নারায়নগঞ্জবাসী ব্যালটের মাধ্যমে দেশব্যাপী গুম​-খুন-হত্যার জবাব দিতে চায় !

আমাদের মতো দেশে সরকার সব সময় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। সে কারণে শুধু কাগুজে ক্ষমতা নয়, একটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা, সদিচ্ছা এবং সাহস অপরিহার্য। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ‘যোগ্যতা’নেই। ‘সদিচ্ছা’নেই তাও তারা বারবার প্রমাণ করেছেন। আর ‘সাহস’তো সামান্যতমও নেই।

সুতরাং একটি নির্বাচন সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করার তিনটি উপাদানের একটিও নেই নির্বাচন কমিশনের। সেই প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা? তা প্রায় সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে সরকার চায় কিনা! এখন পর্যন্ত সরকারের যে আচরণ তাতে মনে হচ্ছে সরকার চায় নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। যুক্ত-তর্কে না গিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, ধরে নিয়ে আলোচনা করছি।

০১.
যে কোনো বিচারে সেলিনা হায়াৎ আইভি একজন যোগ্য প্রার্থী। শুধু নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষিতে নয়, সারা দেশের প্রেক্ষাপটে আইভি একজন অনুকরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেলিনা হায়াৎ আইভির বাবা আলী আহম্মদ চুনকা আওয়ামী লীগের একজন আদর্শবান রাজনীতিক ছিলেন। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের মানুষের প্রিয়মুখ, সুখ-দুঃখের সাথী। আইভি বেশ কিছু বছর বিদেশে অবস্থান করে, ফিরে এসে বাবার আদর্শ ধারণ করছেন বলে নারায়ণগঞ্জের মানুষ তা বিশ্বাস করেন। দুইবার কমিশনার একবার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করে নারায়ণগঞ্জের মানুষ তার প্রমাণ দিয়েছেন। তিন মেয়াদে প্রায় ১৩ বছর দায়িত্ব পালনে কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ করেছেন। বিস্ময়করভাবে প্রায় শতভাগ সততার পরিচয় দিয়েছেন আইভি।

আবারও বলছি, বিস্মিত না হয়ে কোনো উপায় নেই, নারায়ণগঞ্জের প্রায় প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করেন আইভি কোনো দুর্নীতি করেননি। এক সময়ের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী নগরী থেকে নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাসের নগরে পরিণত হয়েছে। এই সন্ত্রাসের নগরে রাজনীতি করার জন্যে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি ছিল, সেটা হলো সাহস। আইভি তারও প্রমাণ দিয়েছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সততা এবং আদর্শ নিয়ে সংগ্রাম করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

০২.
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত বিএনপির রাজনীতির খুব পরিচিত মুখ না হলেও, গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেব পরিচিত। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত অপহরণ-হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জের মানুষও তাকে একজন সাহসী সৎ মানুষ হিসেবে দেখেছেন। সেই দিক দিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভির যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের একজন সৈনিক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনও। যদিও দু’জনের রাজনৈতিক আদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিচ্ছন্ন ইমেজের সাখাওয়াত বিএনপির যোগ্য প্রার্থী তাতে সন্দেহ নেই।

০৩.
দুই প্রার্থীর তুলনামূলক বিচারে সেলিনা হায়াৎ আইভি এগিয়ে থাকবেন অনেকখানি। আইভি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন একবার নয়, তিন তিন বার। সাখাওয়াত ভালো ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েছেন।
সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতেও বিএনপির নেতা-কর্মীরা সক্রিয় নয়। প্রশাসন এবং শামীম ওসমানের কারণে নারায়ণগঞ্জের বিএনপির নেতারা রাজনীতি দূরে থাক এলাকাতেই ঠিকমতো থাকতে পারেন না। দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও আছে। তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত সাখাওয়াত প্রার্থী হয়েছেন। কোন্দল সত্ত্বেও বিএনপি-জামায়াতের ভোটের পুরোটাই পাবেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সক্রিয়। শামীম ওসমান ঘরানার সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ-দখলের রাজনীতি নারায়ণগঞ্জকে সব সময় আলোচনায় রাখে। এর বিপরীতে রাজনীতির আদর্শ-সততা-সাহসী চরিত্র সেলিনা হায়াৎ আইভি। তিনিও আওয়ামী আদর্শের মানুষ এবং এবারের আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগের কোন্দল অনেক অনেক গুণ বেশি।

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন শামীম ওসমান। সংগঠন তার নিয়ন্ত্রণে। আওয়ামী লীগের ভোটের উপরে শামীম ওসমানের নিয়ন্ত্রণ নেই। দলীয় কোন্দলের অবস্থা যাই থাকুক, আওয়ামী লীগের ভোট সেলিনা হায়াৎ আইভি পাবেন।

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ভোটের বাইরে আরও ভোট আছে। যে ভোট নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।

০৪.
গত নির্বাচনে এই ভোটের পুরোটাই আইভি পেয়েছিলেন। বিএনপির ভোটও তিনি পেয়েছিলেন। যে কারণে শামীম ওসমানকে প্রায় এক লাখ ভোটে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। এবার বিএনপির ভোট আইভি পাবেন না। আওয়ামী লীগের ভোট তো পাবেনই, আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরের কিছু ভোট তিনি এবারও পাবেন। প্রশ্ন হলো কী পরিমাণ পাবেন? তা এখন নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, এই ভোট পাওয়া না পাওয়া বিষয়ে একটা পর্যালোচনা করা যায়-

ক.
দলীয় ভোটের বাইরের ভোট এযাবতকালে আইভি পেয়েছেন, কারণ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সাহসী অবস্থানের কারণে। যাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আইভি সাহসী পরিচিতি পেয়েছেন, সেই শামীম ওসমান এবার আইভির ‘পাশে’রয়েছেন। ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে শুরু থেকেই সোচ্চার আইভি। নারায়ণগঞ্জের মানুষ যে তাকে পছন্দ করেন, এটাও তার একটা কারণ। ত্বকী হত্যার অভিযোগ ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে। র‌্যাবের তদন্তে এবং গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামীর স্বীকারাক্তিতে তার প্রমাণ মিলেছে। শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ করেছেন, আইভি ত্বকী হত্যার বিচার চায়। শামীম ওসমানের দৃষ্টিতে এটা আইভির একটা বড় অপরাধ! সেই শামীম ওসমান এবার নৌকা প্রতীক দিয়ে বানানো শাড়ি উপহার দিয়েছেন আইভিকে।

এই শাড়ি পরে প্রচারণায় গেলে মানুষ বলবেন, বিএনপি বলবে ত্বকী হত্যায় অভিযুক্তদের দেয়া শাড়ি পরে আইভি ভোট চাইতে এসেছেন। যা তার জন্যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে। আবার এই শাড়ি না পরলে, শামীম ওসমানরা বলবেন, আমরা সহায়তা করতে চাইলেও আইভি নেন নি, নৌকা প্রতীকের কারণেই তিনি শাড়ি পরেননি। আইভি আওয়ামী লীগের আদর্শ ধারণ করেন না।

উভয় সঙ্কট কাকে বলে, তা আইভির অবস্থানে না থাকলে অনুধাবন করা কঠিন।

খ.
শামীম ওসমান ‘পাশে’থাকার কতটা সুবিধা আইভি পাবেন! শামীম ওসমান আইভির জন্যে ভোট জোগাড় করে দিতে পারবেন না, বিশেষ করে দলীয় পরিচয়ের বাইরের ভোট। শামীম ওসমান কর্মী-ক্যাডারের জোগান দিতে পারবেন।

গ.
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভির বাড়তি কর্মী-ক্যাডারের প্রয়োজন নেই, দলীয় পরিচয়ের বাইরের ভোটের প্রয়োজন আছে। আওয়ামী লীগ করেন না যারা আইভিকে ভোট দেবেন বা দিতেন শামীম ওসমান ‘পাশে’থাকায় তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বা সংশয়ে পড়ে যেতে পারেন।

ঘ.
দলীয় পরিচয়ের বাইরের ভোটারদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করিয়ে, তাদের ভোট নিজের বাক্সে টানার সামর্থ্য সেলিনা হায়াৎ আইভির আছে। যা শামীম ওসমানও জানেন। এখন শামীম ওসমানের দৃশ্যমান বক্তব্য যাই হোক, আইভির বিজয় শামীম ওসমান চাইবেন, তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

ঙ.
এই ভোট যাতে আইভির বাক্সে না পড়ে সেই চেষ্টা-কৌশল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কথা দিয়ে প্রতিপক্ষকে এমনভাবে আক্রান্ত করা হতে পারে, যাতে আতঙ্ক ছড়ায়। প্রতিপক্ষের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণ করেও আতঙ্ক ছড়িয়ে আইভির ইমেজ ক্ষতি করার চেষ্টা হতে পারে। গতবারের প্রতিদ্বন্দ্বী শামীম ওসমানের চেয়ে এবারের আইভির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ‘পাশে’ থাকা ‘বড় ভাই’। যিনি গত পাঁচ বছর ধরে আইভির চরিত্রহননের অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। কথা-পোস্টার-বিলবোর্ড কোনো প্রক্রিয়া বাদ রাখেননি চরিত্রহনন পরিকল্পনায়। আইভির বিরুদ্ধে দুর্নীতির কাগজপত্র নিয়ে টেলিভিশনে এসেছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন। তদন্তে প্রমাণ হয়েছে এসব অভিযোগ অসত্য। কিন্তু ‘বড় ভাই’হাল ছেড়ে দেননি। নিরুপায় হয়ে এখন তিনি ‘পাশে’থাকছেন। এটাও তার একটা কৌশল।

চ.
সম্ভাবনা আছে, সমস্ত কৌশলকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে, বেরিয়ে আসবেন নারায়ণগঞ্জের জনমানুষের ভালোবাসার মানুষ সেলিনা হায়াৎ আইভি।

০৫.
কোনোভাবেই যদি আইভির পরাজয় নিশ্চিত না করা যায়, তবে আবারও কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। আওয়ামী লীগের কর্মী-ক্যাডারদের নেতৃত্বে কিছু ভোট কেন্দ্র দখল হয়ে যেতে পারে, প্রমাণ মিলতে পারে জাল ভোট দেয়ার। আইভির চরিত্রের সঙ্গে যা যায় না, এবং তার জন্যে এমন কোনো কিছুর প্রয়োজনও নেই। তাকে বিতর্কিত করে দেয়া বা বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, এমন পরিচিতি দেয়ার জন্যে এমন অপকর্ম করা হতে পারে।

০৬. সেলিনা হায়াৎ আইভির গত নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী চেনা ছিল, এবার চেনার সঙ্গে আছে অচেনা ‘ভয়ঙ্কর শক্তি’। তারা ‘পাশে’আছেন। ‘পাশ’ থেকে না পারছেন সরাতে, না পারছেন স্বীকার করতে, না পারছেন অস্বীকার করতে।
বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করে এবার আইভিকে নৌকা কূলে ভেড়াতে হবে। যা অত্যন্ত কঠিন। সামগ্রিকভাবে সরকারের নেতিবাচক ইমেজও আইভির প্রতিদ্বন্দ্বী।

সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তা হবে তুমুল প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ণ। সব প্রতিকূলতা বিবেচনা করেও, তাতে অনেকটাই এগিয়ে থাকবে নৌকা। কারণ আর কিছু নয়, এই নৌকার মাঝি সেলিনা হায়াৎ আইভি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।