সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের নির্মমতা !

সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের অমানবিকতা নিয়ে “রাষ্ট্র তুমি মানবিক হও” নামে একটি বেশ নরম বাক্য দেখতে পাচ্ছি। ভাবছি, রাষ্ট্র কি ভিষণ জীবন্ত, আমার পাশের বাসার মেয়েটি। এই তুমি অমন কোরোনা তো, এরকম একটি ভাব। কেন? রাষ্ট্রকে কেন বলা হচ্ছে? রাষ্ট্র মানবিক হবে তখন, যখন আপনি মানবিক হবেন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আপনার। আপনি চাইলেই রাষ্ট্র ব্যাটা তুমুল মানবিক হয়ে শাহবাগ হতে পারে। হয়েছিলো না?

আপনি চাইলে এই সাঁওতাল পাড়াতেও অমানিবকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়। ‘আওয়ামী সরকার তুমি মানবিক হও’ এটি বলা যাচ্ছেনা কেন? ছবিতে দেখুন, একজন হতদরিদ্র অসহায় সাঁওতাল মানুষ কিভাবে সরকারি পুলিশের নির্মমতার শিকার হয়েছেন। পেলেট গানের আঘাতে তার অবস্থা দেখুন। আর ভাবুন, এই অমানবিকতার ভাগীদার আপনিও। এরাওতো সংখ্যালঘু। তবে এদের জন্য মমতা জন্মায় না কেন? স্বার্থ নেই বলে? সাঁওতাল কার্ড খেলা যাচ্ছে না বলে?

তবুও কিছু কথা মনে আসে। আমাদের জনগণের নিজেদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা তেমন ছিলোনা। মিলেমিশে থাকাও আমাদের রক্তে প্রবাহিত যা নিয়ে গর্ব করা যেতো। কিন্তু একদল এখন ক্ষমতায় গিয়ে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তারা নিজেদের জমিদার ভাবছে। আর আমাদের সেইভাবে শাসন ও শোষণ করছে। তাদের প্রজা যারা আমরা আছি, তাদের মধ্যে রয়েছে হিন্দু- মুসলমান, বিএনপি-জামায়াত, উপজাতি-আদিবাসী কিংবা সাঁওতাল।

রাষ্ট্র বলতে এখন কিছু নেই। সরকারই রাষ্ট্র। আর সরকারের অমানবিক কার্যক্রমকেই আমরা বলছি, রাষ্ট্র যখন অমানবিক। আসলে অমানবিক হলো আমাদের সরকার। এই রাষ্ট্র কিংবা সরকার আসলে আরো শোষণ করবার জন্য আমাদের জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেয়। এই বিভেদ তৈরি করতে গিয়ে তারা গুটিকতক জনগণকে নিয়ে সুবিধা অনুযায়ী একটি পক্ষ নেয়। এই পক্ষ যখন নিয়ে নেয়, বিভেদ তৈরি হয় তখনই। তখনই একদল নিজেদের বলিয়ান ও শক্তিশালী ভেবে শাহবাগী হয়ে যায়। এবং অমানবিক হয়ে ওঠে।

তখনই তারা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এবং আরো বিভক্তি জিইয়ে রাখতে চায় জনগণের ভেতর। ডিভাইড-রুল। ইংরেজরা যা করেছে। ইংরেজরা জনবিচ্ছিন্ন ছিলো। তারা তার হিন্দু কিংবা মুসলিমান অথবা সাঁওতাল প্রজাদের কথা ভাবে নি। তারা ভেবেছে কিভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। এই টিকে থাকার হাতিয়ার ছিলো বিভেদ তৈরি করা। এবং সুবিধা অনুযায়ী একটি দলের পক্ষ নিয়ে নিয়েছিলো। এবং অমানবিক হয়েছিলো।
হুবুহু সেইসব ঘটছে আজ। চিন্তা করে দেখুন। সরকার যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়, আসলে তখনই রাষ্ট্র অমানবিক হয়। এইযে পুলিশ যেভাবে ঐ গরীব এবং দুর্বল সাঁওতালদের গুলি করে মেরেছে, আগুণে ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, এই অমানবিকতাকে কিন্তু বাকি জনতার সাপোর্ট করবার কথা নয়। অথচ, আজ একপক্ষ ঠিকই সাপোর্ট করছে। নিশ্চুপ আছে। প্রতিবাদ নেই। কেন নেই? কারণ, এখানে প্রতিবাদ করে লাভের গুড় খাওয়া যাচ্ছেনা। বরং তারা ভাবছে, সরকার যেহেতু আমাদের সাপোর্ট দিয়েছে আগে সেহেতু আমরা সরকারের পক্ষের লোক। এবং এখানে প্রতিবাদ করলে সরকার মহাশয় নারাজ হবেন। তাদেরকে নারাজ করা যাবে না। তারা নারাজ হলে ভবিষ্যতে আমাদের মধু খাওয়া হবে না।

এবং এই চিন্তাটাই আসলে এক নাগরিকের কাছ থেকে আরেক নাগরিককে বিভক্তকারী। সরকার নিজ স্বার্থে এই বিভেদ তৈরি করে এবং পরবর্তিতে অসাধু নাগরিক সেটিকে টিকিয়ে রেখে নির্যাস পান করে। একটি জনবিচ্ছিন্ন এবং ক্ষমতালোভী সরকার এইজন্য রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। কিছু জনগণকে কিছু দিয়ে লোভ দেখিয়ে ভাগ করে, এরপর তারা মজা লোটে।

তখন অসাধুরা দেশপ্রেমের কথাও ভুলে যায়। মানবতা তখন সিলেক্টিভ হয়ে যায়। তখন তারা ভুলে যায় এইরকম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সাঁওতালদের ঐতিহাসিক অবদানকেও। পাখির মত গুলি করে মেরে ফেলে দাম্ভিকতা দেখায় অমানবিক রাষ্ট্র তথা সরকার। আর বাকি সুবিধাভোগী মধুখোরেরা তখন চুপ থাকে। এড়িয়ে যায়। আর যারা এড়িয়ে যেতে পারেনা তাদের নাম পড়ে বিরোধী পক্ষ। কি সুন্দর রাজনৈতিক খেলা! যে খেলা শেষ করতে চায় না সরকার পক্ষ।

ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি ছিলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম। দেশপ্রেমিক সরকার পক্ষ এখন এইসব ইতিহাসের গল্প লিখবে না। কারণ, এতে স্বার্থ নেই। তাহলে বুঝে নিন তারা আসলে কতটা দেশপ্রেমিক এবং মানবিক।

যে দেশপ্রেমের ধুয়া তুলে, যে অমানবিকতার দোহাই দিয়ে তারা একদিন শাহবাগে জড়ো হয়েছিলো ঠিক সেই অমানবিকতা যখন সাঁওতালদের সাথে ঘটছে তখন তারা সব ভুলে যায়। তখন মুখে ছিপি এঁটে সরকারকে আরো অমানবিক হতে ইন্ধন যুগিয়ে যায়। কি চরম ভন্ড আর নির্লজ্জ স্বার্থপরতা! মানবাধিকার কর্মীরাও সরকারের কেনা গোলামের মত নীরবতা যাপন করে প্রভুর চরণে! এই লজ্জা আমাদের। এই নিষ্ঠুরতায় আপনার আমার সবার অংশগ্রহণ।

Elora zaman

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।