৬৮ বছর পর বিলুপ্ত ছিটমহলে ভোট উৎসব

দীর্ঘ ৬৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটলো বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর। গতকাল অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। দীর্ঘ সময় পর ভোটের এ আয়োজনে উৎসবমুখর ছিল বিলুপ্ত ছিটমহলে। আংশিকসহ গতকাল সারা দেশের ৩৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সর্বশেষ এ ইউপি নির্বাচনেও অতীতের মতো দখল আর জাল ভোটের চিত্র দেখা গেছে। ভোরে কেন্দ্র দখল করে সিল মারার কারণে নোয়াখালীর সেনবাগের স্থগিত কেন্দ্রের নির্বাচন আবারও স্থগিত করা হয়েছে। ফেনীতে নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যাপক সংঘর্ষ গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। লক্ষ্মীপুরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে প্রার্থীসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। বিভিন্ন ইউপিতে অনিয়ম, জালিয়াতি ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকে নির্বাচন বর্জন করেন। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, নাগরিকত্বসহ ভোটের অধিকার ও ভোট প্রদানের মাধ্যমে ৬৮ বছরের বেদনার সমাপ্তি ঘটেছে পঞ্চগড় জেলার বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে গতকাল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে দিনটিকে ইতিহাসের সাক্ষী করে রাখলেন তারা। জীবনের প্রথম ভোট প্রদান করতে পেরে তারা আনন্দও প্রকাশ করেছেন। এতদিন তারা ভোট প্রদানের দৃশ্য চোখে অবলোকন করেছেন, আর আজ তারা ব্যালট পেপার হাতে নিয়ে তাতে সিল মেরে ঢুকিয়েছেন ব্যালট বাক্সে। তাদের এই আনন্দ যেন ভোলার নয়। গতকাল দুপুরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের পুকুরীডাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল অনন্য এক দৃশ্য। বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের কয়েকটি গ্রামের নতুন নাগরিকরা এখানে ভোট দিতে এসেছেন। তাদের ভোট প্রদানের জন্য করা হয়েছে আলাদা আলাদা বুথ। নারী ও পুরুষদের জন্য করা হয়েছে আলাদা বুথ। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সুলতান মাহমুদ জানালেন, এই কেন্দ্রে বিলুপ্ত ছিটমহলের কয়েকটি গ্রামের নারী ও পুরুষ মিলে ৫২৬ জন ভোটার রয়েছেন। তিনি জানান, দুপুর ১২টার মধ্যে তাদের ৭০ ভাগ ভোট প্রদান হয়ে গেছে। বিলুপ্ত ছিটের নারী ভোটাররা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের রহিমা খাতুন। সঙ্গে ছিলেন তারা এক জা ও ৬ বৌমা। তিনি জানান, সকলকে একসঙ্গে ভোট দিতে এসেছি। প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি। কি যে আনন্দ পাচ্ছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। একই কথা বললেন তার জা রমিছা খাতুনও। এ সময় তারা নতুন নাগরিকত্ব দিয়ে ভোটার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান।
ওই কেন্দ্রে পুরুষ বুথে ভোট দেয়ার জন্য এসেছিলেন বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের ঝেঝুপাড়া গ্রামের ৯২ বছর বয়সের বৃদ্ধ ফজল হক। বয়সের ভারে মুখ দিয়ে তারা কথা বেরুচ্ছিল না। মুখের কাছে কান  পেতে শোনা গেল তার আনন্দের কথা। তার কথার সারমর্ম হলো- ‘ভাবিনি কখনো বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে ভোট দিতে পারবো। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে আজ ভোট দিতে পারলাম। এখন মরেও শান্তি পাবো। তরুণ ভোটারদেরও আগ্রহের কমতি ছিল না। ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের যুবক আল আমীন জানান, ভোটার হওয়ার বয়সও হলো, বাংলাদেশি নাগরিকও হলাম। এর চেয়ে আনন্দ আর কি হতে পারে? পুরুষ বুথে এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর এজেন্ট গারাতি পূর্ব শালবাগান গ্রামের আনার আলী (৮২)। তিনি বলেন, আগে ভোট দিয়েছি, তারপর এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ভোট দেয়ার কি যে আনন্দ তা আজ নিজে টের পেলাম। বয়স হয়েছে, আর কোনো দিন ভোট দিতে পারবো কিনা জানি না। তবে আজ জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো।
কেন্দ্রের বাইরে কথা হয় বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের প্রাণের সংগঠন নাগরিক অধিকার সমন্বয় কমিটি পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার সভাপতি মফিজার রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আজকের দিনটি আমাদের কাছে ঈদের চেয়েও আনন্দের। ছিটমহল বিনিময়ের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করে যখন সফলতা পেলাম সেদিনের আনন্দ আমাদের ভোলার নয়। আর আজ ভোটার হয়ে ভোট দিতে পেরে আজকের দিনটিকে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রাখলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।