পাকিস্তান: কাকের মাংসও কাকে খায়

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির মধ্যমসারির এক নেতার সঙ্গে ফেসবুকে কথা হয় প্রায়ই। নাম সাইফুল্লাহ ইউসুফজাই। বছরকাল ধরে দু’জনের বন্ধুত্ব। প্রথম দিকে একাত্তরে পাকিস্তানের বর্বরতা নিয়ে জানাতাম। এড়িয়ে যেতেন তিনি। তবে কিছু তরুণ পাকিস্তানিকে যেভাবে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট দেখেছি, তিনি তার ব্যতিক্রম। প্রথম দিকে অনুমান হতো তেমনি।

সম্প্রতি তিনি মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
গত সপ্তাহে কুয়েটায় জঙ্গি হামলায় ৬০ পুলিশ ক্যাডেট নিহত হওয়ার পর তাকে লিখলাম—একাত্তরে আমাদের দেশে এভাবেই তোমাদের মিলিটারিরা মানুষ খুন করেছে। এরপরই তার প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হয়। প্রথমই তিনি ক্ষমা চাইলেন একাত্তরে নৃশংসতার জন্য। এরপর একে-একে বলতে থাকেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও সরকারগুলো কিভাবে বেলুচদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে, সে সম্পর্কে। বললেন, তারপরও পাকিস্তানকে তোমরা যখন টেররিস্ট কান্ট্রি হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাও, তখন খুব কষ্ট পাই। ভাবি, আমরা তো মুসলমান, আমাদের ধর্ম কি এই শিক্ষা দিয়েছে? কিন্তু এই সন্ত্রাসীদের কারা বানিয়েছে, সেই প্রশ্ন তুমি করার আগে আমিই বলছি, এর জন্য দায়ী পাকিস্তানের আগ্রাসীনীতি। এখানে গণতন্ত্র বিকশিত না হওয়া এবং যুগের পর যুগ সন্ত্রাস লালন করার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

এই ভাবনা যখন পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে তখন সঙ্গত কারণেই মনে হতে পারে—ভারত থেকে বৃহস্পতিবার যে পাকিস্তানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছে কিংবা এর আগে বছরকাল আগে আমাদের দেশ থেকে যখন পাকিস্তানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছে—দু’টিই ছিল যৌক্তিক। আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানের মিত্রদেশখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রও তো বলছে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে। সম্প্রতি ভারত চেষ্টা চালিয়েছিল এই অভিযোগে পাকিস্তানকে একঘরে করার জন্য। কিন্তু পাকিস্তান সবসময়ইতো বলে আসছে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসকে মদদ দেয় না। তারা যে ধোয়া তুলশিপাতা না। এর পেছনে অসংখ্য যুক্তি আছে। বৃহস্পতিবার মেহমুদ আখতারকে ভারত থেকে বহিষ্কারের পেছনেও গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে মেহমুদ আখতার ভারতের নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহকালে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। যেমনি আমাদের দেশে সরাসরি আটক হয়েছিলেন আরেক পাকিস্তানি কূটনীতিক। তাদের এসব কর্মের অনেক তথ্যতো ছড়িয়ে আছে।

আইএসআই নামের বিষফোঁড়ার বিষ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমিত হওয়ার কথা আমরা জানি। আমাদের যাতনা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন দু’য়েকটা শব্দ উচ্চারণ করি মাত্র। পাকিস্তান যে খুনি-সন্ত্রাসীদের পক্ষের রাষ্ট্র, তা বাংলাদেশ এখনও দেখে। আমাদের দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকালে অত্যন্ত নগ্নভাবে ওরা খুনিদের পক্ষ অবলম্বন করে। তাদের জাতীয় সংসদে যখন খুনিদের পক্ষে শোকপ্রস্তাব পাস হয়েছে। এরপর আর কী বলার থাকতে পারে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ লালন বিষয়ে?

তবে আজরাইলের প্রাণ নিজেই সংহারের যে কথা চালু আছে, সেটা তাদের ক্ষেত্রে ফলতে শুরু করেছে। একের পর এক জঙ্গি হামলা পাকিস্তানের বাতাসকেই এখন রক্তমাখা করে দিচ্ছে। সাইফুল্লা ইউসুফজাইয়ের হতাশার কারণও স্পষ্ট দেখা যায় বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোতে। কুয়েটায় ৬০ খুনের ঘটনা বলে দেয়, পাকিস্তানের জঙ্গিরা পাকিস্তানেও খুনে লিপ্ত। সেটিও কি একমাত্র উদাহরণ? মাত্র তিন মাস আগে পাকিস্তানে ৭০ আইনজীবীকে খুন করলো জঙ্গিরা। বছর কয় আগে পেশোয়ারে স্কুলে হামলা করে তালেবানরা দেড়শতাধিক শিশুকে খুন করেছে। এমন পরিসংখ্যানতো একের পর এক দিলেও শেষ হবে না। সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টাল ( এসএটিপি) তথ্য দিয়েছে, শুধু ২০১৬ সালে সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানে ৮৩১জনের প্রাণ গেছে। যাদের মধ্যে ২২২জনই বেসামরিক মানুষ। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ১০২জন আর সন্ত্রাসী মারা গেছে ৫০৭জন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানোর জন্য সন্ত্রাসীরা যেসব হামলা করে, তার মধ্যে ৮১টিই অস্বাভাবিক শক্তিমত্তার প্রমাণ দেয়।

আজকে পাকিস্তানের এই দুর্দশাকে তো পাকিস্তানই তৈরি করেছে। তাদের এই পৃষ্ঠপোষকাতার পেছনে কাজ করেছিল তাদের শত্রুদেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করার মতো ঘৃণ্য মানসিকতা। বিশেষ করে ভারতীয় কাশ্মিরে তালিবানদের উস্কে দেওয়া তাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের সহযোগিতার বিষয়টিতো আজ প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গুরু পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রই বলেছে, তাদের অপকর্মগুলোর কথা। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তারা যে সন্ত্রাস লালনকারী দেশের তালিকা করেছিল সেখানে স্পষ্টতই পাকিস্তানের নাম উল্লেখছিল সামনের কাতারে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে সেই পাকিস্তানকেই আবার সন্ত্রাস দমনের নামে সন্ত্রাসী কাজে সহযোগিতাও করছে তারা। এমন অভিযোগও আছে। পশ্চিমা সাংবাদিক স্টিফেন সোয়ার্টস ও গর্ডন থমাস স্পষ্টতই দেখিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান কিভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। সোয়ার্টস বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি সহযোগিতা করে থাকে। ক্যাটু ইনস্টিউটের সিনিয়র ফ্যালো টেড গ্যালেন কার্পেন্টার বলেছেন, ইসলামাবাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া আফগানিস্তানে তালিবানরা কোনোভাবেই ক্ষমতায় আসতে পারতো না। ১৯৯০ এর মাঝামাঝি আফগানিস্তানে তালিবানরা যখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আরও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সেই মুহূর্তে পাকিস্তান তাদের অস্ত্র থেকে প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে ক্ষমতাসীন করে দেয়। পহেলা সেপ্টেম্বারের যুক্তরাষ্ট্রে জঙ্গি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানকে চাপ দেয় তখনই তারা কিঞ্চিৎ সরে আসে। যা ছিল সাময়িক মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানিও স্বীকার করেছেন পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে সৌদি আর্থিক সহযোগিতায় কিভাবে জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। লেখক ডেনিয়েল ব্যামেন বলেছেন, পাকিস্তান হচ্ছে প্রথমকাতারের একটি দেশ যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদকে লালন করে।

২০০৬ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে ট্রেইনে বোমা বিস্ফোরণ, ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় পার্লামেন্টে হামলা, ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে বারানসিতে বোমা হামলা,২০০৭ খ্রিস্টাব্দে হায়দ্রাবাদে বোমা হামলা, ২০০৮ সালে মোম্বাইয়ে হামলার জন্য ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছে।

পারভেজ মোশাররফ তো স্বীকারই করেছেন, কাশ্মিরে হামলা করার জন্য পাকিস্তান লস্করই তৈয়বাকে প্রশিক্ষণসহ সমর্থন জুগিয়েছে। ওই সময় কাশ্মিরের হাফিজ সাঈদ এবং লাখবিকে তারা হিরো হিসেবে মনে করতেন। তালিবানদের তারা প্রশিক্ষণ দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠিয়েছিলেন। জাওয়াহারি ও ওসামা বিন লাদেনকে তখন পাকিস্তান মনে করতো মহানায়ক হিসেবে। শুধু তাই নয় পাকিস্তান তাদেরই পরবর্তীকালে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীকে তারা সহযোগিতা করার পরও প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না সরকারিভাবে। কিন্তু এটা ঠিক ধর্মীয় উম্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে পাকিস্তান জঙ্গি তৈরিতে সহযোগিতা করে আসছে, ভবিষ্যতে এই গোষ্ঠীগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশেও বড় রকমের কোনও হামলা করে বসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর সেটাও যে পরিচালিত হবে, পাকিস্তানের ভেতর থেকে তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং পাকিস্তানে জঙ্গিকারখানাগুলোকে বাড়তে দেওয়ার মাধ্যমে কেউ যদি মনে করে যে, তাদের দেশ নিরাপদে থাকবে, তা বোধ করি ঠিক হবে না।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো, ভারত, রাশিয়া,যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র,বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের মতো দেশকে আরও এক হাত নিতে ভুল করবে না, তা অন্তত সহজেই অনুমান করা যায়। কারণ তারা এই দেশগুলোকে নিজেদের শত্রু শিবির মনে করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জঙ্গি হামলাগুলোর পেছনে পাকিস্তানের মদদ কতটা আছে, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন আছে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানি একাধিক কূটনীতিককে প্রমাণসহ ধরে ফেলার প্রমাণও বাংলাদেশে আছে। কিন্তু তারা কূটনীতিকের বর্মকে ব্যবহার করে প্রতিবারই পার পেয়ে যায়। যেমনি সম্প্রতি ভারত থেকেও পার পেয়ে গেছে। বাংলাদেশকে তাই আইএসআই সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে—পাকিস্তান একটি জঙ্গিরাষ্ট্র। জঙ্গি রাষ্ট্রের সঙ্গে শুধু বাণিজ্য সুবিধার কথা চিন্তা করে নমনীয় আচরণ করা হয়, তাতে আখের ভালো না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

বিভিন্ন মহল থেকে অনেক আগে থেকেই দাবি করা হচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিন্মপর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ ঢিমেতালে এগিয়ে যাচ্ছে। গতিহীন থেকে কি তালেবানি হামলা থেকে বাংলাদেশ রক্ষা করতে পারবে?

মোস্তফা হোসেইন
লেখক: গবেষক

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।