মন্দির ভাঙচুর : ইন্ধনে আওয়ামী লীগ নেতাও

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মন্দিরে ভাঙচুর ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসতিতে হামলার ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের বিশেষ প্রতিনিধিদল গতকাল মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ওদিকে গোপালগঞ্জে সোমবার রাতে একটি মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করেছে বখাটেরা। নারী উত্ত্যক্তের ঘটনায় প্রতিবাদ করলে বখাটেরা আকস্মিক এ হামলা চালায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় গতকাল বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।

নাসিরনগরে হামলা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘আমাদের একটি প্রতিনিধিদল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেছে। আমরা তাদের ক্ষতির পরিমাণ জেনে তা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’ গতকাল দুপুরে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কারো ধর্ম নিয়ে আমরা কটাক্ষ সহ্য করব না। মিথ্যাচার করে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে অন্য ধর্মের প্রতি আঘাত করা আমরা কখনো বরদাশত করব না। ধর্মের নামে কোনো প্রকার অরাজকতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অতীতেও প্রশ্রয় দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না।’

এক প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, নাসিরনগরের ঘটনার সাথে কারা জড়িত? কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটল? কাদের কর্তব্যে অবহেলার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে? তা তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেন, আবদুস সোবহান গোলাপ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, অসীম কুমার উকিল, দেলোয়ার হোসেন, আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ।

হামলার ইন্ধনে আওয়ামী লীগ : ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, রসরাজ দাস নামের নাসিরনগরের এক যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবি আপলোড করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে রবিবার স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। এর একটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলসহ যোগদান করে এবং সুরুজ আলী নামের এক নেতা উত্তেজনাকর বক্তব্য দেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছে। চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সুরুজ আলী মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও হামলায় ইন্ধনের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে রসরাজের ফাঁসি দাবি করেছি। বক্তব্যে কোনো ধরনের উসকানিমূলক কথা ছিল না।’

খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক মুফতি ইসহাক আল হোসাইন জানান, আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ আলী তাঁদের সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি কী বলেছেন তা বক্তব্যের রেকর্ড শুনলে বোঝা যাবে। তবে এ সমাবেশ থেকে কেউ হামলায় অংশ নেয়নি বলে দাবি করেন আহলে সুন্নাত নেতা।

নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ টি এম মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘সুরুজ আলী কোনো সমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন কি না, মিছিল নিয়ে গিয়েছেন কি না, তা জানা নেই। তবে একটি সমাবেশ থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানোর জন্য লোকজনকে ছুটে যেতে দেখেছি।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক ঘটনার তিন দিন পরও নাসিরনগর না পৌঁছায় প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। চলছে নানামুখী আলোচনা। আজ তিনি এলাকা পরিদর্শন করতে পারেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম ছাড়াও এ প্রতিনিধিদলে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সুজিৎ রায় নন্দী, গোলাম রাব্বানী চিনু, মারুফা আক্তার পপি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার প্রমুখ।

ওদিকে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মোট ১৪টি মন্দিরে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১১টি ব্যক্তিগত মন্দিরকে পাঁচ হাজার টাকা করে ও নাসিরনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বজনীন তিনটি মন্দিরকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

নাসিরনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমেদ জানান, এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আপাতত মন্দিরগুলোকে কিছু আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘তদন্ত শুরু হয়েছে। আমরা নেপথ্যের লোকজন ও উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। হামলার ঘটনায় আরো একজনকে আটক করা হয়েছে।’

মাধবপুর থমথমে : হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মাধবপুরে রবিবার মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ গতকাল দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। এদিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে গতকাল সড়ক ও জনপথ ডাকবাংলোতে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কামেশ রঞ্জন কর। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মন্দির ও বাড়িঘর পরিদর্শন করে।

গোপালগঞ্জে দুর্গামন্দিরে ভাঙচুর : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর কোটাবাড়ী সর্বজনীন দুর্গামন্দিরে সোমবার রাতে মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। একদল বখাটে যুবক এ ঘটনা ঘটায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

সূত্র জানায়, কালীপূজা উপলক্ষে সোমবার রাতে রঘুনাথপুর দক্ষিণপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এ অনুষ্ঠান শেষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বেশ কিছু তরুণীকে উত্ত্যক্ত করে বখাটেরা। এ ঘটনায় তরুণীদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা প্রতিবাদ করলে বখাটেদের সঙ্গে বাদানুবাদ হয়। রাতে রঘুনাথপুর উত্তর পাড়ার সরু শেখের ছেলে সজীব শেখের নেতৃত্বে বখাটে যুবকরা কোটাবাড়ী সর্বজনীন দুর্গামন্দিরে হামলা চালায় বলে স্থানীয়রা জানায়। মন্দিরে থাকা সরস্বতী, কার্তিক, দুর্গা ও অসুরের মূর্তি ভাঙচুর হয়েছে বলে পূজারীরা জানান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে হৈ-হল্লা শুনে ঘর থেকে বের হলে দেখা যায়, লাঠিসোঁটা হাতে ৮-১০ জন যুবক ছোটাছুটি করছে। অনুষ্ঠান থেকে ফেরা মেয়েরা আতঙ্কে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে যুবকরা মন্দিরে হামলা চালায় ও মূর্তি ভাঙচুর করে।

মন্দির কমিটির সম্পাদক রিপন বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

মন্দিরে হামলার এ ঘটনায় গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গোপালগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করে। তারা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. সেলিম রেজা জানান, হামলার ঘটনায় মন্দির কমিটির সভাপতি তপন বিশ্বাস বাদী হয়ে মামলা করেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক মামলা করেছেন সুধীর বিশ্বাস। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা : ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল পৃথক বিবৃতিতে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংবাদিক মঞ্চ, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলা বারবার ঘটছে। কিছুদিন আগে সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগ্রহশালা ধ্বংস করা হয়েছে। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনার মতো করেই এবার ফেসবুকের কল্পিত ছবিকে কেন্দ্র করে নাসিরনগরে হামলা হয়েছে। এসব পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে। এসব ঘটনার আগে ও পরে প্রশাসনের ভূমিকায় দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক দেশে এ ঘটনা অপ্রত্যাশিত। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে এখনই শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে ঘটনা আরো বাড়তে পারে।

kaler kantho

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।