নাসিরনগরে লুটপাটকারীদের টার্গেট ছিল টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার সময় দুর্বৃত্তদের একাংশের টার্গেট ছিল তাদের বাড়িঘরে লুটপাট। ধর্মের নামে উসকানি দিয়ে ওই হামলার ভেতরেই সুযোগ সন্ধানীরা তাদের ঘর থেকে খুঁজে খুঁজে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, টেলিভিশনসহ মূলবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। মূল্যবান জিনিসের খোঁজ না দেওয়ায় অনেককে নির্মমভাবে মারধরও করা হয়েছে। এসব দুর্বৃত্তের অনেকেই ছিল টুপি পরা ও উঠতি বয়সের তরুণ।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে নাসিরনগর পূর্বপাড়া, পশ্চিমপাড়া, কাশিপাড়া, ঘোষপাড়া, নমশুদ্রপাড়া, দাসপাড়া, গাঙ্কুলপাড়া এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এ অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় প্রশাসনও লুটপাটের বিষয়টি অস্বীকার করেনি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ছিনতাই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে একটি তালিকাও করছে প্রশাসন।

ফেসবুকে আপলোড করা একটি পোস্টের সূত্র ধরে গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে ওই ঘটনা ঘটে। ওই দিন কয়েকটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন পূর্ব ঘোষণা দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয় নাসিরনগরে। সে কর্মসূচি চলাকালে পাশের উপজেলা থেকে ধর্মের নামে উসকানি দিয়ে মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে লোক জড়ো করে নাসিরনগর উপজেলা সদরের বেশ কিছু গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সময় তাদের মন্দিরও ভাঙচুর করা হয়। আর এর ভেতরেই চলতে থাকে লুটপাট। সেদিনের কথা স্মরণ করে এখনও শিউরে ওঠেন ঘটনার শিকার হিন্দু পরিবারের সদস্যরা।

বাংলা ট্রিবিউনকে কাশিপাড়া গ্রামের পূর্ণিমা রানী দাস বলেন, ‘ সেদিনের (৩০ অক্টোবর) কথা কোনওদিন ভুলতে পারবো না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেদিন দা-লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল লোক আমার ঘর কুপিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। এ সময় মাথায় টুপি পড়া উঠতি বয়সের একদল যুবক আমার ঘরে প্রবেশ করে শোকেস ভেঙে নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা বিছানার তোষক-চাদর উল্টে পাল্টে টাকা-পয়সা খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে ঘরের ভেতরে রাখা নিত্য পূজার সিংহাসনটি ভেঙে বাইরে ফেলে দেয় এবং কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে স্বর্ণের মূর্তি ভেবে পিতলের মূর্তিগুলো নিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমার মন ভেঙে গেছে। জানি এ ঘটনার বিচার হবে না।’

নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা

একই কথা জানান ওই এলাকার উষা রানী দাস। তিনি বলেন, ‘সেদিন কী যে হয়েছিল নিজেই বুঝতে পারিনি। একদল লোক হঠাৎ এসে আমার ঘরবাড়ি ভেঙে তছনছ করে দিয়ে টিভি ও স্বর্ণালংকারসহ সব কিছু নিয়ে যায়।’

ঘোষপাড়া গ্রামের বিমল বিহারী চৌধুরী বলেন, ‘এমন ঘটনা আমরা কখনও দেখিনি। প্রায় সাতশ’ থেকে আটশ’ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে আমার বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা আমার ভাই লিটন চৌধুরী, ভাতিজা, সুব্রত চৌধুরীকে পিটিয়ে আহত করে। আমাদের ঘর থেকে নগদ দুই লাখ টাকা, আট ভরি স্বর্ণালঙ্কার, একটি টিভি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।’

পশ্চিম পাড়ার কৃষ্ণ দাস ও শ্যামল দাস বলেন,‘কী হয়েছিল বুঝতে পারছি না। তবে আমাদের খুব ক্ষতি হয়ে গেল, এটা আর বোঝার অপেক্ষা রাখে না।’

নমশুদ্রপাড়ার সুব্রত সরকার বলেন, ‘আমাদের বাড়ির বারোয়ারী মন্দিরটি ভাঙচুর করা হয়। এ সময় দুবৃর্ত্তরা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।’

নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুরের সময় অনেককে মারধরও করা হয়

গৌর মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী বলেন, ‘হামলায় নাসিরনগরের কেন্দ্রীয় মন্দিরটি বিধস্ত হয়ে পড়ে আছে। হামলাকারীরা ঘটনার দিন মন্দিরের সেবায়েত শংকর সেন ব্রক্ষচারীকে পিটিয়ে আহত করে এবং মন্দিরে থাকা মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলে। এ সময় নগদ ২৫ হাজার টাকা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। ’

এসব হামলা ঘটনার নেপথ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনারও খবর পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ ইকবাল হোসেইন বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। কার কী হারিয়েছে, এ ব্যাপারে তথ্যানুসন্ধান করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার চক্রবর্তী বলেন, কার কাছ থেকে কত টাকা ও কী পরিমাণ স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে সে বিষয়ে পুলিশের তালিকা পাওয়ার পর আমরা একটি তালিকা করবো। পরে ওই তালিকার সঙ্গে নিজেদের তালিকা মিলিয়ে দেখা হবে।

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।