বাংলাদেশ কি কেবলই মুসলমানদের জন্য ? আমি রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ মানিনা –

সুপ্রীতি ধর: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আপনার মনের কথাটা বলে ফেলার জন্য। আমি গর্বিত বোধ করছি আজ একারণেই যে, অবশেষে সত্য কথাটা আপনি বলেছেন। এর আগে বহুবার আপনি নিজের মুখেই বলেছিলেন, দেশে ‘সংখ্যালঘু’ বলে কেউ নেই।

আজকে আপনার কথাতেই প্রমাণ হয়েছে যে, ‘সংখ্যালঘু’ নামের একটি বিলুপ্তপ্রায় বিপন্ন প্রজাতি আছে দেশে, যাদেরকে ক্ষমতাসীনরা, যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, বার বার আঘাত করে যায়, ঘরবাড়ি দখল করে, আগুন লাগিয়ে সর্বস্ব পুড়িয়ে দেয়, টেঁটায় বিদ্ধ করে, গুলিতে বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। আবার প্রশাসনের গুলিতে গুরুতর আহত ব্যক্তিই হাতকড়া পরা অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় কাতরায়। মাকে চিকিৎসকের কাছে নেয়ার সময় এরকমই একজন সংখ্যালঘুকে আপনার পালিত রক্ষীরা ধরে নিয়ে যায়, আর মা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে পৌঁছে যায় একেবারে ওপারে। সেই সংখ্যালঘুকেই আবার হাতকড়া পরিয়ে মায়ের মুখাগ্নিতে উপস্থিত করা হয়, যেন বা সে একজন রাষ্ট্রদ্রোহী ভয়ানক সন্ত্রাসী!

অত্যন্ত চমৎকার সব কাণ্ড-কারখানা ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে। আমরা সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধে সামান্য এক ছাত্রের কথায় কান ধরে উঠবস করি, গলায় জুতার মালা পরে গ্রামময় ঘুরে বেড়াই, আমাদের বাস্তুভিটা থেকে জোর করে উচ্ছেদ করা হয়, আমরা তখন পথে পথে ঘুরি। একমাত্র সংখ্যালঘুদের সাথেই বুঝি এমনটি করা সম্ভব।

তাছাড়া রাষ্ট্রের যেহেতু একটি নির্দ্দিষ্ট ধর্ম আছে, সুতরাং বাদবাকি যারা থাকতে চাইবে, তারা তো ভিন্নধর্মী, মানে সংখ্যালঘুই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও তো সেই সত্য কথাই বললেন। তিনি বলেছেন, সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার ইচ্ছা সরকার বা আওয়ামী লীগের নেই। তিনি বলেন, ‘সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি একটি মীমাংসিত বিষয়। মীমাংসিত বিষয়টি নিয়ে কেউ কোনও মন্তব্য করে থাকলে, এটি তার একান্ত নিজস্ব বিষয়।’

তাহলে প্রশ্ন করি আমি? মীমাংসাটা কার সাথে কখন, কে করেছে? আমি তো করিনি মীমাংসা? আমার বাবা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। আমি আমার সেই দেশকে ফিরে পেতে চাই, এ আমার অধিকার। নইলে ফিরিয়ে দিন আমার বাবাকে।

তবে শেষতক আপনারা সবাই যে “সত্য” কথাটি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, তাতে অবশ্যই ধন্যবাদ। এক বন্ধু লিখেছে, “এজন্যই তো মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল! এখন স্পষ্ট করে বলে দিলেই হয়, বাংলাদেশ কেবলই মুসলমানদের জন্য! প্রতিদিন হিন্দু-বৌদ্ধ-আদিবাসীর (পাহাড় ও সমতলের) জমি সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, মন্দির-প্রতিমা ভাংচুর, বাড়ী-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন, নারী ও শিশু ধর্ষণ, অমুসলমান হত্যা এসবও বৈধতা পেয়ে যায়! আর কী চাই”!

কিছুদিন আগে একজন মন্ত্রী ‘মালাউন’ বলেছিলেন, কিন্তু সেই কথার কোনো ভিডিও আমরা দেখাতে পারিনি। ভিডিও ছিল বলে সিলেটে ছোট্ট রাজনকে হত্যার একটা ত্বরিৎ পদক্ষেপ দেখতে পেয়েছি, ভিডিও ছিল বলে খাদিজাকে ত্বরিৎ গতিতে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে। ভিডিও নেই বলে আমরা সেনানিবাসে নিহত তনুর ব্যাপারে কোনো সুরাহা করতে পারিনি। আফসানার বিষয়টিও মীমাংসা করতে পারলাম না। কাজেই এই মন্ত্রীও পার পেয়ে গেলেন। কিন্তু উনি বলুন বা নাই বলুন, এতোদিনে তো স্পষ্টই হয়ে উঠেছে যে, কারা মূল হোতা এই ন্যাক্কারজনক হামলার। আর হামলা তো এখনও অব্যাহতই আছে, আগুন লাগানোর ঘটনা তো রোববার রাতেও ঘটেছে। প্রশাসন যেখানে চাইছে সংখ্যালঘুরা উঠে যাক, সেখানে তাদের আর রক্ষা করে কে! আর আজ যখন খোদ প্রধানমন্ত্রীই তাদের সংখ্যালঘু বলে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে দিলেন, কাল থেকে যে সেখানে মুহুর্মূহু আগুন জ্বলবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

বাহ্, প্রধানমন্ত্রী, বাহ্। এই না হলে আপনি আমাদের নেতা, আমাদের গুরু, আমাদের রক্ষাকর্তা! একাত্তরের পর এই অভিশপ্ত সংখ্যালঘুরাই বার বার আপনাদের ভোট দিয়ে নিজের ওপর নির্যাতন টেনে এনেছে। সংখ্যালঘু বলেই ভোটের রাজনীতির শিকার হয়ে পূর্ণিমারা বার বার ধর্ষিত হয়। পূর্ণিমাও সংখ্যালঘু, আমি-আমরাও সংখ্যালঘু। আমরা তো গণিমতের মাল প্রধানমন্ত্রী। আমাদেরকে (নারীদের) অপমান-অসম্মান করা যায়, ধর্ষণ করা যায়, ধর্মান্তরিত করা যায়, গর্ভবতী বানানো যায়, মেরে ফেলা যায়, বয়সে ছোট্ট হলে যৌনাঙ্গ কেটে ১৮ ঘন্টা ধরে বিকৃত মানসিকতার চর্চা করা যায়, একেবারেই কিছু না হলে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া যায়। দেশটা তো আসলে আমাদের না। আপনারা দয়া করে থাকতে দিয়েছেন বলেই না থাকছি।

আর আমার বাবাকে অভিশাপ দিচ্ছি এই বলে যে, ১৯৪৭ এ কেন সে দেশ ছেড়ে যায়নি, কেন যায়নি ১৯৭১ সালেও? সেদিন চলে গেলে তো বাবাকেও আমাদের হারাতে হতো না পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে, আমরাও বাবা-হারা হতাম না, আর এতোদিন পর এসে নিজ দেশে সংখ্যালঘু নাগরিক বনে যেতাম না।

আমার বাবাটা কেন যায়নি তখন, যখন যুদ্ধের শুরুতেই সবাই এসে বলতো তাকে, ‘দাদা, চলে যান আপনারা। ঘরে বড় ছেলেমেয়ে আছে’। বাবা নাকি বলেছিল, ‘কে মারতে আসবে, আসুক। বুক চিতিয়ে বলবো, জয়বাংলা। আর মেয়ের কথা বলছো? জন্ম দিতে পেরেছি, মেরেও ফেলতে পারবো, তবুও অসম্মান হতে দেবো না’। সেই বাবাকে আজ সামনে পেলে আমার কিছু প্রশ্ন করার ছিল।

মাননীয়া, আসলে সত্য কোনদিন চাপা থাকে না, মনের অজান্তেই তা বেরিয়ে আসে। ধন্যবাদ আপনার মতোন একজন সাম্প্রদায়িক সংখ্যাগুরুকে। যিনি কীনা দেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনায় নির্লিপ্ত থাকেন, বা থাকতে পারেন।

আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো প্রধানমন্ত্রী, আপনি যে বললেন, সংখ্যালঘুদের সর্বতো নিরাপত্তা দিতে, আপনার রাজ্যে আসলে কে নিরাপদ? ব্লগার, আস্তিক-নাস্তিক, ভিন্নমতাবলম্বী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী-পাহাড়ি-সমতলের বাসিন্দা, কে? আপনি নিজেই কি নিরাপদ? এই যে এতো নিরাপত্তা নিয়ে আপনি চলেন, যে ধর্মকে নাড়াচাড়া করতে আপনার এতো ভয়, যে ধর্ম ব্যবসায়ীদের আপনি তোয়াজ করে চলেন, তারা কি সত্যিই আপনার রক্ষক? ঋণ কিন্তু বাড়ছেই দিনে দিনে, প্রধানমন্ত্রী!

womenchapter

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।