মেয়েদের তো পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব হবেই। এটাকে ‘শরীর খারাপ’ বলার কী আছে?

বনাঙ্কুর মুস্তাফা: “শরীর খারাপ হইসে”? পিরিয়ড হলেই মা’কে এই কথা বলতে শুনতাম। মা-খালা-চাচী-মামী-ফুপু-দাদী-নানী, সবাই এই একই কথা বলতেন। মেয়েদের তো পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব হবেই। এটাকে ‘শরীর খারাপ’ বলার কী আছে?

শুধু আমাদের কালচারেই হয়তো বা, এই বিষয়টিকে খুব নোংরা, লজ্জাজনক মনে করা হয়। ভাবা হয়, একজন মেয়ের দুর্বলতা হিসেবে। এটি এমন একটি ব্যাপার যা কাউকে বলা যাবে না। বিশেষ করে পুরুষদের তো না-ই! আমি আমার মাকে কখনো দেখিনি স্যানিটারী ন্যাপকিন কিনতে। আমার বাবা আমার জন্য এনে দিতেন ছোটবেলায়। বড় হয়ে আমি নিজেই কিনতাম।

বনাঙ্কুর মুস্তাফা
আমার মনে আছে, স্কুলে ক্লাসের ছেলেরা কিভাবে আমাদের টিজ করতো এই বিষয়টি নিয়ে। আমাদের শরীরচর্চা বইয়ের যে চ্যাপটারে ঋতুস্রাব সম্পর্কে তথ্য ছিল, সেই চ্যাপ্টারটি ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাওয়া হয়। তাই এই বিষয়ে শিক্ষাটা ছেলেরা তো দূ্রে থাক, মেয়েরাও ঠিকমতো পায়নি। আমাদের মায়েরা শুধু বলতেন, “এখন থেকে তোমাদের খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। ছেলেদের সাথে মেলামেশা কমিয়ে দিতে হবে। ওড়না পরা শুরু করতে হবে…ইত্যাদি!

কখনই তারা আমাদের খোলাসা করে বলেন নাই যে এই পিরিয়ড হওয়াটা মেয়েদের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় ঘটনা, যার সাথে তাদের সন্তান ধারণক্ষমতার বিশাল যোগসূত্র আছে। শুধু দেখতাম, নিয়মিত না হলে তাদের কপালে চিন্তার রেখা ভেসে উঠতো। তার কারণ জেনেছি বেশ কয়েক বছর পরে… মনে পড়ে, বগুড়ার স্কুলের মেডিক্যাল রুমের ভাইয়াটার কাছে ন্যাপকিন্স থাকতো। দরকার পড়লে আমি যেয়ে নিতাম, কিন্তু আমার কিছু বান্ধবী ছিল যারা লজ্জায় যেতে পারতো না তাই আমি ওদের এনে দিতাম।

হ্যাঁ, পিরিয়ডকালীন মেয়েদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, স্যানিটারী ন্যাপকিন, এবং বিশেষত, এই সংক্রান্ত সঠিক শিক্ষা – অত্যন্ত জরুরি, এমনকি এটা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। এই শিক্ষা শুধু মেয়েদের না, ছেলেদেরও পাওয়া উচিত। একজন স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে, একজন ভাই আর বোনের মধ্যে, একজন বাবা আর মেয়ের মধ্যেও এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত।

যে শারীরিক প্রক্রিয়াকে মানুষ নোংরা ভাবছে, যাকে আপনারা অসুস্থতা বলে আখ্যা দিচ্ছেন, সেটি না ঘটলে তো এই পৃথিবীতে বংশ বিস্তারের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতো! একবার ভেবে দেখুন তো, পিরিয়ড হওয়াটা অসুখ বা শরীর খারাপ, নাকি না হওয়াটা?

আমার এক পরিচিতকে দেখেছি শুরু থেকেই ওর পিরিয়ড নিয়ে ঝামেলা হতো, ঠিক সময়ে হতো না। কিছুদিন আগে জানতে পেরেছে যে ওর সন্তান ধারণ করতে পারার সম্ভাবনা খুব কম। সেটা পিরিয়ড ঠিকমত না হওয়ার কারণে না, কারণটা আরও জটিল এবং পিরিয়ড ঠিকমতো না হওয়াটা ছিল একটি মারাত্মক উপসর্গ। সুতরাং মেয়েদের জীবনে এই মাসিক/শরীর খারাপ নামক প্রক্রিয়াটি যে যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা নিশ্চই খুব কঠিন নয়। আর যদি এটি গুরুত্বপূর্ণই হয়ে থাকে, তাহলে কেন এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা হবে না? কেন একটি মেয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সামগ্রী পাবে না ওই সেনসিটিভ সময়টাতে!

মারজিয়া প্রভা নামের দীপ্তশালী মেয়েটি যে দুর্দান্ত আন্দোলনটি শুরু করেছে, এর জন্য তাকে সমর্থন জানিয়ে আমার আজকের এই লেখা।

ভাবতেই ভালো লাগে, বাংলাদেশে এমন একটি কর্মপরিকল্পনা এতো সুন্দরভাবে এগিয়ে চলেছে। কী আনন্দের সাথে এখন এই উন্নত দেশটাতে বসে পিরিয়ডের সময় প্রয়োজন মোতাবেক ভিন্ন-ভিন্ন রকমের ন্যাপকিন ব্যাবহার করতে পারছি। বাংলাদেশের মেয়েদের জন্যও এই বস্তুটির সহজলভ্যতা তৈরি করা উচিত। একইসাথে গড়তে হবে সচেতনতা। বাংলদেশে যত মেয়ে বা নারীকে আমি বলতে শুনেছি যে তাদের পিরিয়ড ঠিকমতো হয় না, এতোটা আমি এখানে (ক্যানাডা) বা অন্য কোথাও শুনিনি। এর অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। এবং এর পরিণাম হতে পারে সুদূ্রপ্রসারী।

এই বিষয়ে এমনকি বাংলাদেশের ডাক্তারদেরও অস্পষ্ট করে কথা বলতে দেখেছি। এ্যাজ ইফ, এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোন অল্প বয়সী মেয়ে অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে গেলে ডাক্তার বলছেন, “এ কিছু না, বিয়ে হলেই ঠিক হয়ে যাবে”! আরে আজব তো, বিয়ে আবার এর মেডিসিন হইতে পারে না কি! একটা ১২/১৪ বছরের মেয়েকে বলা হচ্ছে, তার পিরিয়ডের সমস্যা দূর হওয়ার জন্য তাকে বিয়ে করতে হবে!

মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়, মেয়েদের পিরিয়ড, একটি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন এবং এর আওতায় যা কিছু পড়ে, তার সবকিছুর অন্তর্ভুক্তি থাকা উচিত। শুধু তা-ই নয়, পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে অর্থাৎ মেনোপজ হলে মেয়েদের কতখানি কষ্ট হয় তা আমি আমার মা’কে কাছ থেকে দেখে জানলাম।

তিনি রীতিমতো পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেই তারা বলেন, “এ কিছু না, মেনোপজ, কিছুদিন সময় লাগবে ঠিক হতে। এই ওষুধগুলো খেলেই আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে”। বিষয়টা কি ঠিক এতোটুকুই? মেনোপজ হলে যে একজন নারীর শরীরের পুরোটাই হরমোনাল চেঞ্জের ভয়ংকর শিকার হয়, তার জন্য যে কষ্ট তিনি পান, সে থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য যে মেনোপজের অনেক আগে থেকেই তার কিছু সতর্কতা পালন করতে হয়, খাওয়া-দাওয়ার কিছু পরিবর্তন আনা, নিয়মিত ব্যায়াম করা – এইসব মেনে চলতে হয়, এগুলো তাকে বলে দেয় কেউ? সেই শিক্ষাটা কি তাদের প্রাপ্য নয়?

ক্যানাডাতে দেখি আমার পঞ্চাশোর্ধ ফিমেল কলিগরা দিব্যি মেনোপজের পরেও অনেক স্বাস্থ্যবতী, হাসি-খুশি। তারা অনেক আগে থেকেই এই বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন, বিভিন্ন ক্লাসে যান, ইয়োগা করেন, ফোকাস গ্রুপ ডিস্কাশন করেন…যাতে এই সেন্সিটিভ ট্রান্সিশান পিরিয়ডটা তারা ভালভাবে পার করতে পারেন এবং এতে তাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবাই সহযোগীতা করে। সেই ক্ষেত্রটা কি আমরা আমাদের দেশের নারীদের জন্য, আমাদের মা-বোন-ভাবী-খালা-চাচী-মামী-ফুপু-বান্ধবী-দাদী-নানী- দের জন্য তৈরী করতে পারি না???

আর আমরা যারা বিদেশে থাকি, তাদের কাছে আমার অনুরোধ, চলুন না আমরা সবাই মিলে ওদের এই অভূতপূর্ব প্রয়াস – ডোনেট আ প্যাড’কে সফল করতে একটু সহযোগিতা করি! আমি মনে করি, আমাদের এদিকে ন্যাপকিন বেশ সহজলভ্য। প্রায়ই বাংলাদেশী টাকায় ২৫০/৩০০ এর মধ্যে ভাল মানের ন্যাপকিন পাওয়া যায় বাজারে। আমরা যখনই দেশে যাই, ওদের জন্য একটি করে প্যাকেট নিয়ে গেলেও কিন্তু ওরা বেশ উপকৃ্ত হয়…কী বলেন?

আমি নেপোলিয়ন এর খুব বড় ভক্ত নই, তবে তাঁর বিশ্বখ্যাত একটি উদ্ধৃতি আমার খুব পছন্দ।

“তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমাদের একটি সভ্য, শিক্ষিত জাতি উপহার দেয়ার”।

শিক্ষা কি শুধু বই পড়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা বড় কর্মকর্তা হলেই পরিপূর্ণ হয়…যদি আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনা-মনন-জীবনের, একটি সুস্থ-সুন্দর পরিবেশের বিকাশ সাধন না করতে পারি?

womenchapter

Leave a Reply