লাখো লাখো মিরাজদের বাড়ি করে দেবেন কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী??

ইঞ্জিনিয়ার আশিকুর রহমান

দেশের তরুণ ক্রিকেটার মিরাজের পরিবারকে বাড়ি করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার দাবীদার এই নির্দেশনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, বেকার সমাজের একজন প্রতিনিধি হয়ে এই নির্দেশনাকে বাহবা দিতে গিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন আমাকে তাড়া করছে! মিরাজকে কেন বাড়ি করে দিতে হবে?? পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি- স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিওবা সেই নির্দেশনা দেন, সেটা কেন জনগনের টাকায়?

মিরাজ খেলোয়াড়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়। খুব ভালো মানের স্কেলে বেতনভোগী। ২০ বছর বয়সের মিরাজের যে মাসিক আয়, তাতে বাড়ি কিংবা রাজপ্রাসাদ বানানো কঠিন কিছু হবে বলে মনে করি না। মিরাজের বাবা কর্মক্ষম মানুষ। মিরাজ এখন লাখোপতি।ও খুব ভাল খেলেছে, আরও ভালো খেলবে এই আশাবাদ আমাদের। আমরা ওকে ধন্যবাদ দিয়েছি, প্রশংসা করেছি। আবেগে ওর বাড়ির বন্দোবস্ত হচ্ছে। তাই বলে কি জনগণের টাকায় বাড়ি করে দিতে হবে??

অথচ শত শত মিরাজ রাস্তায় ভয়াবহ পর্যায়ের মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে প্রতিটি সকালে চাকুরীর আশায় ঘুরতে ঘুরতে সরকারী চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমাও পেড়িয়ে যাচ্ছে অনেকের। তাদের অনেকের বাবা নেই, মা নেই। যাদের বাবা-মা আছেন, সন্তানের রোজগারের প্রত্যাশা নিয়ে ষাটোর্ধ বয়সের অনেক বাবা এখনো রিকশা চালান, অনেক মায়েরা এখনো খালা পরিচয়ে এই সমাজের বড়কর্তাদের বাসায় ঝি’এর কাজ করছেন। বেকাররা টিউশন নামের বেঁছে থাকার নির্মম এই অবলম্বনটি আঁকড়ে ধরে এখনো আত্মহত্যার পথ খুঁজে নেইনি! (তবে হয়ত সেখানেও আমাদের ট্যাক্স কর্মকর্তারা খুব শিগ্রই হানা দিতে পারে!)

“বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ’ ২০১৫ অনুসারে- সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩০ হাজার এবং অন্য বছরের তুলনায় হার বেড়েছে বেকারত্বের। আর এইধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৯ সাল শেষে মোট বেকারের সংখ্যা বর্তমানের দ্বিগুণ হয়ে যাবে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএলও”। সরকারি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরলাম। কিন্তু বেকার সমাজের বাসিন্দাদের দুঃখ দুর্দশা আরও ভয়াবহ। প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতায় আমাদের দুর্ভাগা বোনদের ধর্ষণের নিউজ পাওয়া যায়। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন- এ সমাজে মেয়েরাই শুধু ধর্ষিতা হয় না। ধর্ষিত হয় আমার মত অনেক বেকার ছেলেরাও। আপনজন, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা সমাজের প্রতিটি মানুষের কথার আঘাতে দিনের পর দিন বেকারদের উপর নির্মম ধর্ষণ চলতেই থাকে!
বেকাররা যে কিছু করার চেষ্টা করছেনা তা কিন্তু নয়। নিজেদের ভেতরের প্রচণ্ড তাগিদ নিয়ে যুদ্ধ জয়ের লক্ষে চাকরির বাজারে নামা মাত্রই প্রচণ্ড ধাক্কা খেতে হয় প্রত্যেক বেকারকেই। চাকরির পসরা সাজানো সব দোকানে গিয়ে বারবার ফিরে আসতে হয় শূন্য হাতে। সদ্য পাস করা এক তরুণের ঝুলিতে মেধা ও দক্ষতা থাকতে পারে, অভিজ্ঞতা তো নয়। কিন্তু প্রায় সব চাকরির জন্যই ‘অভিজ্ঞতা আবশ্যক’!

তাছাড়া, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট নিয়ে দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে অনেকেই চাকুরীর বাজারের দুষ্প্রাপ্যতায় এখন ব্যাংকের সেকেন্ড ক্লাস অফিসার কিংবা বিসিএসের জন্য এমপি৩ সিরিজ মুখুস্থের লড়াইয়ে কোন রকম বেঁছে আছেন! আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য বড় ভাইদের দেখেছি যারা নিজের বিভাগে ফার্স্ট হওয়ার পরে গত ৫ বছর ধরে এখনো স্বপ্ন দেখেন চাকুরী পাওয়ার, যেখানে শুধুই যোগ্যতা দেখা হবে, দেখা হবে না তথাকথিত অভিজ্ঞতা কিংবা মামা-চাচাদের বড় হাত!! কিছু বড় ভাইতো আউটস্ট্যান্ডিং রেজাল্ট নিয়ে এম ফিল শেষ করে এখনো সেই সোনার হরিণের অপেক্ষায় প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছেন।

বেকার থাকাটা কতটুকু ভীষণ কষ্টের, একবারও অনুধাবন করেছেন কি এই সমাজের বড়কর্তারা? আর কতটুকু যোগ্য হলে বেকার সমাজের প্রত্যেক ধর্ষিত শিক্ষিত মানবের দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা হবে; প্রত্যেকের থাকার জন্য অট্টালিকা দরকার নেই, অন্তত পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকার একটি কক্ষ পাওয়া যাবে; খুব ভালো মানের চাকুরী দরকার নেই, অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া যাবে; প্রত্যেকের প্রাইভেট গাড়ী দরকার নেই, অন্তত ভাঙাচুরা পাবলিক পরিবহনে ঝুলে ঝুলে চলাচলের নিরাপত্তা পাওয়া যাবে??
শুধু এক ক্রিকেটার মিরাজ নয়, এদেশের যোগ্য লাখো লাখো মিরাজদের বেঁছে থাকার সমস্যা সমাধান কি উন্নয়নের মহাসড়কে স্থান পাবে না? অভিশপ্ত বেকারদের বেঁছে থাকার লড়াইময় জীবনের নির্মম কষ্ঠের অধ্যায় থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে কোন মহৎ যুগোপযুগী পরিকল্পনা আছে কি সমাজের কর্তাদের? আপনার নেতৃত্বের ও দেশের উন্নয়নের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে জানতে চাই- লাখো লাখো মিরাজদের বাড়ি করে দেবেন কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী??

লেখকঃ

এরাসমাস মুন্ডুস ফেলো

Sapienza Università di Roma

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।