চাঞ্চল্যকর তথ্য – স্থানীয় আ’লীগের ‘দ্বন্দ্বে’ হিন্দু মন্দিরে হামলা

`ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘দ্বন্দ্বে’র জেরে একের পর এক হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এরই মধ্যে এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডেও। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে উপজেলা আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে শুক্রবার রাতে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতারা হলেন—উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আবুল হাসেম, হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক আহমেদ ও চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলী। বহিষ্কৃত এ তিন নেতা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে জানা গেছে।

এর আগে প্রথম দফা হামলার পর বৃহস্পতিবার নাসিরনগরের ওসি আবদুল কাদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেনকেও।

৩০ অক্টোবর ইউএনও মোয়াজ্জেম ও ওসি আবদুল কাদেরের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের পরপর হামলার ঘটনা ঘটে। মূলত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

এদিকে বাড়িঘর ও মন্দিরে অতর্কিত হামলায় আতঙ্কিত জীবন-যাপন করছেন এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ও উপজেলা প্রশাসন চাইলে এ হামলা রুখতে পারতেন। কিন্তু তারা হামলা না রুখে হামলাকারীদের নীরব সমর্থন দিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এটিএম মনিরুজ্জামান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও তৌহিদী জনতার পৃথক দু’টি সমাবেশে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এ ছাড়া চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলী লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল করে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন৷

হামলায় আক্রান্ত হওয়া নমশুদ্রপাড়ার বিক্রম দাস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘হামলার আগের দিন রাতে উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশের কথা মাইকিং করা হয়। ঘটনার দিন উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু তাদের উপস্থিত থাকার সময়ও যখন এক দল সমাবেশকারী লাটিসোটা ও বিভিন্ন উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে সমাবেশ স্থলে যাচ্ছিল তখন তাদের উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থামাননি। বরং তিনি এ সময় মঞ্চ থেকে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় হামলা ও ভাঙচুর।’

হামলায় আক্রান্ত হওয়া ঘোষপাড়ার বাসিন্দা সুদীর ঘোষ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘প্রথম হামলাটি হয় বেলা ১২টার দিকে সমাবেশস্থল সংলগ্ন গৌরমন্দিরে। গৌরমন্দির হামলা হওয়ারা পর আমরা উপজেলা চেয়ারম্যান, ওসি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ফোন করে বিষয়টি জানাই কিন্তু তারা আমাদের কোনো ধরনের সাহায্য করেনি। তারা যদি ওই সময় এগিয়ে আসতো তাহলে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটত না। হামলাকারীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও নারীদের নির্যাতন করেছে। হামলার পর আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পারি উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও হরিপুর ইউনিয়ন ও চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কয়েকজন সদস্য এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছেন। তবে তাদের কী পদবি ও নাম তা আমরা জানি না।’
সমাবেশে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এমন অভিযোগ সম্পর্কে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এটিএম মনিরুজ্জামান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সমাবেশে অংশ নিলেও আমি প্রতিবাদকারীদের থামানোর চেষ্টা করেছি৷ উসকানিমূলক কিছু বলিনি৷’

হাতে যথেষ্ট সময় থাকার পরও কেন হামলাকারীদের থামানো যায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল, আর এমন আচমকা হামলা হবে আমরা কেউ ভাবতে পারেনি। তাই কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।’

এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব বলেন, ‘হামলা সম্পর্কে জানার পর আমি উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু হামলা চলাকালীন কারো সঙ্গেই যোগাযোগ করা যায়নি।’
পুলিশের অবহেলা সম্পর্কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশের কোনো অবহেলা আছে কি না তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া ইতোমধ্যে নাসিনগর থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর এ ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্যের অবহেলার অভিযোগে পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে ঘটনার দু’দিন পর মঙ্গলবার রাতে নাসিরনগরের ডাকবাংলোতে স্থানীয় সংখ্যালঘু নেতাদের উদ্দেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেন, ‘মালাউনের বাচ্চারা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। আর এ ঘটনা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে অতিরঞ্জিত করেছে সাংবাদিকরা। অথচ ঘটনা কিছুই নয়।’

নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামে রসরাজ দাস নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার অভিযোগ ওঠে। এরপর স্থানীয় লোকজন তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় রসরাজের বিচার চেয়ে ৩০ অক্টোবর উপজেলা সদরের কলেজ মোড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সমাবেশ চলাকালে সদরের বেশ কয়েকটি মন্দির ও বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এ ছাড়া শুক্রবার ভোরেও চারটি বাড়ির সাতটি ঘর ও একটি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়।

পরিবর্তন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।