আমেরিকার নির্বাচনে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’

নাসরীন মুস্তাফা: সংস্কার-কুসংস্কারের চাদর ইউরোপ-আমেরিকাতে নেই, এটা মোটেও সত্য নয়। এরকমই একটি আমেরিকান সংস্কার বা কুসংস্কারের নাম ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ‘সারপ্রাইজ্ড’ হতে হয় কিনা, এই ভয়ে কাঁপতে থাকেন প্রার্থীরা। পুরো বিশ্ব অপেক্ষায় থাকে ‘সারপ্রাইজ’-এর, কেননা প্রার্থীদের কথা কাটাকাটি আর কতক্ষণ দেখা যায়! নিরস যখন সব কিছু, তখন অক্টোবর মাসের শেষের দিকে চাদরের তলা দিয়ে বেরিয়ে পড়া ‘সারপ্রাইজ’ জমিয়ে দেয় ভোটের লড়াই। ঠাণ্ডা শীতল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আর এর ঠিক আগে আগে এরকম ‘সারপ্রাইজ’ উত্তপ্ত করে চারদিক। এই উত্তাপ টের পাইয়ে দেয় এবং এবারও দেবে, কত গমে কত কর্নফ্লেক্স হবে!

২০১৬ সালের নির্বাচন বলে বলছি না। সেই ১৯৬৮ সালের নির্বাচনের আগে আগে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ তৈরি করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পছন্দের প্রার্থী তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিউবার্ট হামফ্রে’কে জিতিয়ে আনার জন্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তখন। হঠাৎই বোমাবাজি বেড়ে গেল উত্তর ভিয়েতনামে, হামফ্রে বেশ কিছু ভোট পেয়ে গেলেন। যদিও শেষমেষ জিতেছিলেন রিচার্ড নিক্সন।

১৯৭২ সাল। চার বছর পর আবার আসা নির্বাচনে একই ভিয়েতনামি বড়ি আর খাওয়ানো যাবে না ভেবে হামফ্রে’র বন্ধু হেনরি কিসিঞ্জার নির্বাচনের ঠিক বারো দিন আগে একটি প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন। ‘পিস ইজ এ্যাট হ্যান্ড’ নামের কিসিঞ্জারের সেই চালবাজি বক্তব্য নিক্সনের ঘাড়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের দায়ভার লটকে দিল এবং ভোটারদের হাত থেকে খসিয়ে নিল বেশ কিছু ভোট, যা কিনা নিক্সনের ঝুড়িতেই যাওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিসিঞ্জারের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’  নিক্সনের ভোট কিছু কমাতে পারলেও শেষমেষ জয়ী হলেন নিক্সনই।

১৯৮০ সালের ‘সারপ্রাইজ’ কেমন ছিল, মনে আছে? রিপাবলিকান প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যান জয়ী হতে শেষ মুহূর্তে যে বিতর্কটি উস্কে দিয়েছিলেন তা আমেরিকানদের মাঝে খুব জনপ্রিয় ‘ইরান’ ইস্যু। সে সময় ইরানের সাথে আমেরিকার কূটনৈতিক ঝামেলা চলছিল, ৫২ জন আমেরিকান কূটনীতিক ও নাগরিক ইরানের ছাত্রদের ঘেরাওতে পড়ে তেহরানস্থ আমেরিকান দূতাবাসে বন্দি থাকতে বাধ্য হয়। ইরানবিরোধী আমেরিকান জাতীয়তাবাদ ডেমোক্রাট প্রার্থী প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে দ্বিতীয় বারের মতো প্রেসিডেন্ট হতে দিল না। ফিসফাস ছিল যে রিগ্যানের সাথে ইরানের সরকারের গোপন চুক্তি হয়েছিল, আর এর ফলেই ঘেরাও-নাটক দিয়ে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ এসেছিল এবং রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন। এই ফিসফাস তদন্তের দাবিতে গিয়ে পড়লেও রোনাল্ড রিগ্যান ক্ষমতায় ছিলেন বলে এগুতে দেননি।

বুশ ভার্সেস ক্লিনটন যখন ১৯৯২-তে, তখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ‘বিক্রি’ হলেন ভোটের তুরুপের তাস হিসেবে। রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার ডিফেন্স সেক্রেটারি কাসপার ওয়েনবার্গার যে তথ্যটি ফাঁস করেছিলেন, তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র টিওডব্লিউ মিসাইল ইরানের হাতে তুলে দিয়েছিল ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিপুলাকারের ট্যাঙ্ক আর্মিকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। সাদ্দামকে ঠেকানো যেতে পারে, কিন্তু মিসাইল কেন যাবে ইরানের হাতে আর কেনই বা এ তথ্য জেনে ফেলবে সবাই? জর্জ বুশের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার আশায় বালি পড়লো, কেননা তিনি ওয়েনবার্গারকে ক্ষমা করার মতো ‘মহত্ব’ দেখালেন। দমে যাননি জর্জ বুশ। ২০০০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে আবারো নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইলেন। নির্বাচনের ঠিক ক’দিন আগে, খ্যাতনামা ডিফেন্স এ্যাটর্নি থমাস জে. কন্নোল্লি নথিপত্র ঘেঁটে জানালেন, অনেক অনেক দিন আগে, ১৯৭৬ সালে জর্জ বুশ মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের জেরার মুখে বেচারা জর্জ বুশ এ তথ্য সত্য বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। আল গোরকে হারিয়ে জর্জ বুশ সেবার প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন বটে, তবে টের পেয়েছিলেন কত গমে কত কর্নফ্লেক্স হয়!

২৭ অক্টোবর, ২০০৪। ইরাক থেকে বিস্ফোরক লাপাত্তা হয়ে গেছে, এরকম একটা খবর প্রকাশ করেছিল দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। জন কেরি এর জন্য দোষারোপ করলেন বুশ প্রশাসনকে। পত্রিকা ভুল খবর ছেপেছে বলে দোষ এড়ানোর চেষ্টা চললো। এর দুই দিন পর আল জাজিরা ওসামা বিন লাদেনের ভিডিও ছেড়ে দিল, ১১ সেপ্টেম্বরের কুকর্ম লাদেন-ই করেছে বলে প্রমাণ করতে চাইল। জর্জ বুশ পৃথিবী যে সন্ত্রাসের কবলে পড়তে যাচ্ছে বলে বলতেন, তার পক্ষে এল লাদেনের বক্তব্য-‘য়্যুর সিকিউরিটি ইজ ইন য়্যুর ওঅন হ্যান্ডস’ জর্জ বুশকে জিতিয়ে আনতে সৌদি কর্তৃপক্ষ তেলের দাম কমিয়ে এনেছিল ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’-এর অংশ হিসেবে, এমন রটনাও কিন্তু আছে। কেননা জর্জ বুশের হোয়াইট হাউজের বাসভবনে সৌদি রাজপুত্র বান্দার সপরিবার ঢুকে যেতে পারতেন যখন তখন।

বারাক ওবামা ভার্সেস ম্যাককেইন যখন চলছিল সেই ২০০৮-এর নির্বাচনের সময়, তখনও এসেছিল ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’। বারাক ওবামা’র ফুপু জেইতুনি ওনিয়াঙ্গা বোস্টনে নাকি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বাস করতেন, এমন খবর প্রকাশ করেছিল এসোসিয়েটেড প্রেস। বেচারিকে ২০০৪ সালেই আমেরিকা থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়, তবে ভোটের খেলায় শিরোনাম হতে হয় ঠিকই। এর চার বছর পর বারাক ওবামা যখন দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচনে দাঁড়ালেন, তখন ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ হিসেবে আবির্ভূত হল হারিকেন স্যান্ডি। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোতে বিরোধী শিবিরেরও প্রশংসা পেয়ে গেলেন ওবামা প্রশাসন। এবারে আরেক দফা ‘সারপ্রাইজ’ এসেছিল, যখন বামপন্থী ম্যাগাজিন মাদার জোন্স জানাল, শতকরা ৪৭ ভাগ আমেরিকান আয়কর দেন না। ২০১২ সালের মে মাসে পাওয়া তথ্য কেন পত্রিকাটি অক্টোবরে এসে ছাড়ল, তা বুঝতে সমস্যা হয়নি কারোরই। বারাক ওবামা প্রশাসনকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল কেন আয়কর না দিয়ে আরামে থাকতে পারার মতো ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে, সে প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জন্য কেবল ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’, তা কিন্তু নয়। এরকম টের পেতে হয়েছিল পেশিমানব আর্নল্ড শোয়ার্জনিগারকেও। ২০০৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হতে চাইলেন তিনি, অক্টোবরের ২ তারিখে খবর প্রকাশিত হল পত্রিকায় যে পেশিমানব চারিত্রিক দিক থেকে কালিতে আচ্ছন্ন। শুধু কি চরিত্র? ১৯৭৫ সালে শোয়ার্জনিগার নাকি এ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা করে পত্রিকায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। এতসব কালিমা অবশ্য থামাতে পারেনি ‘কমান্ডো’ হিরো আর্নল্ড শোয়ার্জনিগারের জনপ্রিয়তা। তবে ভোটের যোগফলের ফিগার ছেঁটে দিল অনেকটা, ফলে ভোটের বাজারে দাম কমিয়ে দিয়েছিল অনেকখানি।

এবার মন দিতে চাই ২০১৬ সালের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ কার পালে হাওয়া তুলছে, সে বিষয়ে। ৭ অক্টোবর তারিখে উইকিলিক্স হিলারী ক্লিনটনের ইমেইল ও নানান ব্যাংকিং কাগজপত্র ফাঁস করে। বোঝা যায়, হিলারী ক্লিনটন ব্যক্তিগত ইমেইলের মাধ্যমে সরকারি গোপনীয় তথ্য আদানপ্রদান করেছেন এবং তিনি শেয়ার বাজারের ফড়িয়াদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। হিলারী ক্লিনটনকে নিয়ে ‘সারপ্র্ইাজড’ আমেরিকানদের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদি রসাত্মক আলাপচারিতা আর আয়কর ফাঁকি দেওয়ার সত্যকে ‘সারপ্রাইজ’ হিসেবে হাজির করা হল। জন ম্যাককেইন, কন্ডোলিৎসা রাইওসের মতো রিপাবিলিকান হেভিওয়েট নেতারা ‘সারপ্রাইজড’ হয়ে ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সমাজে মুখ রক্ষা করতে চাইলেন। ট্রাম্প ওদিকে বার বার বলছেন, ‘আমি মোটেও ওরকম নই’। তার স্ত্রীও বলছেন, ‘আমি যে ট্রাম্পকে চিনি, তিনি ওরকম নন।’ হিলারী নিজের ‘সারপ্রাইজ’ হজম করে ট্রাম্পকে ‘সারপ্রাইজড’ করে খুশি মনে হাততালি দিচ্ছিলেন। আর তখনি নাট্যমঞ্চে আবির্ভাব ঘটল জেমস কমি নামের এক দারুণ চরিত্রের, যিনি কি না এফবিআই পরিচালক। তারিখটাও বড্ড বিপদজনক- ২৮ অক্টোবর।  হিলারী ক্লিনটনের ইমেইল বিতর্কের ‘সঠিক তদন্ত’ প্রয়োজন বলে জেমস কমি পত্র মারফত জানালেন কাকে? কংগ্রেসকে। আরো নতুন কিছু ইমেইল হাতে পাওয়াতে এরকম মনে হয়েছে তার। আরো নতুন কিছু ইমেইল কেন হাতে এল? কোথা থেকে এল? হিলারী ক্লিনটনের ভারতীয় বংশোদ্ভূত সহযোগী হুমা আবেদীনের সাবেক স্বামী, সাবেক কংগ্রেসম্যান এন্থনি ওয়েইনার চরিত্র হারিয়ে কম্পিউটারে যা তা ছবি রেখেছিলেন, সে সব কেন যেন অক্টোবরেই ঘাঁটতে হল, আর সেসব ঘাঁটতে গিয়ে হিলারীর ইমেইল ‘আবিষ্কৃত’ হল। এতে ‘সারপ্রাইজড’ হবেন না বলে জানিয়ে দিলেন হিলারী। সে তো চলবে না। হিলারী যাতে ‘সারপ্রাইজড’ হন, সে জন্য ঐ একই দিনে হিলারী ক্লিনটনের দশ বছর আগেকার একটি রেকর্ডিং উন্মুক্ত হল। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনে যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন হিলারী, সেটাই প্রমাণিত হল। এই ‘সারপ্রাইজ’ ঢাকতে গিয়ে হিলারী বরং কমি’কে গালমন্দ করতে শুরু করলেন। এফবিআই পরিচালক নিরপেক্ষ নন বলে অভিযোগ তার।

এখন দেখার পালা, কত গমে কত কর্নফ্লেক্স হবে আর এই কর্নফ্লেক্স কোন্ প্রার্থী খাবেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কে কোথায় ভোট দেবেন তা ইতোমধ্যে নির্ধারণ করে ফেলেছেন ভোটাররা। এবারের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ প্রার্থীদের ওজন কম বলেই বেশি প্রভাব ফেলবে না। তবে অনেকের ধারণা, ‘দুইজনের ভেতর কে বেশি মন্দ’ এটা বুঝতে নাকি শেষ মুহূর্তের এই ‘সারপ্রাইজ’ কাজে দেবে। হিলারী ক্লিনটনের তুলনায় বেশি মন্দ যে ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার অবস্থান কিন্তু হিলারীর থেকে খুব বেশি পেছনে নয়। শেষ মুহূর্তে হিলারী ক্লিনটন যে ‘সারপ্রাইজড’ বলেই বিমর্ষ হয়ে আছেন, তার প্রভাব তো পড়বেই। আর তাই এবারের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ ইতিহাসের পথ ধরে হিলারীর কিছু ভোট ট্রাম্পের ঝুঁড়িতে এনে ফেলে শেষ দৌড়ে ট্রাম্পকে বিজয়ী করবে কি? এই প্রশ্নের জবাব মিলিয়ে নিতে খুব বেশি অপেক্ষার তো দরকার নেই,  ভোটের দিন তো এসেই গেল।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।