রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে বিএনপির ১০ বছর

রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বাইরে থাকার ১০ বছর পূর্ণ হল দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংঘাত, রক্তপাত ও প্রাণহানির মধ্যে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় বিএনপি। দ্রুত সরকার গঠনের স্বপ্ন থাকলেও দেখতে দেখতে গত শুক্রবার ক্ষমতার বাইরে এক দশক পূর্ণ হল বিএনপির।

দলটি আবার কবে ক্ষমতায় আসবে সে হিসাব-নিকাশ এখন যেমন দলের অভ্যন্তরে তেমনি রাজনীতি বিশ্লেষকদের কাছেও। এর আগে এরশাদ শাসন আমলের ৯ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে ছিল। এবার তা ১০ বছর পেরুলো।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি ক্ষমতা হারা হওয়ার পর এই দলের উপর যে দমনপীড়ন গিয়েছে তা অতীতে কোনো বিরোধী দলের উপর হয়নি। দলটির নেতাকর্মীদের উপর শুধু মামলা নয়, গুম খুনেরও স্বীকার হতে হচ্ছে।

বিএনপি চাইলেই সভা-সমাবেশ করতে পারেনি। এমনকি অভ্যন্তরীণ সভা করতেও বাধার মুখে পড়ে। তার উপর কথায় কথায় বিএনপি নেতাকর্মীদের জেলহাজতে যেতে হয় বলে দলটি রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা।

তবে বিশ্লেষকরা এও মনে করেন, সার্বিক পরিস্থিতিকে রাজনীতির কৌশল দিয়ে সামলাতেও পারেনি বিএনপি। বারবার আন্দোলনের কথা বলে আন্দোলন জমাতে পারেনি। উল্টো নিজেরাই কোনো ঘোষণা ছাড়া আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে উঠে এসেছে। সংলাপের কথা বলে সাড়া পায়নি। বিএনপির জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দেইনি কেউ। এছাড়া নিজেদের ঘর গোছাতে গোছাতে বরাবরই যেন নিজ হাতে ভেঙেছে অনেক কিছু। সংগঠন পূর্ণ গোছানো হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির শুভানুধ্যায়ী রাজনীতি বিশ্লেষক ও গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকতে থাকতে বিএনপি এখন শোকে ম্রিয়মান। দলটির নেত্রী তার সন্তানদের শোকে এখন আর রাজনীতির সেই পূর্ণ স্রোতের সাথে তাল মিলাতে পারছেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য-সহ সিনিয়র নেতারা এই দশ বছরে কোনো কাজ করেনি।

জাফরুল্লাহ বলেন, বিএনপি সরকারকে সংলাপে বসার আহবান জানাচ্ছে। এতে কোনো লাভ নাই। রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসাবে বামদলগুলো এখন সরকারের বি টিম। আর জাতীয় পার্টি মৃতপ্রায়। এমতাবস্থায় বিএনপির রাজনীতির মাঠের বলটি নিয়ে এখন খেলা উচিত। সব শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। তাহলে হয় বিএনপি ক্ষমতায় যাবে, না হলে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকবে।

তিনি বলেন, বিএনপির আগামী তিন চার বছরে ক্ষমতায় আসা কঠিন হবে।

বিএনপির ক্ষমতার বাইরে থাকার ১০ বছরকে কেমন মূল্যায়ন করেন জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মূল্যায়ন করার আর কি আছে? দলের এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা নেই।

এই ১০ বছরে নিজেদের আত্মসমালোচনা করতে চাইলে কীভাবে তা করবেন জানতে চাইলে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‍শুরু থেকে আমাদের গুরুতর দুটি ভুল ছিল। প্রথমত অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদকে কোনোভাবেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত হয়নি। আর এরপর ঘটনা পরিক্রমায় এমাজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়াটাও ছিল গুরুতর সমস্যা।

জমিরউদ্দিন বলেন, এর বাইরেও গুরুতর দুটি বিষয় আছে। যা এখনও প্রকাশের সময় হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে বিএনপি শক্তিহীন মনে হচ্ছে, কিন্তু আসলে যেভাবে দলটিকে দমিয়ে রাখা হয়েছে তাতে এক সময় এর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

গয়েশ্বর রায় বলেন, ক্ষমতার ভেতর-বাইরে থাকা মুখ্য কোনো বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে একটি দল ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকাটাও বিষয় না, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থাকাও উল্লেখযোগ্য কিছু না। একইভাবে গণতান্ত্রিক চর্চার বাইরে কোনো দলের ১০ দিনও ক্ষমতায় থাকাটা উচিত না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।