মালাউন’ হ্যাশট্যাগে সরব প্রতিবাদ

যেকোনও ঘটনায় এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি প্রতিবাদের বড় জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাসিরনগরে হিন্দুমন্দিরে হামলার পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার নাসিরনগরে হামলার ঘটনা যতটা না গুরুত্ব পেয়েছে, তারও বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের ‘মালাউনের বাচ্চা’ উক্তিটি।

ঘটনার তিনদিন পর স্থানীয় সংসদ সদস্য এলাকায় গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার জন্য ‘মালাউনের বাচ্চাদের বাড়াবাড়ি’কে দায়ী করেন। এর নীরব প্রতিবাদরূপে কেউ কেউ ফেসবুকে বদলে ফেলেন নাম। কেউ কেউ কেবল মালাউন হ্যাশট্যাগ দেন। আবার কেউ কেউ নিজেকে ‘মালাউন’দাবি করে দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও মন্ত্রী পরবর্তী সময়ে দাবি করেছেন, তিনি এসব শব্দ উচ্চারণ করেননি।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একজন লিখছেন, ‘আজকে থেকে নিজের প্রোফাইল নাম পরিবর্তন করে #মালাউন রাখলাম। এটা আমার জায়গা থেকে প্রতিবাদ।’

শিশির ভট্রাচার্যের স্টাটাসশিশির ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘মালাউন’ নয়, মন্ত্রী নাকি বলেছেন ‘মালাউনের বাচ্চা’ । মন্ত্রীর কথাটাতো ঠিকই আছে। তিনি নিজের শেকড় চেনেন। যারা তার কথার প্রতিবাদ করছেন, তারা বুঝতে পারছে না, কত বড় সত্যি কথা তিনি বলে ফেলেছেন। যারা বাড়াবাড়ি করেছেন, তারা বাংলাদেশের কিছু মানুষ। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষের ৯৯.৯৯৯৯% অংশের পূর্বপুরুষ অমুসলমান।’

সায়েদা সুলতানা এ্যানি তার ওয়ালে লিখেছেন, ‘‘বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ, আমি মালাউন এ রকম প্রোফাইল পিকচার করবেননা। নামের মাঝে মালাউন শব্দটি ঢোকাবেন না। মালাউন আরবি শব্দ। এর মানে ‘অভিশপ্ত’এটা সবাই জানেন। যে ঊনমানুষ ‘মানুষ’কে অভিশপ্ত ফতোয়া দেয়, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, #প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তার সঙ্গে আপনার #অভিমানের সম্পর্ক নয়। সে আপনাকে একটুও ছাড় দেয় না। আপনি কেন তার সঙ্গে #আহ্লাদি খেলা খেলছেন? ছাড় দিচ্ছেন। প্রতিবাদের ভাষা সরাসরি হোক। এটা শাবানার বাংলা সিনেমা নয়। এ সব মর্ষকাম মানুষের চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।

আনামুল হক এনাম নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্ত্রীর করা উক্তিকে উল্লেখ করে বলেন, ‘মালাউন: একটি জাতিবিদ্বেষমূলক গালি যা বাংলাদেশে মূলত বাঙালি হিন্দুদের উদ্দেশে সাম্প্রদায়িক মুসলমানেরা ব্যবহার করে থাকে। মালাউন শব্দটি আরবি শব্দ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ অভিশপ্ত বা আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত।’

আনামুল হক এনাম আরও লিখেছেন, ‘‘#ব্যবহার: ১৯৪৬ সালে মোহনদাস গান্ধির সঙ্গে নির্মলকুমার বসু নোয়াখালীতে সেবা কাজ করতে আসেন। তিনি লক্ষ করেন হিন্দুদের মালাউন বলে গালি দেওয়ার রীতি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ গণহত্যা চলাকালীন পাকিস্তানি সেনারা বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবকে হত্যা করে। হত্যা করার পূর্বে তাকে মালাউন বলে সম্বোধন করে সেনারা। ১৩ এপ্রিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজে আর এক বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু দানবীর নূতনচন্দ্র সিংহকে নিজে গুলি করে হত্যা করেন। উপস্থিত মুসলমানরা নূতনচন্দ্র সিংহের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলে তাদের ভর্ৎসনা করে তিনি বলেন, ‘সামান্য একটা মালাউনের মৃত্যুতে এত শোক প্রকাশ করার কী আছে?’ সুতরাং দাঁড়ি, টুপি দেখলেই জঙ্গি কিংবা সনাতন ধর্মের মানুষদের মালাউন বলে জাতি বিদ্বেষ না ছড়িয়ে মানুকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করাই মানুষের কাজ বলে মনে করি। তা না হলে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মশিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের শব্দের ব্যবহারের কারণে মানুষের মনে যে পীড়াদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই ক্ষতে মলম বলতে পারেন এসব প্রতিবাদকে। যখন হিন্দু জনগোষ্ঠীকে এ ধরনের শব্দ দিয়ে গালি দেওয়া হচ্ছে, তখন মুসলিমরাই যদি নিজেদের সেই শব্দে চিহ্নিত করতে এগিয়ে আসে, তাহলেই সামাজিক ভাতৃত্ববোধের প্রকাশ।’

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।