আওয়ামীলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর মামলা গুরুত্বের সঙ্গে নেইনি ! – ট্রাইব্যুনাল

তারা ছিলেন বাল্যবন্ধু। ছেলেবেলায় বেড়ে ওঠা, রাজনীতিতে আসা, এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগী ছিলেন পরস্পরের। তফাৎটা কেবল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে। একজন প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, অন্যজনের ব্যাপারটা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। কিন্তু, সেই ইস্যুটিই ৪৫ বছর পর কাঁপিয়ে দিয়েছে নেত্রকোনাসহ সারাদেশ। এই দুই বন্ধুর একজন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক (বহিষ্কৃত) সভাপতি মো. শামছুজ্জোহা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন অপর বন্ধু জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মতিয়র রহমান খানের বিরুদ্ধে! বিষয়টা এতই চমক জাগানিয়া যে মুক্তিযুদ্ধের বার্তাবাহী একটা দলের জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি আলোচিত হচ্ছে এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে রাজধানীসহ বিদেশি গণমাধ্যমেও। এমনকি এ ঘটনায় ধন্দে পড়ে গেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাও। শামসুজ্জোহার মামলার আবেদন জমা পড়ার এক সপ্তাহ পরেও এ বিষয়ে তদন্তের ব্যাপারে বড় কোনও সিদ্ধান্তে আসেননি সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

উল্টো, এ অভিযোগের তদন্তের আগেই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের পরের ৪৫ বছর একত্রে রাজনীতি করে কী এমন হলো যে সরাসরি বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর মামলার আবেদন করে বসবেন সাবেক সভাপতি?

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এ অভিযোগকে এখনও গুরুত্বের সঙ্গে নেননি তারা। প্রাথমিক তদন্তের জন্যেও কোনও তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়নি।তবে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার যে অভিযোগটি উঠেছে মতিয়র রহমান খানের বিরুদ্ধে, এই মতিয়রই নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান খান কিনা তদন্ত হলে প্রথমে সেটাই যাচাই করবে তদন্ত সংস্থা।

প্রসঙ্গত গত ২৭ নভেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মতিয়র রহমান খানের বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় আবেদন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. শামছুজ্জোহা। আবেদনের সঙ্গে তিনি একাত্তরে শান্তি কমিটির একটি সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের অনুলিপি দেন, যেখানে সভায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি নাম মতিয়র রহমান খান।

এ বিষয়ে তদন্ত সংস্থা সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা মনে করেন, অভিযোগকারী এক সময়ের জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছেন এমনটাও আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি। তাছাড়া, নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, দেশের নানা জায়গা থেকেই দলীয় কোন্দলের কারণে প্রচুর অভিযোগ আসে আমাদের কাছে। তাই এটি সঠিক অভিযোগ কিনা সেটা বিবেচনায় নিতে হলে অভিযোগকারী শান্তিকমিটির মিটিংয়ের যে ডক্যুমেন্ট জমা দিয়েছেন, সেখানে উপস্থিতির তালিকায় থাকা মতিয়র রহমান খানের নামটি বর্তমান সভাপতি মতিয়রের কিনা সেটাই ধন্দের বিষয়। এটি আগে যাচাই করে দেখতে হবে।

এদিকে ঘটনার পর গত শনিবার (৩ ডিসেম্বর) সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেন বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মতিয়র রহমান খান। তিনি বলেন, শামছুজ্জোহা নেত্রীর (আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা) বিরুদ্ধে কটু কথা বলায় তার অবস্থান হারিয়েছেন, তাতে আমাকে শত্রু বানানোর কী হলো।

আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে এবিষয়ে আপনি কিছু জানেন কিনা বা কিভাবে জেনেছেন প্রশ্নে সভাপতি মতিয়র রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন ‘এধরনের কোনও অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে কখনোই ছিল না। তবে যুদ্ধে রওনা দিয়ে আমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল, কারণ ততক্ষণে পরিবারের সবার ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছিল।আমি তখন বাধ্য হয়েই ফিরে আসি।’

ফিরে আসার পর পাকিস্তানি বাহিনীকে আপনি সহযোগিতা করেছেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এরপর আমি পাকিস্তানি সেনাসহ স্থানীয় রাজাকারদেরও নজরদারিতে ছিলাম। কিন্তু আমি কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হইনি।’

এসময় শামসুজ্জোহা সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করার পর বহিষ্কার হয়ে দলে নানা কোন্দল সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন শামসুজ্জোহা।’

৭১ সালে শান্তি কমিটির সেই আলোচিত রেজ্যুলেশন

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগকারী শামসুজ্জোহা টেলিফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপনি আদালতও না, আপনি সাংবাদিক কিনা সে প্রমাণও নাই। আপনাকে আমি কিছু বলবো না। পরবর্তীতে তিনি কেন তার নিজের দলের নেতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিলেন এবং এতদিন একসঙ্গে রাজনীতি করে এসব বলেননি কেন প্রশ্নে তিনি টেলিফোন সংযোগ কেটে দেন। পরে আবারও সেই নম্বরে কল করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি শামসুজ্জোহা না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান গত বৃহস্পতিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি এখনই অভিযোগ পাওয়া মতিয়র রহমান খানকে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বলতে রাজি নই। তবে এই নামে একটি অভিযোগ নথিভুক্ত করেছি। এ মুহূর্তে চাইলেই আমি বলতে পারি না ‘তিনি যুদ্ধাপরাধী।’

সংস্থার এক তদন্তকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিযোগকারী পিস (শান্তি) কমিটির সভার যে কাগজ জমা দিয়েছেন সেটি আদৌ ঠিক কাগজ কিনা সেটাও বিচার বিবেচনার দরকার আছে। এমনকি সেই নামগুলো ইলেক্ট্রনিক টাইপরাইটার দিয়ে পাল্টে ফেলা যায় কিনা এসব পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে আমরা মাঠের তদন্তে নামবো না।’

banglatribune

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।