল আড়ালে থাকবে, প্রতিরোধ করবে, বাঁচাও বাঁচাও বলবে- আর কতকাল? প্রতিশোধ নেবে না পাশবিকতার, পৈশাচিকতার!

লেখক : জব্বার হোসেন। সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্ট্রার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম এন্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।

jabberhossain@gmail.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।