প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ শিশু ধর্ষণের শিকার ! ৫ থেকে ১২ বছরের মধ্যে শিশুদের ধর্ষণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি !

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৮ শিশু। এছাড়া ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ৩১ ও গৃহকর্মী শিশু ৫। ১৫ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরো ৫৪ শিশুকে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা এনজিওদের মোর্চা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক প্রতিবেদনে শিশু ধর্ষণের এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ১০টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি।

ধর্ষণের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে বিএসএফ বলছে, ৫ থেকে ১৮বছরের শিশু কেউই ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের ঝুঁকিমুক্ত নয়। ৫ থেকে ১২ বছরের মধ্যে শিশুদের ধর্ষণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে চকলেট, খেলনা বা কোনো সৌখিন জিনিস দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে। আর ধর্ষণ করা হয়েছে নির্জন স্থানে বা বাড়িতে একা পেয়ে। ১৩ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে ।

সংস্থাটির তথ্য মতে, ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৫২১ শিশু। এদের মধ্যে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকার, ৩০ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় আর ৪ শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করে। ২০১৪ তে ১৯৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ২২ শিশু গণধর্ষণের শিকার, ২১ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় আর ২৩ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ায় আত্মহত্যা করে। ২০১৩ ধর্ষণের শিকার ১৭০ শিশু ও ২০১২ সালে ৮৬ শিশু।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, পুঁজিবাদ, আকাশ সংস্কৃতির প্রসার, আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্যের বিস্তৃতি প্রভৃতি কারণে মানুষের অবদমনের হার বাড়ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব না নিতে পারার কারণে সমাজের সবস্তরে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। আমাদের অভিভাকরা হয়তো কন্যা শিশুর পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝতে পারছেন না, নয়তো তাদের প্রতি নজর দিতে পারছেন না। কন্যা শিশুর নিরাপত্তা দিতে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. সাদেকা হালিমড. সাদেকা হালিম

অভিযুক্তরা আইনের আওতায় না আসায় শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে বলে মনে করে বিএসএএফ। তাদের মতে, ধর্ষণের ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। আবার ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের দায়ী করা চার্জশীট দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। নির্যাতিত শিশু দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিতদের পক্ষে সাক্ষী না থাকায় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এছাড়া, অপরাধীদের পক্ষে প্রভাবশালীদের সমর্থন থাকায় তারাও বিচার কাজকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন। কোথাও দরিদ্র অভিভাবকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপস করার চেষ্টাও চলে।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য পুলিশের সর্বস্তরে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপরাধী দমনে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। কন্যাশিশুসহ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সদাতত্পর রয়েছে।

বিএসএএফ এর এ প্রতিবেদনে কন্যা শিশুদের অন্যান্য নির্যাতনের পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। এ হিসেবে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৭ কন্যা শিশু ইভটিজিং, ১৮ শিশু যৌন হয়রানীর শিকার এবং ২৩টি শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। গত বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকালে ৬১ কন্যা শিশু ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছিল, বখাটেদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিল অন্তত ৮ কন্যা শিশু এবং বখাটেদের প্রতিহত করতে গিয়ে হামলায় আহত হয়েছিলেন ১০জন অভিভাবক।

শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, ১০টি জাতীয় দৈনিকের প্রতিদিনের সংবাদ হতে তথ্য বাছাই করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র হতে যাচাই করে নেয়া হয়েছে।

bonikbarta.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।