বাঙালি মুসলিম পরিচ​য়ে সবচেয়ে লজ্জাবোধ করি ! – শারমিন শামস্

এই মুহূর্তে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি লজ্জিত হই কীসে? আমি বলবো, আমার পরিচয়ে। বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলিম হিসেবে। যে পরিচয় আমি ধারণ করি, সে পরিচয় আমার সবচেয়ে বড় লজ্জার কারণ হয়েছে। আমি লজ্জিত।

জন্মমাত্র এই স্বদেশকে আবিষ্কার করেছি বুকের গভীরে। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যে দেশকে ধারণ করেছি আমার অস্তিত্বে, আমার বোধে। জেনেছি, এই পোড় খাওয়া দেশ চলেছে যুদ্ধসাজে এবং যুদ্ধ চলছেই। ইতিহাসের পাতায় পাতায় সে যুদ্ধের বিবরণী লেখা আছে। ইংরেজ বেনিয়া হয়ে পাকিস্তানি শোষক, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ- রক্তাক্ত ইতিহাসে বারবার স্তব্ধবাক হয়েছি। গণতন্ত্রের মুখোশে সামরিক শাসন, মিথ্যে শাসন, স্বৈরশাসন- কী না পোহাতে হয়েছে এই দেশটাকে।

তবু বলেছি গর্বিত, আমি গর্বিত। আমার সোনার বাংলা, আমি তার বুকে জন্মেছি, মরবো এখানে, তবু আমার সাধ না মেটে। বারবার জন্ম যেন হয় এই মাটিতে! কী অসম্ভব সব আবেগী উচ্চারণে কাটালাম এতকাল। এই দেশ, এই মাটি, এই স্বজাতি, এই গণতন্ত্র! আজ সব বড় অদ্ভুত অবাস্তব অর্থহীন অনুভব করি। অথচ এতো দিন দেশমাতৃকাকে নিয়ে গর্বে -অহঙ্কারে তিরতির করে কাঁপতো আমার বুকের আঙিনা। আজ এই দেশে নিজেকেই বড় অপরিচিত লাগে, নাকি পুরো দেশটাই এক কিম্ভূত মূর্তি হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে অকস্মাৎ- আমি বুঝতে পারি না। শুধু বুঝি, কোনো এক বিষ নিঃশ্বাসে ছেয়ে গেছে চারপাশ, বদলে গেছে চেনা বাংলাদেশ, ধসে যেতে শুরু করেছে আমাদের চেতনা, মূল্যবোধ, পচন ধরেছে হাজার বছর ধরে লালন করা আমাদের সুন্দরতম বোধের শিকড়ে, বিশুদ্ধতার সুবাতাস থমকে দাঁড়িয়েছে মাঝপথে।

যে বাংলাদেশকে জেনেছি হিন্দু-মুসলিমের, পূজা-ঈদ-বড়দিনের, সান্তাক্লজ আর দেবি দুর্গার, শবেবরাতের আতশবাজির, হালুয়া-রুটির, বাতাসা-প্রসাদের, খ্রিস্টমাস ট্রি আর পিঠা পায়েসের, বুদ্ধপূর্ণিমার বিশাল গোলক চাঁদের আলোর- সেই বাংলাদেশকে খুঁজছি- কেবলি খুঁজছি আমি, বিগত কয়েক দিন, কয়েক মাস ধরে। কিন্তু আলো নেই, একফোঁটা আলো নেই কোনোখানে, অমানিশা হতবাক স্থির হয়ে আছে এই লোকালয়ে, এই বদ্বীপে।

এই দেশ হিন্দুর নয়, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধের নয়, আদিবাসীর নয়, পাহাড়ের মানুষের নয়- এই দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের, এই দেশ সমতলের, এই দেশ ক্ষমতাবানের, এই দেশ শোষকের! তাই আমি কোনো আলো দেখি না তো আর। শুধু দেখি দাউ দাউ আগুন- রক্তলাল আগুন- পুড়ে যাচ্ছে, ছাই হয়ে যাচ্ছে সাঁওতাল পল্লি, আকাশ মাথায় নিয়ে শীতের কুয়াশায় শিশুসন্তান নিয়ে রাত পার হচ্ছে সাঁওতাল রমণীর, পুরুষটিকে ধরে নিয়ে গেছে, অথবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে। ঘরপোড়া, গ্রামছাড়া- গ্রামই তো নেই, দেশ নেই, কেউ নেই। কে আছে ওদের? এই দেশ? এই স্বজাতি? এই রাষ্ট্র? এই সরকার? কোনটি? কে আছে ওদের পাশে? খুব ইচ্ছে করে উত্তরগুলো খুঁজি, ওদের ঘরপোড়া আগুনে হাত রেখে ছাই ঘেঁটে খুঁজে বের করি গণতন্ত্রের মানে, ইতিহাসের হাড়গোড় পাঁজর ছেনে তুলে আনি আসল ইতিহাস। তারপর মিইয়ে যাই।

একজন বন্ধুকে বললাম, গোবিন্দগঞ্জে যেতে চাই, ওদের কষ্টের প্রমাণ নিয়ে আসতে চাই। বললেন, ক্যামেরা নিয়ে কাজ করা বিপজ্জনক হবে। জানলাম, যারা ছুটে গেছেন গোবিন্দগঞ্জে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে, সরকারি কর্মকর্তারা নাকি তাদের বলেছেন, এভাবে ওদের সাহায্য করলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। আর কিছু জানতে ইচ্ছে হয়নি। এই দেশে প্রাণের মূল্যের চেয়ে বড় রাজনীতি, ক্ষমতার পালাবদল আর নেতাদের ভাবমূর্তি। এই নষ্টভ্রষ্ট দেশে সাঁওতাল নামের যে আদিবাসী গোষ্ঠীটি মাটি কামড়ে টিকে আছে আজো, শেষ খড়কুটোটুকুও বোধহয় কেড়ে নেয়া হবে এইবার। মাটির সন্তানেরা, তারা জানে এই মাটি তাদের মাটি নয়। এই বাংলাদেশ তাদের নয়। ঠিক যেরকম জানে সনাতন ধর্মের মানুষেরা, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানেরা- এই দেশ হয়তো ছিল তাদের, এই মাটি, এই আলো-হাওয়া- আজ আর কিছুই তাদের নয়। আজ এই মাটিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে তাদের- প্রকাশ্যে- যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয় তারা অবাঞ্ছিত, যারা সমতলের নয়, তারা অবাঞ্ছিত, যারা আদিবাসী তারা অবাঞ্ছিত।

আজ খুলে গেছে সব রাখঢাক, ভেঙে গেছে সব অর্গল। লজ্জা, দ্বিধা, বিবেকের বাঁধ- সব টুটে-ছুটে গেছে। প্রকাশ্যে, বীরদর্পে ঘোষিত হচ্ছে এটি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ, আর কারো নয়, এমনকি নাস্তিকেরও নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাড়া বেঁচেবর্তে থাকবার কোনো সুযোগ, অধিকার নেই কারো, ভাবার সুযোগও নেই আর। এই দেশের রাজনীতি- হীন, স্বার্থপর, চক্রান্তবাজ, ষড়যন্ত্রী রাজনৈতিক চর্চায় খসে পড়েছে অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশ, প্রগতিশীলতার মেকআপ। আজ তাই খুব ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিব্রত, বিমর্ষ আমি। এই দেশ, এই সরকার, এই রাজনীতি সংখ্যাগরিষ্ঠের, সমতলের বাসিন্দার, বাংলাভাষাভাষীর- আর কারো নয়। রাষ্ট্রের চোখ বাঁধা একখণ্ড কালো রুমালে। আর তুরুপের তাস নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ। সেইখানে ক্ষমতাবানদের ঘেয়ো টানাহিঁচড়ের মাঝখানে পড়ে আছে শ্যামল হেমব্রমের মরদেহ।

আমি আজ বিশ্বাস করি, এই শকুনে খাওয়া, রক্ত আগুনে ঢাকা, নিপীড়িতের চিৎকার কান্নায় ভেঙেচুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এই দেশ- আমার বাংলাদেশ কিছুতেই নয়, কোনোভাবেই নয়! আজ এই বিষণ্ন দিনে, বিমর্ষ দিনযাপনে, আমি জেনে গেছি, এই দেশ আর কারো নয়। এমনকি মুসলিমেরও নয়। শুধু শোষকের। ওরা শুধু বিছিয়ে রেখেছে একের পর এক ফাঁদ। লোল ঝরিয়ে সমানে টেনে ধরেছে জাল আর শিকার তুলছে সাবধানে।

একদিন মৃত পথঘাট, পতাকার সবুজ, জাতীয় সংগীতের ধুন, দোয়েলের শিস, পাটের সোনালি আভা সব ধুয়েমুছে চিরঅস্ত যাবে রক্তিম মুক্তির সূর্য। সেইদিন দূরে নয়। হয়তো ভাবছি নিরাপদ আমি, হয়তো ভাবছি আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ, হয়তো ভাবছি আমি পাহাড়ের নই, হয়তো ভাবছি আমি বাংলার- কিন্তু জেনে গেছি, আমিও আর এই বাংলার নই। ক্রমশ প্রকাশ্য ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে আমার পা, আমার অস্তিত্ব- ক্ষমতাবানের লকলকে জিহ্বা তার ক্ষুধা মেটাতে মেটাতে একদিন পৌঁছে যাবে আমার দরোজায়।

লেখক : প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ।

2 টি মন্তব্য:

  • নভেম্বর 21, 2016 at 11:01 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    লেখাটি পড়ে আমি অভিভূত । লেখিকার ছবি দেখে বুঝলাম যে সে আমার কন্যাসমা। তাকে আশীর্বাদ করি । না, ধর্মের আশীষ নয়, পিতৃস্নেহের।ভালো থেকো যারা ধর্মভীরু নয়, সেইসব মানুষজন । অরুপের মন্তব্যও ভালো লেগেছে । নিজের মন্তব্য বলতে একটা কথাই বলি, আমি ধর্মকে অসুখ বলে মনে করি। আর যারা এক ধর্মের নামে অন্য ধর্মের মানুষের উপর চড়াও হয়, তারা মানুষ কেন, পশুও নয়, পশ্বেতর পিশাচ ।

    Reply
  • নভেম্বর 22, 2016 at 12:00 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    জামাত শিবির তো আর সংখ্যালঘু নয়! তাদের যখন হত্যা, নির্যাতন, গুম করা হলো,কেন কিছু বললেন না? কেন তখন সরকার কে বাহবা দিলেন??? কেন এ দ্বিমুখী আচরণ???

    মিয়ানমার মুসলিম সংখ্যালঘুদের হত্যা করছে, কই? সে নিয়ে কিছু লিখলেন না তো??

    Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।