১৮‍+

১৮ বয়সটাই মুক্ত হওয়ার বয়স। কাগজে-কলমে এ বয়সেই হয় প্রাপ্তবয়স্ক। শিশুকালকে বিদায় জানিয়ে দুর্বার ছুটে চলার বয়স। নেই ভয়, নেই সংশয়। এই বয়স নতুন কিছু করে। আবার আঠারোতেই নাগরিক হিসেবে অধিকার মেলে নিজের মত প্রকাশের। ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন তাঁদের নতুন জীবন নিয়ে—তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে অধুনার এই আয়োজনে। জীবনের এই নতুন ধাপে যে পরিবর্তন তা নিয়ে থাকছে দুজন বিশেষজ্ঞের মতামতও।

পৃথিবীকে নতুনভাবে চেনার অনুভূতি একেবারে আলাদা
শাহরিমা তানজিনা
প্রথম বর্ষ, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শাহরিমা তানজিনা
শাহরিমা তানজিনা

কয়েক দিন আগেও মা-বাবার ওপর পুরো নির্ভরশীল ছিলাম। আঠারোর পর হুট করে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে তা শুরুতে কিছুটা ভীতি তৈরি করে। তার মধ্যেও নতুনত্ব আছে। নিজেকে নতুনভাবে পাওয়া। চারপাশের মানুষকে নতুনভাবে চিনতে পারা। তার মধ্যে পৃথিবীকে নতুনভাবে চেনার অনুভূতি একেবারে আলাদা। আমি বুঝতে শিখেছি, আমার দায়িত্ব কী। আমি নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চাই, সে গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় এটি।

কখনো আমি বড়, কখনো আমি ছোট!
মুজাহীদ খান
এ লেভেল পরীক্ষার্থী

মুজাহীদ খান
মুজাহীদ খান

বয়ঃসন্ধির পরের এই সময়টা একটু অন্যরকম। পরিবারে কখনো ভাবে আমি বড়, কখনো ভাবে আমি ছোট। পরিবারে আমার ওপর এখনো পুরোপুরি আস্থা তৈরি হয়নি। মেয়েদের মা-বাবা এই সময়েও তাঁদের দেখেশুনে রাখতে চান। আমি শুধু না, এই বয়সী সবার বেলাতেই মা-বাবাকে বুঝিয়ে মানিয়ে নিতে হয়। ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা নিজেদের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চায় এই সময়ে। নিজেরা যে একটু বড় হয়েছে, এটা বাবা-মাসহ আশপাশের সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে। আমিও করেছি। নতুন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহের পরিণতি ভালো হয় না। আমি নিজে যেমন দেখেছি এ লেভেলের অনেক শিক্ষার্থী নিজেরা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, নিজের পেশার দিকে বেশি দৃষ্টি দেয়।

হঠাৎ বড় হয়েছি এই ভাবনা থেকে বিপথেও চলে যায় অনেকে। অনেক পরিবারে ছেলেমেয়েদের খোঁজখবর করা কমিয়ে দেন। চারপাশে দেখি এমন ঘটনা। এই সময়ে নতুন নতুন বন্ধু হয়। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। বড়রা বলেন, এই বয়সে স্বাধীনতা ভালো, তবে লাগামছাড়া হয়ে গেলে সারা জীবন ভুগতে হয়।

অনেক কিছুই এখন নিজেকে সামলাতে হয়
সাকিবা মুসাররাত
প্রথম বর্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

সাকিবা মুসাররাত
সাকিবা মুসাররাত

যখন ছোট ছিলাম তখন ভাবতাম বড়দের কত মজা, কত আনন্দ, যা খুশি তাই করতে পারে। কিন্তু নিজে যখন বড় হচ্ছি তখন বুঝতে পারছি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দায়িত্ব, বাড়ে কাজ। আমি যখন ১৮ বছর পূর্ণ করলাম, তখন বুঝলাম জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সবার কাছে আমার মন্তব্য এবং সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বেড়েছে। নিজের অনেক কিছুই এখন নিজেকে সামলাতে হয়। মাঝেমধ্যে একটু অসুবিধা হলেও ভালোই লাগে। অন্তত নিজের স্বাধীনতাটুকু পাচ্ছি। এখন আমার মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে। দেশ, জাতি ও সমাজ এখন আমাদের কাছে কিছু চায়। এ দেশের প্রত্যেকের জীবন নানা রঙে ভরে উঠুক আর সবাই হাসতে পারুক, ভালোবাসতে পারুক।

১৮ যেন ফিরে আসে জীবনে বারবার

আতিক জাওয়াদ
আতিক জাওয়াদ

প্রথম বর্ষ, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বয়সেই জীবনটাকে নতুন আঙ্গিকে দেখার সূচনা হয়েছে। নিজের ইচ্ছামতো নিজের জীবনকে সাজানোর শুরু, নিজের মতাদর্শকে মেলে ধরার শুরু তো এই সময়েই! আমি নিজে যে পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করেছি তা হচ্ছে স্বাধীনতা। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি, বাধা দেওয়ার কেউ নেই। কারণ বয়সটা আঠারো। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু এই আঠারোতেই। ছুটি পেলেই লম্বা ভ্রমণে বের হয়ে যাওয়া কিংবা রাত জেগে ভার্সিটি কনসার্টে নেচে-গেয়ে বেড়ানো, বিভিন্ন ক্লাব, সংস্থার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা অথবা সেই মুমূর্ষু রোগীটাকে প্রথম রক্তদান—এসবের শুরু আমার আঠারো বছর বয়সে। এ যেন এক নতুন জীবন। এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে আঠারোর মধ্যে। তাই তো খুব করে চাই এই আঠারো যেন ফিরে আসে জীবনে বারবার!

নিজেকে প্রস্তুত করছি

আসিফ আনজুম খান
আসিফ আনজুম খান

প্রথম বর্ষ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আঠারো বছর বয়স হওয়ার পর থেকে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছি। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে সমাজের সব ইস্যুতে সবাই আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। সব দ্বিধা কাটিয়ে সবকিছুতে অংশ নিতে পারছি। আগে থেকেই সামাজিক অনেক বিষয়ে সচেতন ছিলাম। এখন মনে হয় এটা আসলে আমার দায়িত্ব। প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছি তো। নিজেকে প্রস্তুত করছি।

একটু এদিক-ওদিক হলে জগৎ থেকে হারিয়ে যেতে পারি
ইফতেখার হোছাইন
তৃতীয় সেমিস্টার, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

ইফতেখার হোছাইন
ইফতেখার হোছাইন

ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ ও ভালোবাসা রয়েছে। আর তা নিয়েই কাজ করতে আমি পছন্দ করি। বলা চলে, তথ্যপ্রযুক্তিই আমার ধ্যান-ধারণা। এখন আমার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে মোবাইল অ্যাপ এবং গেম তৈরির। তথ্যপ্রযুক্তি খাত আমাদের জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। এখন থেকে নিজেকে গড়ে তুললে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারব। এখন যত পরিশ্রম করা হবে তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ কেমন হবে। একটু এদিক-ওদিক হলে জগৎ থেকে হারিয়ে যেতে পারি। আমি চেষ্টা করছি নিজেকে গড়ে তোলার।

পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া এখনো বাকি
ফাতেমা তুজ জোহরা
প্রথম বর্ষ, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ফাতেমা তুজ জোহরা
ফাতেমা তুজ জোহরা

১৮ বছর হওয়ার পর জীবনে নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে। সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে এগিয়ে চলছি। তবে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া এখনো বাকি। নিজের শিক্ষা এবং নিজের ভাবনা-চিন্তাকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমার কাছে জীবন একটা ‘জার্নি’ মনে হয়। কোথায় গিয়ে তা শেষ হয়, দেখার অপেক্ষায় আছি। মানুষকে আরও বেশি স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র দেখতে চাই। সবাই নিজ গুণে আলোকিত হোক তা চাই।

আগের মতো অত আবেগ নেই
রোকনউজ্জামান রাকিব
প্রথম বর্ষ, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশল বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

রোকনউজ্জামান রাকিব
রোকনউজ্জামান রাকিব

আঠারো বছর হওয়ার পর দেখলাম আগের মতো অত আবেগ নেই। বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখছি। জীবনের লক্ষ্য পূরণের স্বপ্ন শুরু হয়েছে আমার। বুঝতে শিখেছি নিজের জন্য কোনটি ভালো আর কোনটি খারাপ।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার শুরু হোক, এটাই চাওয়া।

মতামত সংগ্রহ: আহসান মাহমুদ ও এস এম নজিবুল্লাহ চৌধুরী
prothom alo

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।