আপনাদের ‘অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশ’ আজ কই? ধিক বাংগালী! -পৃথা শারদী

পৃথা শারদী: ক্লাস এইটে পড়ার সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র দ্বিজাতি তত্ত্ব পড়েছিলাম, হিন্দু-মুসলমান আলাদা জাত, সেই জাতের ভাগে দেশভাগ হলো। সেই জাতের প্রতি ভালোবাসায় চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হলাম। আজকে ৪৫ বছর পরেও এই দ্বিজাতি তত্ত্ব আমাদের ভেতর থেকে যায়নি। জিন্নাহ সাহেব খুব সচেতনভাবে জাত-ভেদ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
যখন ছোট ছিলাম অনেক কিছু বুঝতে পারতাম না, ক্লাসে গিয়ে বসলে খুব অদ্ভুতভাবে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করতো, “তুমি হিন্দু? তোমরা পূজা করো?” নিজের মতো মাথা নাড়িয়ে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাতাম। পরের প্রশ্ন হতো আরো ভয়াবহ !

হাসতে হাসতে মাঝে মাঝে শিক্ষকরা জিজ্ঞেস করতেন , “তোমরা ইন্ডিয়া যাবা না, বাড়ী আছে তো ইন্ডিয়াতে? এই প্রশ্নে বরাবরই আমি খুব অবাক হতাম, দেশ তো আমার এটা! ওই দেশে কেন যাবো! ”
স্কুলের বন্ধুরা হেসে বলতো, “এটা আমার দেশ, ইন্ডিয়া তোমার”
রাগ লাগতো খুব, অসহায় লাগতো। বাসায় এসে মা-বাবাকে মন খারাপ করে বলতাম, স্কুলে যাবো না। মা-বাবা বলতেন, “সবাই সমান আমরা, দেশটা আমাদের।”

এ তো গেল ছোট্টবেলার কথা, বড়বেলার কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করে। ইউনিভার্সিটিতে একবার এক বন্ধুর বাসায় খেতে গেলাম। আমার বন্ধুর মা আমাকে গরুর মাংস খাওয়াবেন-ই খাওয়াবেন। বারবার বলছেন, “খেয়ে দেখ মা, খুব মজা! ”
অবাক হয়ে গেলাম! একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা আমাকে আমার ধর্মের বাইরে যেতে টানাটানি করছেন।
কোরবানি ঈদের ঠিক আগে মাস্টার্সের ক্লাসে একজন প্রকৌশলী বেশ স্মার্ট মেধাবী লোক আমাকে বললেন, আমাদের বাসায় এসো, “গরু খাওয়ার দাওয়াত”।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “চলে আসেন আমাদের বাসায়, এ সপ্তায় কচ্ছপ, আগের সপ্তায় শুকর খাওয়া হলো।” ভদ্রলোক একটু অন্যপাশে চেপে গেলেন , মুখের ভাবখানা এমন ছিল খুব নাপাক কিছুর সংস্পর্শে তিনি বসে আছেন।
হঠাৎ করে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে, “তুমি হিন্দু”? তোমার কথাবার্তায় বুঝতে পারিনি ! ”
“কেন বুঝতে পারেননি ” জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পাই, “হিন্দুরা এত সপ্রভিত হয় না”।
জানতে ইচ্ছে হয়, মানুষ হবার জন্য কী কী হতে হয়?
পড়াশোনা শেষ করেছি বছরখানেক। বাইরে পড়তে যেতে ইচ্ছে করে, দেশ ছাড়তে ইচ্ছে করে না। সবাই জিজ্ঞ্যেস করেন, “দেশ ছাড়ছো কবে”? প্রশ্নটা শুনলেই খারাপ লাগা শুরু হয়, দেশ ছাড়বো কেন! উত্তর পাই নানারকম! প্রথম উত্তর, গ্রহণযোগ্য অকাট্য উত্তর ,“তুমি হিন্দু, দেশে নিরাপত্তা নাই। বাইরে চলে যাও, থাকবা খাবা, জীবন কাটাবা”!

আমার অবাক লাগে! আমার কষ্ট লাগে, আজকাল নিজের দেশে আমি নিরাপত্তা পাই না, অন্য দেশে গিয়ে অন্য মানুষের ঝাঁটা-লাথি খেয়ে আমাকে নিরাপত্তা পেয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এখনো আমার পাশের কেউ বিদেশ গেলে আমি কাতর হই কষ্টে, তাদের বারবার জিজ্ঞাসা করি, “দেশে ফিরবেন না? দেশে চলে আসেন, এভাবে দেশ ছাড়বেন না”। কিন্তু সবাই দেশান্তরী হন, একটু ভালো থাকার আশায়, সবাইকে ভালো রাখার আশায়।

আর এই বোকা আমি ভাবি, অন্য একটা দেশ, সেই দেশের মানুষ অন্যরকম, সেই দেশের চলাফেরা অন্যরকম, সেই দেশে গিয়ে কেন আমার ঠাঁই হবে! এতোই কি পাপ ছিল যে নিজের জন্মভূমিতে শান্তিমতো খেয়ে পরে বাঁচতে পারবো না?
আমার কথা বাদ দিন। সমাজের কথায় আসি।

পূজা নামের মেয়েটাকে সেদিন ধর্ষণ করা হলো, আমি বারবার লিখতে গিয়েও কিছু লিখতে পারিনি। এত ছোট্ট একটা মেয়ের ব্যাপারে লিখতে যাবার মতো মানসিক শক্তি আমার নেই।
এর আগে বাগেরহাটের একজন সংখ্যালঘু গৃহবধুকে ১৫ দিন টানা আটকে রেখে অত্যাচার করা হলো। ধর্ষণ করা হলো।
সেদিন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় হিন্দু পেটানো হলো, মন্দির ভাঙ্গা হলো! হবিগঞ্জ, ছাতকেও মন্দির ভাঙচুর হলো।
কেমন লাগে ঠিক এসব দেখলে চোখের সামনে?

তুলনা করতে আমার ভালো লাগে না, আজ তাও কিছু তুলনা করি, তনু মেয়েটা মারা গেল, রাজনকে পেটে গ্যাস ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হলো, রিশাকে নিয়ে কতোকিছু হলো, খবরগুলো ভাইরাল হলো।
পূজা মেয়েটাকে ধর্ষণ করা হলো, বাগেরহাটের গৃহবধুকে অত্যাচার করা হলো, কত জায়গায় দুর্গা পূজার আগে শ খানের মূর্তি ভাংগা হলো, একটা খবরও তো ভাইরাল হয় না!
অথচ সবাই মানুষ! সবার শরীর ছিল! সবার ব্যথা ছিল এবং সবারই একটা ধর্ম ছিল।
তনুকে নিয়ে হাজার হাজার মিটিং মিছিল হলো, আচ্ছা ছোট্ট পূজাকে নিয়ে কী হয়েছে? কেন হয়নি কিছুই? পূজার ঘটনা এসে ঢেকে দিল বাগেরহাটের ঘটনাকে, আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা ঢেকে দিচ্ছে পূজার ঘটনাকে। আমরা খেই হারিয়ে ফেলছি, যেন দৌড়াচ্ছি।
কেন, ‘মালাউন’ বলে?
পূজায় ঢাক বাজানো যাবে না, পূজার শব্দ করা যাবে না, জোকার দেয়া যাবে না!
কিছু করা যাবে না!
কেন?
মালাউন বলে? শিশ্নের আগার চামড়াটুকু কাটা না বলে? এই গোত্রের মেয়েরা বিয়ের পরে স্বামীর মঙ্গল কামনায় শাঁখা সিঁদুর পরেন বলে?
প্রিয় পাঠক, আবারো তুলনায় যাবো।

এবার ঈদের নামাজে কয়েকজন হিন্দু যুবক মিলে মসজিদ পাহারা দিয়েছেন। এর আগের ঈদেও দিয়েছিল। কই, আমি তো শুনিনি কোথাও কোন পূজায় কোন মুসলিম ছেলে এসে একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন? এবার এই রমজানে বৌদ্ধ ভীক্ষুগণ ইফতার খাইয়েছেন, বিনামূল্যে। রামুর ঘটনা সব বেমালুম ভুলে ইফতার খাওয়ালো। শুনেছি তারা প্রতিবছরই খাওয়ান। উপযুক্ত সম্মানিই বটে!
আমি তো শুনি না কখনো কোন মন্দিরে, গির্জা,প্যাগোডায় কোনো মুসলিম ভাইয়ের বদান্যতা?
আজকাল চোখজোড়া, কানজোড়া এই খবরগুলো দেখতে চায় ,শুনতে চায় বারবার।

আমরা সবাই তালে তালে অসাম্প্রদায়িক।
চলুন অসাম্প্রদায়িকতার গল্প বলি।
পূজার ছুটি শেষে ক্লাসে আসি, পৃথা, নাড়ু কই? নাড়ু নিয়ে আসি, সবাইকে পেট ভরিয়ে নাড়ু খাওয়াই।
শিক্ষা জীবনে অষ্টমী-নবমীতে ক্লাস করতাম, স্যারকে বলতাম, স্যার অঞ্জলি দিবো, ছুটি?
স্যার মুখ বাঁকা করে হেসে বলতেন, “আগে ক্লাস”।
অথচ অন্য নানা উৎসবে এই দেশে টানা ১৫ দিন ছুটি! বাহ রে বাহ!

আজকাল আমার মনে হয়, হিন্দু জাতটা ঘরে পোষা বেড়ালের মতোন। যখন ইচ্ছে পেট ভরে দুধ ভাত খাওয়াবো, যখন ইচ্ছে পেট বরাবর লাথি মারবো, তাতে রক্তবমি করে বেড়াল ছানা মরে গেলেও কারো কিছু আসবে না, যাবেও না। লাথি খাওয়া বেড়ালকে নিয়ে সবাই আরো কটা লাথি দেবে, বেড়াল সুস্থ হবে, ঘরের বেড়াল ঘরে থাকবে, বের হবে না। এটা সবার জানা।
সবাই আমরা হা রে রে রে করে বলি ‘আমরা অসাম্প্রদায়িক’।

অসাম্প্রদায়িক! কাজের সময়, পূজার ফাঁকে ঘুরে বেড়ানোর সময় অসাম্প্রদায়িকতা, প্রতিমার ঢলো ঢলো মুখের সাথে সেলফি তোলার সময় আমরা ভুলে যাই কে হিন্দু, কে মুসলিম। ফেসবুকে ছবি দিলেই শতে-হাজারে লাইক, কিন্তু যখন অকারণে কারণ না যাচাই করে এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে হেনস্তা করে, তাদের ধর্মকে অবমাননা করে, তখন আমরা চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেই আমরা ‘সাম্প্রদায়িক’।

আমি জানি না কোথায় ঠিক কোন ধর্মে শান্তি বিনা এভাবে অশান্তি করার কথা লেখা আছে! ঠিক কোন ধর্মে লেখা আছে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিনাশ করে আঘাত করে নিজের ধর্মকে উপরে তোলা যায়!
মনুষ্যত্ব প্রত্যেক মানুষের ভেতর আছে, মনুষ্যত্ব ছাড়া মানুষ হয় না, আমরা সবাই হিন্দু-মুসলিম হয়েছি মানুষ হতে পারিনি।
আমরা বাঙালীরা আবেগী জাতি, আমরা আবেগ দেখাই। তবে ঘরে আবেগ না দেখিয়ে বাইরে বনে গিয়ে আবেগ দেখাই ।
আমাদের আবেগ আজ ক্রিকেট, আমাদের আবেগ আজকে সাম্প্রদায়িকতায় গিয়ে ঠেকেছে। ক্রিকেটের বেলায় আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশপ্রেম উদযাপন করছি, একের পর এক হাসিমাখা বাঘের ছবি, একের পর এক হ্যাশট্যাগ দেয়া আমরা বাংলাদেশি, আমরা দেশের জন্য সব পারি, সব করি। আবার এই প্রেমই প্রশ্নবিদ্ধ হয় সাকিব যখন সৌম্যদের নিয়ে ইফতার করেন। আহারে দেশপ্রেমিক জাতি আমার!

কিন্তু দেশপ্রেম কি শুধু ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ? দেশপ্রেম আজকে জাগে শুধু ব্যাটে-বলে, দেশপ্রেম জাগে রামপালে, দেশপ্রেম জাগে তনু-খাদিজাতে, পাঁচ বছরের হিন্দু পূজার চিৎকার-আতংকে দেশপ্রেম জাগে না, চোখে জল আসে না, অন্য ধর্মের অসম্মানে দেশপ্রেম জাগে না, জাগে শুধু বীরত্ব! কাপুরুষোচিত বীরত্ব! অন্যকে ছোট করে নোংরাভাবে নিজে বড় হবার বীরত্ব। কী কাপুরুষ আমরা!

ধিক বাংগালী! ধিক তোমাদের!
আর শত ধিক এই কোনঠাসা অমুসলিম বাঙালীদেরও। স্বদেশে জন্মেও আজ তোমরা পরদেশী।
আর হে ধর্মপ্রাণ জাতি, বারবার একটা কথাই বলে যাই, সম্মান ঠিক তখনই আপনি পাবেন যখন অন্যকে সম্মান দেবেন। অন্যের দিকে থু থু ছিটিয়ে নিজে কখনোই ফুলের মালা আশা করবেন না, নিরাশ হবেন খুব, এভাবে আর যাই হোক না কেন, শ্রদ্ধা পাওয়া যায় না।
সবার মংগল হোক।
আপনার সবাই সুখে থাকুন এই সোনার বাংলাতে এই কামনাই করি।

womenchapter

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।