মুসলিম হিজাবী মেয়ের ভাইফোঁটা উদযাপন ! ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়

মাননীয় মন্ত্রী তারানা হালিমের এপিএস ছাত্রলীগের জয়দেব নন্দী , রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে এক হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীর হিন্দুদের ভাইফোটা উদযাপনের ছবি শেয়ার করেছে। এতে ফেসবুকে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ এটিকে অসাম্প্রদায়িকতা হিসেবে দেখছে কেউবা ইসলাম ধর্ম অবমাননা । আসুন দেখে নেই ভাইফোটার কিছু ইতিহাস
14938335_1247101135353390_3461495814641830432_n

ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের কাছে বোনের আকুতি, ভাইয়ের সাফল্য, দীর্ঘায়ু লাভের জন্য বোনের প্রার্থণাই ‘ভাইফোঁটা’ কে মহিমান্বিত করেছে। প্রথা অনুযায়ী শুক্লাতিথির দ্বিতীয়াতে ভাইফোঁটা উদযাপিত হয়। প্রয়োজনে পরবর্তী সাতদিন ভাইফোঁটা উদযাপণ করা যায়। পঞ্জিকার হিসেবমতে কালীপূজার দুই দিন পরে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠিত হয়। ভাইফোঁটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক গুরুত্ব অনেক বেশী, যেখানে ভাই-বোনের মধ্যেকার প্রীতি ও ভালোবাসার স্বর্গীয় সম্পর্কটিই মূখ্য। ভাই বোন দুজনেই বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকে।

ভাইফোঁটা যেভাবে উদযাপিত হয়ঃ

সাধারণতঃ শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়াতে ভাইফোঁটা্র লগ্ন ঠিক হয়। এই হিসেব ধরেই বোন তার ভাইদেরকে নিমন্ত্রণ জানায় তার বাড়ীতে। কাছে-দূরে যেখানেই থাকুক, বোনের নিমত্রণ রক্ষা করতে ভাইয়েরা ছুটে আসে। ঠিক সন্ধ্যাবেলা ভাইকে আদর সমাদর করে সূতির আসনে বসতে দেয়া হয়। বোনের হাতে থাকে ঝকঝকে পেতলের রেকাবী। রেকাবী সাজানো হয়, ঘরে তৈরী কাজল, চন্দন বাটা, ধান-দূর্বা, শুকনো পাটপাতা এবং মিষ্টি দিয়ে। পাশেই রাখা হয় ঘিয়ের প্রদীপ। বোন তার কড়ে আঙুলে কাজল ছুঁইয়ে ভাইয়ের দুই ভুরুতে এঁকে দেয়। এরপর চন্দনের ফোঁটায় কপাল অংকিত করে, কপালের ঠিক মাঝখানে কড়ে আঙুলকে স্পর্শ করে প্রচলিত ছড়া কাটেঃ
14956520_878451618923270_6830137068275186848_n

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

যম দুয়ারে পড়লো কাঁটা

যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা

আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা

আজ থেকে আমার ভাই.

যম দুয়ারে তিতা।

ছড়া শেষে বোন ভাইয়ের মাথায় ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে, পাশ থেকে বেজে উঠে উলুধ্বনি আর শংখধ্বনি। শংখধ্বনিতে ভাইয়ের জীবন থেকে সকল বালা –মুসিবত দূর হয়ে যায়, ভাইয়ের মুখে একটু তেতো নিমপাতা বা পাটপাতা তুলে দিতে হয়। ভাইকে তেতো মুখে বেশীক্ষণ থাকতে হয়না, সাথে সাথে থালা ভর্তি মিষ্টি খেতে দেয়া হয়। শুধু কী মিষ্টি? মিষ্টির সাথে ভাইকে বোনের পক্ষ থেকে উপহার দেয়া হয়। অবশ্য কোন কিছুই একতরফা হয়না। বোন যেমন ভাইকে দেয়, ভাইও বড় বোনকে প্রনাম শেষে দিদির হাতে উপহার তুলে দেয়। আর বোন যদি বয়সে ছোট হয়, তাহলে বড় ভাইকে প্রনাম করে, ছোট বোনের হাতে উপহার তুলে দিতে ভাইয়ের আনন্দের সীমা থাকেনা। এভাবেই ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা ও প্রীতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এই ছোট্ট আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের সকলে মিলে আরও বড় পরিসরের আনন্দ-উৎসবে মিলিত হয়। বছরের অন্য দিনগুলোতে খাবারের মান যতই সাধারণ হোক না কেনো, ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানে ভাইয়ের পছন্দের খাবার রান্না করা হয়। বোনের যতটুকু সাধ্য, ভাইকে তা উজার করে দিয়ে সুখী হয়। বোনের কাছ থেকে এই পরম মমতামাখানো ভালোবাসা পাওয়ার টানেই ভাইয়েরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে এই দিনটির জন্য।
14907005_666345613542557_7353584338132055019_n

ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখ থেকেই শোনা, ঋকবেদে আছে, মৃত্যুদন্ডদাতা যম ও তাঁর বোন যমুনা হচ্ছে সূর্য্যের যমজ সন্তান, অর্থাৎ তারা যমজ ভাই বোন। বড় হয়ে তারা পরস্পর থেকে অনেক দূরে থাকতেন। দীর্ঘকাল অদর্শনে থেকে বোন যমুনার খুব ইচ্ছে হলো ভাই যমকে একটু দেখার। ভাইকে নিমন্ত্রণ করতেই ভাই যমরাজ বোনের বাড়ীতে এসে উপস্থিত। ভাইকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন শেষে ভাইয়ের জন্য মন ব্যাকুল হতেই বোন যমুনা ভাইয়ের সর্বাঙ্গীন কুশল কামনা করে প্রার্থনা করেন, ভাই যমরাজ খুব প্রীত হন বোনের এই আকুলতা দেখে। বোনকে নিশ্চিন্ত করতে বোনের ডাক পেলেই আবার আসার প্রতিশ্রুতি দেন। যমুনা তার ভাইয়ের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে খুশীতে আনন্দাশ্রু ফেলেন। সেই থেকেই ভাইয়ের মঙ্গল কামনা উৎসবের প্রচলন। সেই থেকেই ভাইয়ের কল্যানে অনুষ্ঠিত পরবটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন বাঙ্গালীদের মাঝে ভাইফোঁটা, নেপালে ‘ভাই টীকা’ অথবা ভারতের নানা প্রদেশে ‘ভাইদুজ’ নামে পালিত হয়। রাখীবন্দনও ভাইফোঁটার আরেক সংস্করণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।