নাসিরনগর থেকে গোবিন্দগঞ্জ : রুখে দেয়ার সময় এখনই

ঘটনা দিয়ে ঘটনার ধামাচাপা। অশ্রু দিয়ে অশ্রুর সংবরণ। নাসিরনগর থেকে গোবিন্দগঞ্জ। সংখ্যালঘুর কান্না যেন থামছেই না। রাষ্ট্রে থেকেও যেন রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছেই। ঘটনার তদন্ত হয়, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পায় না। প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও দোষীদের বিচার হয় না।

‘নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না’ অভিমত রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবুকদের। বিশিষ্টজনের মত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এ বর্বরতা থামাতে না পারলে সমাজ ভেঙে পড়বে। শৃঙ্খলা না থাকলে রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাও তীব্র হয়।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লীতে হামলা এবং রাষ্ট্রের দায় প্রসঙ্গে কথা হয় লেখক, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের সুযোগ রাষ্ট্রই করে দিচ্ছে। এই অত্যাচার ধারাবাহিকভাবেই হয়ে আসছে। রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন ও গাইবান্ধায় সাঁওতালপল্লী পুড়িয়ে দেয়া সবই একইসূত্রে গাঁথা। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়’।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের চরিত্রই এটি- এমন মন্তব্য করে এই বুদ্ধিজীবী বলেন, নদীতে বড় মাছ যেমন ছোট মাছ গিলে খায়, রাষ্ট্রেও তাই চলছে। রাষ্ট্র নিজেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। রাষ্ট্র আগ্রাসী হয়ে ওঠার প্রধানতম কারণ হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন না থাকা। জনগণের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্র এমন আচরণ করতে পারতো না।

বামপন্থী রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনো বলেন, যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই সংখ্যালঘু বা আদিবাসীদের সম্পদ দখলে বেশি শক্তি দেখিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। দুর্বল এই জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ প্রতিনিয়তই ঘটছে। এজন্য গভীর কোনো গবেষণার দরকার নেই। ক্ষমতাসীনদের অর্থ চাই, সম্পদ চাই। আর দুর্বলরাই সেই অর্থের জোগানদাতা।

প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন , ‘আমরা যারা সমাজ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে ভাবি, তারা নীরব থাকলে সমাজের এই পচন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

বিশিষ্ট কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, মন পুড়ে যাচ্ছে। এভাবে কেউ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ঘর ছাড়া করতে পারে? রাষ্ট্র বা সরকারের ইন্ধন ছাড়া কেউ এমন পাষণ্ড হতে পারে না। প্রতিবাদ করার ভাষাও হারিয়ে ফেলছি।

সাঁওতালরা একেবারেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সরকারের সঙ্গে বিরোধ থাকলে শতবার আলোচনা হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার নিজেই আশ্রয়ের কথা বলছে, পুনর্বাসনের কথা বলছে, আবার সরকার নিজেই উচ্ছেদ করছে। সরকারের কেন এই আচরণ তা বুঝে আসছে না। সরকারের এই দ্বৈতনীতি মানুষের মধ্যে চরম উষ্মার জন্ম দিয়েছে। আমি এই দ্বৈতনীতির তীব্র প্রতিবাদ করছি।

সমাজে এমন বর্বরতা শুরু হয়েছে অপারেশন ক্লিনহার্ট থেকে- মত দেন আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, আইন মেনে না চলা, আইনের বাস্তবায়ন না করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনা।
এতে সমাজে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠছে। তারই প্রতিফলন দেখছি আমরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। আর এখন দেখছি সংখ্যালঘুদের সহিংসতা। জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির সঙ্গে আমরা নারী-শিশু হত্যা ধর্ষণও প্রত্যক্ষ করছি।

তিনি আরো বলেন, যে দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীই আইন মানে না, সে দেশে আজ হোক কাল হোক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বেই। আর এখন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়াটাই শুরু হয়েছে।

কথা হয় লেখক, প্রাবন্ধিক শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আচরণ বর্বর থেকে বর্বরতর হচ্ছে। সাঁওতালরা সমাজের প্রান্তিক মানুষ। তারা দুর্বলের মধ্যে দুর্বল মানুষ। সেই মানুষদের ওপর এমন বর্বরতা!

মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার তাগিদেই ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মাহুতি। আজ কোথায় সেই অধিকার?

তিনি বলেন, হামলার শিকার সাঁওতালদের কাছে রিলিফ পর্যন্ত কেউ পৌঁছে দিতে পারছে না। পুলিশ, ক্ষমতাবানরা ঘিরে রেখেছে। ২০০ পরিবার এই শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। তারা অবরুদ্ধ।

নাসিরনগরের ঘটনার চেয়ে সাঁওতালপল্লীর ঘটনা আরো ভয়াবহ। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো জোরালো প্রতিবাদ নেই।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নির্বিকারে আমারও যদি নীরব থাকি, তাহলে শেষ বিচারে কেউ রক্ষা পাব না। সময় এখনই প্রতিবাদ করার, রুখে দেয়ার।

ঘটনা দিয়ে ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, একই ঘটনা বারবার ঘটছে। আগের ঘটনার বিচার হয়নি বলেই পরের ঘটনাগুলো ঘটছে। সরকারের উদাসীনতার কারণেই একের পর এক ঘটনা ঘটছে বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা উচিত একটি ঘটনা দিয়ে হাজারো ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নিলে শেষ রক্ষা হবে না।

তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক অনেক কথা বলছেন। ভালো। মানুষের আস্থা তখনই ফিরবে যখন কথার বাস্তবায়ন হবে।

jagonews24

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।