মুসলমানদের জন্য আমেরিকা আরেকটি কঠিন জায়গা হয়ে গেলো

নাহ, আমি একেবারেই হতাশ নই। বরং কিছুটা খুশিই হয়েছি বলতে পারেন। ট্রাম্প এর বিজয়ের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়ে গেল মার্কিন মিডিয়া যা বলে, জরিপওয়ালারা যা বলে- তার কোনটাই আসলে আমেরিকার জনতার মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না। আমেরিকা মূলত সুশীলতার বোরখা পরা একটা রক্ষণশীল, যুদ্ধবাজ, বর্ণবাদী জাত, যাদের মনের মধ্যে লোভ আর ঘৃণার বসবাস। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের মধ্যে দিয়ে আমেরিকা তার সুশীল মুখোশ থেকে মুক্তি পেলো। তারা তাদের আসল চেহারাটা দেখিয়ে দিলো।

ট্রাম্প এই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি। তিনি সাদা, পুরুষ, অহংকারী, বর্ণবাদী, আত্মপ্রেমী এবং ধুরন্ধর বেনিয়া। ট্রাম্প জেতায় যারা ভাবছেন সারা বিশ্ব একেবারে ধসে পড়ে যাবে তারা ভুল ভাবছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প পাগল হলেও, সেয়ানা পাগল।

সে ইলেকশন শুরুর দিকে ম্যাক্সিকোতে দেয়াল তুলবো দেয়াল তুলবো করে চেচিয়েছে, শেষ দিকে কিন্তু সেটাই একদম বেমালুম চেপে গেছে। তার কারণ, তিনি জানেন এসব কথার কথা। তিরিশ বিলিয়ন খরচ করে দেয়াল বানানোর মতন বোকা তিনি না। তাই সে এখন ম্যাক্সিকোর সাথে সুসম্পর্ক রাখার কথা বলছে।

একই রকমভাবে ট্রাম্প কালো মানুষদের সঙ্গে আলাপ পেড়েছে। প্রথমে দূরে ঠেলে দিলেও, শেষ দিকে সুর বদলে কালোদের কাছে টানার চেষ্টা ছিল ট্রাম্পের। তার কারণ, তার তো ভোট দরকার। তিনি জিততে চান। জেতার পর কি করবেন, সেটা অন্য হিসেব।

আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে এই জরিপওয়ালাদের জন্য। তারা মার্কিন জনতার পালস একটুও ধরতে পারলো না। এদের ব্যবসা বদল করা ছাড়া আর গতি আছে বলে মনে হয় না। কেননা এরা যান্ত্রিক ভাবে শুধু নম্বর গুণে গেছে। নম্বর দিয়ে যে মানুষ চেনা যায় না তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এবারের মার্কিন নির্বাচনে তাদের নিষ্ফল ভবিষ্যদ্বাণী।

এখন আসা যাক বাকি বিশ্বের কথায়। ট্রাম্পকে নিয়ে যারা ভয় পাচ্ছেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে। ব্যাপারটাকে সেভাবে দেখার কিছুই নেই। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই তিনটা প্রধান দেশের সাথে চমৎকার সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে। চীন, রাশিয়া আর ভারত। চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, তাই চীনের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরো ভালো হবে সে তো আশা করাই যায়। বাকি থাকলো রাশিয়া আর ভারত। এই দুই দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও ভালো হবে, টাকার অংকে ফুলে ফেঁপে উঠবে।

কেননা বেনিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের আসল ভাগ্য নিয়ন্তারা। এর কর্পোরেট দুনিয়া। তারা চায় ব্যবসা করতে, তারা চায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। তারা চায় আমেরিকা আবার মহান হোক, তবে অবশ্যই টাকা পয়সা দিয়ে। মনন দিয়ে, সংষ্কৃতি দিয়ে কিংবা সহনশীলতা দিয়ে এদের আর সারা বিশ্বকে তাক লাগানোর কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের যে বিধ্বংসী দখলদারী চেহারা, সেটা গত আট বছরে বিশ্ববাসী দেখে ফেলেছে। বারাক ওবামার কারণে সেটা একটু ঢেকে ঢুকে রাখা যেতো, সুশীলতাটুকু বজায় থাকতো। এখন আর তার দরকার হবে না। কারণ চাচাছোলা ডোনাল্ড ট্রাম্প সুশীলদের ধার ধারেন না।

মুসলমানদের জন্য আমেরিকা আরেকটু কঠিন জায়গা হয়ে গেলো। সেটা অবশ্য ৯/১১ পরবর্তী সময় থেকেই অনুভূত হচ্ছিল। তার তীব্রতা আরেকটু বাড়বে। তবে ট্রাম্প যেভাবে বলেছে, মুসলমানদের বের করে দেবেন, সেটা করতে পারবেন না। তার কারণ অর্থনৈতিক অবস্থানে মুসলমানদের কিছুটা হলেও ভূমিকা আছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানদের দুই একজনকে মারলে হয়তো কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু গণহারে দেশ থেকে বের কের দিতে চাইলে, সারা দুনিয়া ফুঁসে উঠবে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা কিংবা স্রাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য সমস্যার।

হাজার হোক আরব দেশের পেট্রোডলারে মোটা অংশটাতো আমেরিকার পেটেও যাচ্ছে। সেটা নিশ্চই ট্রাম্প নষ্ট করতে দেবেন না। কিছুতেই না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে যাওয়ায় কিছু মৌলিক সমস্যা হয়তো সৃষ্ট হবে। যুক্তরাষ্টের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মতামতকে আগে যে পরিমাণ গুরুত্বের সাথে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিংবা জি এইট, জাতিসংঘের মত বিশ্ব সংস্থাগুলো নিতো, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হয়তো আর সম্ভব হবে না। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প পড়ানো শেখানো বুলি আওড়ানোর মানুষ নন। তিনি নিজে যা বোঝেন তাই বলেন। মুশকিল হলো বিশ্ব রাজনীতির তিনি প্রায় কিছুই বোঝেন না।

তবে এবারের নির্বাচনে একটা জিনিস পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেলো। যে বিশ্বসভ্যতার স্বপ্ন আমরা দেখি, সেখানে পৌঁছতে আমাদের এখনো ঢের বাকি। এই পৃথিবীর বিরাট এক জনসংখ্যা এখনো ধর্ম, বর্ণের মতন বিষয় দিয়ে মানুষের বিচার করে। যতদিন সেটা চলতে থাকবে ততদিন বিশ্বশান্তি অনেক দূরের বিষয়, অনেকটা অধরা স্বপ্নের মতন কিছু হয়ে থাকবে।

গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
ঢাকাটাইমস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।