জামাত-বিএনপি আমলে সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার শুরু

আজ এই লেখাটা লিখছি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। পৃথিবীতে বসবাসরত প্রায় সব বাঙালিই গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের এই ঘটনার কথা জানেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে তিন থেকে চারশো মানুষ এক সঙ্গে হয়ে, সেখানে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মের মানুষদের ঘরবাড়ি এবং মন্দিরগুলো ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘরবাড়ি থেকে জিনিসপত্র লুট করে নিয়েছে। বর্তমান লেখায় আমি এই ঘটনার একটু সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে এর প্রতিকার নিয়ে আমার চিন্তাগুলো বলব।

নাসিরনগরে আক্রমণকারী সবাই ছিলেন ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সবাই ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী। যারা আক্রমণ করেছে তারা আসলে কোন ইসলাম বহন করে, তা আমরা জানি না।কোন ইসলাম নিরপরাধ মানুষকে আক্রমণ করা, আহত করা, তাদের লুট করার অনুমতি দেয়, আমরা জানি না। এই ধরনের বর্বর আক্রমণ করে,এই অমানুষগুলো ইসলামের কোন গুণকে মহিমান্বিত করেছে, সেটাও আমাদের কারও বোধগম্য নয়।

এ ঘটনা কি আমাদের দেশে এই প্রথম?
খুব বেশি দূরে তাকাতে হবে না, যদি আমরা এর গোঁড়ার দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। ২০০১ সালে যখন জামাত-বিএনপি ক্ষমতায় এলো, বলা যায় ঠিক তখন থেকেই এই সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার শুরু। নির্বাচনে জয়ী হয়ে জামাত-বিএনপির নেতারা পাশবিক উল্লাস শুরু করেন। যার মধ্যে ছিল লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, ডাকাতি, হত্যা এবং ধর্ষণ। সেই সময়ের পূর্ণিমা নামের বাচ্চা মেয়েটার মায়ের আকুতি কি আমরা কখনও আমাদের মন থেকে সরাতে পারবো? (একটু অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলি, আল্লাহ’র রহমতে সেই পূর্ণিমা আজ একজন শিক্ষক। কিন্তু আমাদের ‘শিক্ষিত’ সমাজ আজও তাকে আক্রমণ করে বেড়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে)। সেই সব আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল, দেশের অমুসলিম ভাইবোনেরা। তাদের ঘর-বাড়ি, সহায় -সম্পত্তি এবং মেয়েদের ‘দখল’ করা ছাড়াও এসব পাশবিকতার আরেকটা কারণ ধারণা করা হয় যে, ঐতিহাসিকভাবে তাদেরকে আওয়ামী লীগের ‘ভোট বাক্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেহেতু ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছিল, নিশ্চয়ই তাদের কারণেই হয়েছিল। সুতরাং তাদের শাস্তি তো প্রাপ্যই! সেই শুরু। তারপর ২০০১-২০০৬ সালের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ সব নির্যাতন চালানো হয়েছে,যার কিছুটা আমরা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শ্বেতপত্রে পাই প্রমাণসহ। তারও প্রায় দুই বছর পর ‘তাদের’ ভরসার সরকার আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে এবং গত আট বছর ধরে সরকার পরিচালনা করে আসছে এই দলটি।

আওয়ামী লীগের আমলে কি অমুসলিম ভাই-বোনেরা ভালো আছেন?

আওয়ামী লীগের সময়েই আমরা দেখেছি, বাউল ফকিরদের ওপর আক্রমণ। জোর করে তাদের চুল দাড়ি কেটে দেওয়া ও মারধর করা। রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে নৃশংস বর্বরতা। ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বানচাল করার চেষ্টা এবং একাধিকবার হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের ওপর সরাসরি আক্রমণ। গত বছরের পুজোর সময় দেব-দেবীর মূর্তি ধ্বংস করা প্রায় নিত্যদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কট্টরপন্থী এসব মানুষেরা কিন্তু আমাদের মাঝেই সব সময় ছিলেন এবং আছেন। কিছু মানুষ হয়তো প্রকাশ্যে জামায়াত কিংবা হেফাজত বা এধরনের দলের ছায়াতলে আছেন। কিন্তু এর চেয়েও বেশি মানুষ হয়তো নীরবে সেসব ধর্মীয় উন্মাদনা এবং হিংস্রতা নিজের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাইতো কেউ একজন আহ্বান করলেই দুই তিনশ মানুষ একসঙ্গে দা-লাঠি নিয়ে অন্যদের আক্রমণ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন!

অবাক বিস্ময়ে আমরা দেখলাম, নাসিরনগরের ঘটনার তিন-চার দিন পরে আওয়ামী লীগের তিন জন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো। তারা হলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাশেম, হরিপুর ইউনিয়ন সভাপতি ফারুক আহমেদ এবং চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরুজ আলী। তারা কত ওপরের নেতা জানি না। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক এই ভয়াবহ ঘটনার পর অত্যন্ত নিচুমানের কথাবার্তা বলেছিলেন (পত্রিকার খবর অনুযায়ী), তিনি অবশ্য সরকার বা দল থেকে কোনও ধরনের সমস্যা ছাড়াই চলে ফিরে বেড়াতে লাগলেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তার নোংরা কথার সমালোচনা মুখ্য হয়ে দাঁড়ালো, আহত মানুষগুলো এবং তাদের কষ্টগুলো নয়। একটু পেছনে তাকালেই আমরা মনে করতে পারি, ঠিক এরকম আরেকটি ঘটনার কথা। তৎকালীন মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী হজের অর্থনৈতিক দিক নিয়ে একটি কথা বলে নিজের মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে তার কথার তাৎপর্য যা-ই হোক না কেন, আমরা কি তাহলে ধরে নেব, ওনার কথাটা আমাদের মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ অংশের জন্য খারাপ, তাই তার চাকরি চলে গিয়েছিল এবং জেলে গিয়েছিলেন? কিন্তু ছায়েদুল হক সাহেবের কথাটা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিরুদ্ধে যায়নি, তাই তার জন্য কোনও শাস্তি নাই?

আওয়ামী লীগ দলকে এবং সরকারকে মনে রাখতে হবে, তারা দেশ স্বাধীন করা দল। বঙ্গবন্ধুর দল। আমাদের জাতীয় চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম ছিল দেখে, দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের কাছে স্বাধীনতার দাবি আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। সেই জন্যেই আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রী নই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিনীতভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আপনাকেই শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে মানে। আপনার কাছ থেকেই আমরা ন্যায় বিচার পাওয়ার আস্থা রাখি এবং রাখতে চাই। দলের এবং সরকারের ভাবমূর্তির কথা মাথায় রেখে মন্ত্রী সাহেবের নোংরামির জবাব সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এখনও সময় আছে। তিনি যদি এমন কথা আসলেই বলে থাকেন, তাহলে সবার জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন আপনি। আর না হলে ভবিষ্যতে এমন আরও আমরা শুনতে পাবো।

এই জঘন্য কালিমা থেকে আমরা কী করে বাঁচতে পারি? এ বিষয়ে আমার কিছু ভাবনা আপনাদের জানাচ্ছি।

১. আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কঠোর অবস্থান এসব ব্যাপারে। যেখানেই ধর্মের নামে সহিংসতা দেখা যাবে, সেখানেই তাদের কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ এমন কিছু করার আগে দশ বার ভাবে।

২. দ্রুত বিচার আইনে এই অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে এবং তা হতে হবে কঠোর শাস্তি। আমরা আজ চার বছর পরেও রামুর ঘটনার কি বিচার করতে পেরেছি?

৩. এসব অপরাধীদের গ্রেফতার, বিচার এবং শাস্তির বিষটি জনসম্মুখে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। এখানে আমাদের পত্রিকাগুলো আরও দায়িত্বশীল হতে পারে।

৪. যারা এসবের মূল হোতা, তাদের থেকে অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। তিনি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া মানুষটি-ই হোক, বা কোনও দলের নেতা হোক। এবং অপরাধী গোষ্ঠির নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনা হোক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমরা যেমন ‘সুপিরিয়র রেস্পন্সিবিলিটি’ দেখেছি, এখানে সেটা ব্যাবহার করা যাবে না কেন? আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, যখনই টাকা পয়সা ধরে টান পড়বে, তখনই কট্টরবাদিরা নরম হতে শুরু করবে।

৫. পুরো বাংলাদেশের যেসব স্থানে অন্য ধর্মের মানুষদের বসতি বেশি – যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর , সেসব জায়গাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ-র‍্যাব নিয়োগ করা হোক এবং তারা যেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন, এধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায়। প্রশিক্ষণ ছাড়া যেন আমাদের পুলিশের একজন ভাই বা বোনকেও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া না হয়।

৬. যখনই কোনও ধরনের ধর্মীয় দলকে প্রকাশ্যে মিছিল মিটিং করার অনুমতি দেওয়া হবে, তখন যেন বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

৭. দেশের প্রতিটি মসজিদে যেন সুস্থ এবং শান্তিতে সবাই মিলে মিশে থাকার ব্যাপারে খুতবা দেওয়া হয়। আমাদের ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু সব সময়ই বলা এবং করা হয়েছে। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। কারও চেয়ে কারও কোনও বিষয়েই অধিকার কম হওয়ার কথা নয়। মনে রাখতে হবে এবং সবাইকে শেখাতে হবে যে, আমাদের বৈচিত্র্য এবং অসাম্প্রদায়িকতাই আমাদের আসল সৌন্দর্য।

৮. এক সময়ের আরবি শব্দ ‘মালাউন’ (বাংলায় ‘অভিশপ্ত’) বহুল অপব্যাবহারে এখন একটি অশালীন এবং অসভ্য শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা সাড়ে সাত কোটি ‘অভিশপ্ত’ কেই মারতে এসেছিল। আমরা সেই অভিশপ্তদেরই বংশধর (ইসলামের ইতিহাসে আর গেলাম না)। আমাদের এগুলো মনে রাখা প্রয়োজন। ভাষাগত ভাবেও যেন আমরা একজন আরেকজনের জন্য এগিয়ে আসি।

৯. পাশ্চাত্যে যেমন দাসপ্রথার যুগের কিছু শব্দ বর্তমানে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এবং নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো বিবেচিত হয় (দ্য এন ওয়ার্ড), ঠিক তেমনি আমাদের জন্যও এই আরবি শব্দ (সব রূপে) নিষিদ্ধ করা হোক, সরকারিভাবে এবং অবশ্যই সামাজিকভাবে (আমাদের এম ওয়ার্ড)। সকল সরকারি চাকরিজীবীরা যেন মনে রাখেন যে, এই একটি শব্দও উচ্চারণ করলে তাদের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজতে পারে।

১০. আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই বিষয়ে সরব হওয়া। আমি রাজনীতি করি না। বুঝিও না। এসবে কিছু হবে না। আমি একা আর কি-ই বা করবো- এই ধরনের চিন্তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবেই, যদি আমরা আমাদের বাংলাদেশকে ভালোবাসি। সাম্প্রদায়িক নির্যাতন এবং কট্টরতা যতদিন আমরা সমূলে উৎপাটন করতে না পারব , ততদিন আমাদের পেছনে পড়ে থাকা কেউ আটকাতে পারবে না – যতই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হোকনা কেন।

আমি লেখাটি শেষ করছি আমার সকল ভাই-বোনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, যারা অন্য ধর্ম পালন করেন, ইসলাম ছাড়া তাদের কাছে। আক্ষরিক অর্থে না হলেও আমরা সবাই কম বেশি কোনও না কোনোভাবে অভিশপ্ত। আমার মনে হয়,সব চেয়ে বড় অভিশাপ আমরা আপনাদের নিজ দেশে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের মাফ করুন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও গবেষক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চ

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।