মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ইস্যু – সৌদি আরব নীরব কেন?

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম দেশ সৌদি আরব। যুগে যুগে যারা মহান আল্লাহ’র বাণী প্রচার করেছেন, সেসব নবী-রাসুলের অনেকেরই জন্ম এখানে। ইসলাম ধর্ম যার মাধ্যমে এসেছে, সেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মও এখানে। পবিত্র কাবা শরিফ এখানে। ইসলাম ধর্মের সূচনা, প্রচার ও প্রসারের তীর্থস্থান এই সৌদি আরব। যা এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশও। শুধু এই কারণেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তাদের প্রভাব অন্য মুসলিম দেশগুলোর ওপর অনেক বেশি। সৌদি আরব সম্পর্কে এই কথাগুলো লেখার পেছনে কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনার অন্যতম বড় ইস্যু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন। দেশটিতে রয়েছে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান, যাদের অধিকাংশই বসবাস করেন দেশটির উত্তর পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। সে কারণে ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত তারা। আন্তর্জাতিকভাবে তারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হলেও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা মনে করেন, রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গেছেন।

দীর্ঘ দিনের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দল এনএলডি (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি) ক্ষমতায় আসে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে দেশের শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটির জাতিগত বিভেদ দূর করার আহ্বান জানালেও সেটি কাজে আসেনি। অব্যাহত রয়েছে জাতিগত সংঘর্ষ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যাকে জাতিগত নিপীড়ন হিসেবেই দেখে থাকে। গত অক্টোবর থেকে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর দমনপীড়ন জোরালো হয়েছে।

৯ অক্টোবর বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় নয় পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর দু’দিনের মাথায় ১১ অক্টোবর মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সামরিক অভিযানে ১২ জনের মৃত্যুর কথা জানায়। সর্বশেষ ১৩ নভেম্বর রবিবারের অভিযানে ২৮জন নিহত হনে বলে স্বীকার করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। মিয়ানমার সরকার কথিত এসব সংঘর্ষকে হামলাকারীদের খোঁজে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ হিসেবে অভিহিত করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, নারীদের ধর্ষণসহ বহুমুখী শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চলছে।

রাষ্ট্রীয় তথ্য অনুযায়ী, সেখানে হতাহতের যে সংখ্যা জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে আঁচ করা যায় প্রকৃতসংখ্যা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। লক্ষাধিক তো বাস্তুহারাই হয়েছেন। শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি সরকারপ্রধান হলেও তিনি এখন সেখানে শান্তির পক্ষে নেই। দাবি উঠেছে, তার নোবেল পদক ফিরিয়ে নেওয়ার। শান্তিতে নোবেলজয়ী ক’জন আর নিজের দেশের শান্তির পক্ষে কথা বলেন!

তাদের অত সময় কোথায়? বোঝাই যাচ্ছে—প্রায় অবরুদ্ধ রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বললে সু চি’র জনসমর্থন কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই তিনি নীরব। নির্বাচনের আগেই তার মুসলিমবিদ্বেষ ফাঁস হয়েছিল। জানা গিয়েছিল, ভোটের রাজনীতিতে সাফল্য পেতে মুসলমানদের তিনি প্রার্থী করেননি। নির্বাচনের পর একটু একটু করে উন্মোচিত হয় তার রোহিঙ্গাবিদ্বেষী স্বরূপও। মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গের বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার ভয়াবহ অবস্থান জানান। জাতি হিসেবে ‘রোহিঙ্গা’দের অস্তিত্বও অস্বীকার করেন তিনি।

এবার আসি মূল কথায়। বাংলাদেশের মুসলমানরা রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতনে খুবই সমব্যথী। মুসলমান হোক বা যে ধর্মেরই হোক, কোনও নিরপরাধ জাতি বা গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন হলে তাদের পাশে দাঁড়ানোটাই তো মানবিকতা। কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ এলে এ ধরনের নির্যাতন হয়তো সহজেই বন্ধ করা যায়। সৌদি আরব সে রকমই একটি দেশ। সৌদি আরবকে নিয়ে এ জন্যই প্রথমে বলেছি।

পৃথিবীর অন্য দেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হলে ভারত, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ওপর হলে প্রায় পুরো পশ্চিমা বিশ্ব এবং বৌদ্ধদের ওপর হলে জাপান ও চীনকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। কিন্তু ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন নিয়ে সৌদি আরবকে কখনও কোনও প্রতিবাদ করতে দেখি না। ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যখন বোমার আঘাতে নিরপরাধ মুসলমানরা মারা যান, তখন তাদের প্রতিবাদ করতে দেখি না। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া, সুন্নিসহ মুসলমানদের নানা ইস্যু নিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে, রক্তপাত হচ্ছে। সৌদি আরবকে সবসময়ই নীরব থাকতে দেখা যায়। এটাও ঠিক—মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই নীরব, সবারই নিজ-নিজ স্বার্থ আছে। কিন্তু সৌদি আরব তো মুসলমানদের জন্য আদর্শ দেশ বলে পরিগণিত, তাদের নীরব থাকার কারণ কী? সরব হলে কোনও লাভ হবে না বলেই কি তারা নীরব? কিংবা স্বার্থ নেই বলেই এসব ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাচ্ছে না? তাহলে মহান আল্লাহ ছাড়া মুসলমানদের দেখার কেউ নেই?

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।