পাকুন্দিয়ায় পৌর নির্বাচনে দলীয় কোন্দলেই নৌকা-ধানের ভরাডুবি

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি।।

জেলার পাকুন্দিয়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আক্তারুজ্জামান খোকন।সোমবার ভোটগ্রহণ শেষে সন্ধ্যায় ফলাফল জানার পর থেকেই এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। পাকুন্দিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ।

পৌর নির্বাচনের ফলাফলই এখন হয়ে ওঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিজয়ী প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান খোকন এক হাজার ৬৭৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী বর্তমান মেয়র অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিনকে পরাজিত করেছেন। মো. আক্তারুজ্জামান খোকন (নারিকেল গাছ) পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৪৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন (ধানের শীষ) পান ৪ হাজার ৯৭৫ ভোট।

এছাড়া আওয়ামী লীগ প্রার্থী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মেছবা উদ্দিন (নৌকা) পান ৪ হাজার ৩৪৭ ভোট। নির্বাচনের পর গত তিন দিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দলীয় দুই প্রার্থীর ভরাডুবির নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ জানা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ও দলীয় কোন্দলের কারণে দুদলের এই ফল বিপর্যয়। তারা জানান, উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পর নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক পেয়ে অন্যরকম উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল পাকুন্দিয়া পৌরসভার ভোটারদের মধ্যে। এবারই প্রথম মেয়র পদে দলীয় প্রতীক পেয়ে ভোটারদের মধ্যে ছিল অন্যরকম একটি আমেজ।

এবার ধানের শীষ ও নৌকা প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় বড় ধরনের আমেজ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হবে- এমন ধারণা ছিল। কিন্তু সবকিছু ভেস্তে যায় দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য সাত প্রার্থীর মধ্যে তৃণমূলের ভোটে নির্বাচিত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোতায়েম হোসেন স্বপন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মেছবা উদ্দিনকে। নবীন ও তুলনামূলক দুর্বল এই প্রার্থীর দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিবদমান বিরোধ আরও তুঙ্গে ওঠে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে মেছবা উদ্দিনের সক্রীয় ভূমিকা না থাকায় তার দলীয় মনোনয়ন পাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকসহ অনেকেই। এই কারণে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে মোতায়েম হোসেন স্বপন সমর্থকরা টানা দুইদিন হরতাল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও প্রার্থী বদল হয়নি। ফলে কর্মীরা ভিড়তে থাকেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে।

নির্বাচনের শেষ দিকে এসে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দেখা গেলেও মনোনয়ন বঞ্চিত মোতায়েম হোসেন স্বপনের সমর্থন আদায় করা যায়নি। তিনি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আক্তারুজ্জামান খোকনের পক্ষে শেষ পর্যন্ত প্রচারণায় সক্রীয় ছিলেন। এর প্রভাব পড়ে সমর্থক ভোটারদের মাঝেও। একই অবস্থা বিএনপিতেও। বর্তমান মেয়র হিসেবে বিএনপির মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন।

কিন্তু দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন এবং বিগত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান খোকনকে সমর্থন না করায় দলীয় প্রার্থীকে ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে বিএনপি। মো. আক্তারুজ্জামান খোকনকে প্রার্থী করে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামেন পাকুন্দিয়া বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ইদ্রিছ আলী ভূঁইয়া। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের দলে যোগ দেন উপজেলা বিএনপির উল্লেখযোগ্য অধিকাংশ নেতাকর্মী। ইদ্রিছ আলী ভূঁইয়া ও তার অনুসারীদের এই সমর্থনে এখানে বিএনপি প্রার্থীর মূল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আক্তারুজ্জামান খোকন।

এই পরিস্থিতিতে গত ২২শে অক্টোবর কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান খোকনের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কারের চিঠি পাঠানো হয়। দল থেকে তাকে বহিষ্কারের বিষয়টিও সাধারণ নেতাকর্মী সহজভাবে মেনে নেননি। তার বহিষ্কারাদেশ পাওয়ার পর দলীয় গাত্রদাহ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আক্তারুজ্জামান খোকনও নিজেকে জনগণের প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করে প্রচারণায় সক্রিয় থাকেন। ফলে এটিও নির্বাচনে আক্তারুজ্জামানের একটি প্লাসপয়েন্ট হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের একাংশ, বিএনপির একাংশ ও সাধারণ ভোটারদের সমর্থন নিয়ে বেশ শক্ত অবস্থানে চলে যান। নির্বাচনের শেষ দিকে বিএনপি প্রার্থী দল সমর্থক ভোটারদের কিছুটা টানতে পারলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর শক্ত বলয়কে তিনি ভাঙতে পারেননি।

বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে বিপুল ভোটে জয়ী হন নারিকেল গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা আক্তারুজ্জামান খোকন। এলাকাবাসীর দাবি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে এভাবে দলীয় মনোনয়ন চাপিয়ে দেয়াটা সমীচীন হয়নি। প্রার্থী মনোনয়নের চরম ভুলের খেসারত দিলো আওয়ামী লীগ। একইভাবে দলীয় কোন্দল ডুবিয়েছে বিএনপি প্রার্থীকেও। এছাড়া দলীয় এই নির্বাচন এক পর্যায়ে সদর ও ইউনিয়নের লড়াইয়ে পরিণত হয়।

সদরের বাসিন্দা হিসেবে এর সুফল পুরোটা গেছে আক্তারুজ্জামান খোকনের ঘরে। ভোটারদের অভিমত, দলীয় মনোনয়নের তোয়াক্কা না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় আক্তারুজ্জামান খোকন দুদলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ান। তাকে ঠেকাতে চরম ম্যাকানিজম চলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই শিবিরেই। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্ত জয়ী হন আক্তারুজ্জামান খোকন।

বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, পৌরসভার প্রায় সাড়ে ২০ হাজার ভোটের মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি ভোটার রয়েছেন বিএনপির। কিন্তু দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে পাকুন্দিয়া বিএনপির শীর্ষ নেতা ইদ্রিছ আলী ভূঁইয়া ও তার অনুসারীদের প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে এর বড় একটি অংশ পেয়ে যান স্বতন্ত্র প্রার্থী। আর আওয়ামী লীগেরও উল্লেখ্যযোগ্য ভোট পান খোকন। এছাড়া আঞ্চলিকতা ইস্যুতেও এগিয়ে যান বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থী। এলাকাবাসী জানান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান খোকন ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ায় চরম বেকায়দায় পড়েন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী। তাকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধরেই নির্বাচনে নামে দুই দল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাকুন্দিয়া পৌরসভায় নানা সমীকরণ করে ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিয়েছেন ভোটারেরা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দলীয় কোন্দল ও বিভাজনের ফল শেষ পর্যন্ত চলে গেছে খোকনের ঘরে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।