‘অনুভূতিহীন’ ধর্মীয় অনুভূতি

এক.
প্রতিবছর পূজার আগে পরে কিংবা বিভিন্ন পূজার মাঝামাঝি পর্যায়ে অল্প কিংবা বৃহৎ পরিসরে মন্দির কিংবা পূজামণ্ডপে আক্রমণ, প্রতিমা ভাঙা খুব সাধারণ এবং সহনীয় এক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভাংচুরের সামাজিক কাম্যতা এতাটাই প্রবল যে এই নিয়ে এখন আর খুব বেশি হৈচৈ হওয়ার প্রয়োজনও হয়না। সবাই কেমন যেন মনে করে এমনটাই হবে। তাই প্রতিবছর পূজার আগে বা পূজার সময় আনন্দ যেমন এদেশে হিন্দুদের আপ্লুত করে তেমনি প্রতিমা বা মন্দিরে ভাংচুরের ভয়টিও নিঃসন্দেহে তাদের প্রতিবছরই তাড়া করে। তারা জানে এই মন্দির বা প্রতিমা ভাঙা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, অসাবধাণে হঠাৎ করে ফসকে যাওয়ার মতো কোনও কিছু নয়। তারা নিশ্চিতভাবেই জানে এটি তাদের প্রতি ভয়, আতংকময় পরিস্থিতি তৈরি করা এবং হুমকি প্রদর্শনের এক সহনীয় মহড়া, যেই মহড়ায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো চুপচাপ থাকে, এলাকার এমপিরা পাশে থাকেন না, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কা কা রব ওঠে না। কারণ এর মধ্যেই দীর্ঘদিনের চর্চিত সাম্প্রদায়িকতার বাহাসে তারা জেনে গেছে ধর্মীয় অনুভূতির ইজারা এই দেশে শুধুই মসলমানদের, এর বাইরে আর কারও নেই। তাই তারা ধর্মীয়ভাবে ‘অনুভূতিহীন’। ক্ষতিপূরণের আশ্বাসের ক্ষমতায় বাইরে আসতে দেওয়া হয় না্ সংখ্যালঘুর ধর্মীয় বিশ্বাসের দীঘর্শ্বাসকে।

দুই.
হ্যাঁ, এই লেখার জমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। তবে এটি যেকোনা জায়গার চিত্রও হতে পারে, যেমন হয়েছিল চার বছর আগে রামুতে। যেখানে গত শুক্রবার কোনও এক ‘সত্য’-‘অসত্য’ ফেসবুক একাউন্টের কোনও এক ‘পরিকল্পিত’ স্ট্যাটাসে মিলন ঘটিয়েছে আওয়ামী, বিএনপি জামাতের, ভেঙেছে হিন্দুদের শক্তির দেবী কালীর প্রতিমা। এই ঘটনার বিবরণ দিতে কোনও কোনও মিডিয়া বলেছে হিন্দুদের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। মূর্তি এবং ধর্মীয় প্রতিমার মধ্যে পার্থক্য বহুজ। প্রতিমাকে মূর্তি হিসেবে উপস্থাপণ এক ধরনের ধর্মীয় অবমাননা এবং যার মধ্য দিয়ে এই নিপীড়নের থাঁচাকে সহনীয় করার রাজনীতি থাকে। বুঝে বা না বুঝে, অনেক মিডিয়া এইভাবেই নিপীড়নের বৈধতা তৈরি করে, যার মাধ্যমে নিপীড়নের সঙ্গে এক ধরনের অভ্যস্ততা এবং অবহেলার সম্পর্ক তৈরি করা হয়। তবে নাসিরনগরের নিপীড়নের পদ্ধতিটি একেবারে নতুন নয়, কুশীলবরা হতে পারেন নবাগত, তবে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। চার বছর আগের আরেকটি সাম্প্রদায়িক আক্রমণের পুনউৎপাদন। সেটি হয়েছিল রামুতে, বৌদ্ধ ধম্বালম্বীদের ওপর। এই পুনউৎপাদনের মেজাজ, উত্তেজনা কিংবা মর্জি তখনই বেয়াড়া হয়ে ওঠে যখন কুশীলবেরা জানে এই ঘটনাগুলোর কোনও বিচার হয় না এবং হবে না। কারন এটিকে কখনও রাজনৈতিকভাবে দেখা হয় না। কিন্তু আমার মন জানতে চায় কী কারণে রসরাজের মতো সাধারণ এক গ্রামের নাম স্বাক্ষর জানা বা অক্ষর চিনে কিছুটা পড়তে পারা ছেলেটি এই ঘটনার এক অদেখা নায়ক হয়ে ওঠে সেটি তদন্ত জরুরি। আর কিভাবেই বা কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই ফেসবুক একাউন্টটির লক্ষ লক্ষ অনুসারী হয়ে যায় সেই প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নের সীমানায় আনা গুরুত্বপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের জরুরি ফয়সালা, তার মধ্যে একটি হলো- বিভিন্ন ইস্যুতে দুই মেরুতে অবস্থান নেওয়া ক্ষমতাসীনদল আওয়ামী লীগ, বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ধর্মীয় নিপীড়ন কিংবা জাতিগত নিপীড়নের ময়দানে এক কাতারে নিজেরে দাঁড় করায়। তখন তারা দলীয ভেদাভেদ ভুলে যান তাদের পরিচয় তখন হয়ে ওঠে শুধুই ধর্মীয় কিংবা জাতিগত সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি।

তিন.

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার বিবরণ এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং কিভাবে এই প্রতিমা ভাংচুরের মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘু নিপীড়ন একটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায় সেই বিষয়ে আলোকপাত করাই এই লেখার মূল ঝোঁক এবং কিভাবে এই চর্চিত সংস্কৃতি প্রশ্নহীনভাবেই সামাজিকভাবে জায়েজ হয়ে ওঠে সেটিরই খোলামেলা তদন্ত এই লেখাটি। ছোটবেলা থেকেই ‘লাল পিঁপড়া আর কালো পিঁপড়ার গল্পের মধ্যেই শিশু বয়সে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ সমাজ শিশুদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, সেটির আরও ঠাসা এবং শক্ত বয়ান জারী থাকে পাকিস্তান আমলে হওয়া শত্রু সম্পত্তি আইন এবং বাংলাদেশ আমলে বর্তমান থাকা অর্পিত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে। হিন্দু মানেই শত্রু -পাকিস্তান আমলের জন্ম নেওয়া এই অতি শক্তিশালী ডিসকোর্স তলে তলে আসলে এই সবের বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করে। যার কারণে ‘ভারত যাবি কবে?’- জাতীয় বাক্য হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের প্রতি ঠাট্টার প্রধান অংশ হয়ে ওঠে। আর এই একই কারণে ‘মালাউন’, ‘হানুদ’ (সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত) কিংবা ‘ডেডা'(উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচলিত) হিন্দুদের প্রতি গালি হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। এবং ঠিক একই মনস্কতায় ভারত-বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলার দিন হিন্দু বন্ধুটিকে ‘আজ কোন দলের সমর্থক?’ প্রশ্নটি ছুড়েঁ দিয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে তারই দীর্ঘদিনের বন্ধু-এই সবের চাষ বাস বহুদিন ধরেই চলছে এদেশে। তারই ফসল প্রতিমা ভাঙার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয় না, বহুদিন ধরেই এর চর্চা করতে হয়, যে চর্চা বাংলাদেশে বহুকাল ধরেই হচ্ছে।

চার.

এই লেখার মূল জায়গা নিপীড়নের রাজনীতি হিসেবে দেখা। কোনও ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হয়, কিছুদিন চলে থেমে যায়। আবার কিছুদিন পর একই ঘটনা ঘটে। এর কারণ আমরা বিষয়গুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে শিখিনি যতটা শিখেছি ‘ঘটনা’ হিসেবে দেখতে। তা্ সহজেই ভুলে যাওয়া হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স স্থায়ী, তাই এইগুলো চলতেই থাকে বিরামহীনভাবে। তাই ঘটনার পর সাময়িক প্রতিবাদরে চেয়ে জরুরি প্রতিনিয়তই প্রশ্ন তোলা আর সেটিকে জারি রাখা।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।