রোহিঙ্গা হত্যার প্রতিবাদে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে মালয়েশিয়া !

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম রোহিঙ্গাদের হত্যার ঘটনায় মালয়েশিয়া ক্ষুব্ধ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি ও হত্যার প্রতিবাদে কুয়ালালাম পুরে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। মালয়েশিয়া অনুর্ধ্ব-২২ ফুটবল দল মিয়ানমারের সঙ্গে দুটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছে। কুয়ালালাম পুরে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেছে দেশটি। দাবি উঠেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার। মিয়ানমারও নিজেদের অবস্থানে অটল এবং মালয়েশিয়ার এসব পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো বর্বরোচিত অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ জানিয়েছে, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম। চলমান সহিংসতায় শুধু বাংলাদেশেই আশ্রয় নিয়েছেন কমপক্ষে ১০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। এদিকে দেশটিতে অব্যাহত রোহিঙ্গা নির্যাতন ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’র শামিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জাতিগত নিধন’ চালাচ্ছে বলেও জানিয়েছে জাতিসংঘ।

রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিপন্নতায় যে দেশগুলো সবচেয়ে সোচ্চার হয়েছে মালয়েশিয়া তাদের অন্যতম। মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন মালয়েশিয়া নামের এক সোসাইটি গঠন করেছে মালয়েশিয়া সরকার। আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের ঘটনায় মিয়ানমার সরকারের কাছে মালয়েশিয়া উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

রবিবার মিয়ানমারের নিপীড়িত মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালাম পুরে সমাবেশ করেছেন কয়েক হাজর মানুষ। বিপন্ন মানবতার পক্ষে মানুষের এই মিছিলে সামিল হয়েছেন রাজনীতিকরাও। নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক।

সমাবেশে নাজিব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই তাদের (রোহিঙ্গা) রক্ষা করতে হবে। কেবল এজন্য নয় যে, তারা একই ধর্মে বিশ্বাসী। বরং এজন্য যে, তারা মানুষ। তাদের জীবনেরও মূল্য রয়েছে।’ তবে ধর্মীঁয় প্রশ্নেও রোহিঙ্গাদের প্রতি দায়দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন নাজিব। সমাবেশে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোকেও সোচার হওয়ার আহ্বান জানাবেন। নাজিব বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু হলো ইসলামের অপমান। আমাদের ধৈর্য্যকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।’

নাজিব তার বক্তব্যে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া মিয়ানমারের নেতা অং সান সু চিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

সমাবেশে মালয়েশিয়ার বিরোধী দল পিএএস নেতা হাদিসহ অনেক নেতা-কর্মীরাও অংশ নিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং রোহিঙ্গা নিপীড়নের সমালোচনা করেছেন।

মিছিলের আগের দিন শনিবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে মিয়ানমারের হুঁশিয়ারির কড়া জবাব দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হত্যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেখানকার মুসলিম রোহিঙ্গা জাতিকে নির্মূলের চেষ্টা। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য মিয়ানমারের এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত বলেও জানায় মালয়েশিয়া।

মুসলিম রোহিঙ্গাদের হত্যার বিষয় নিয়ে মিয়ানমারের নেতা সু চির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন নাজিব রাজাক। কিন্তু নাজিবের আহ্বানে সু চি সাড়া দেননি।

এর আগে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগে মিয়ানমারের আসিয়ান সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড মালায়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের বার্ষিক সভায় যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খাইরি জামালউদ্দিন বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানে মিয়ানমারের সদস্যপদ অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘আসিয়ানে মিয়ানমারের সদস্যপদ পুনর্বিবেচনা করার জন্য, এই জোটের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি।’ জামালউদ্দিন দাবি করেন, ‘আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে। কিন্তু সেই নীতি বাতিল হয়ে যায়, যখন কোনও সদস্যরাষ্ট্র ব্যাপক মাত্রায় জাতিগত নির্মূলীকরণে জড়িত হয়।’

মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছে মালয়েশিয়ার সরকারি ও বিরোধী দলের যুব সংগঠন। আমানাহ সংগঠনের প্রধান সানি হামজান বলেন, আমরা মালয়েশিয়া সরকারের আবেদন জানাচ্ছি মিয়ানমারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে মালয়েশিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য।

মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকেও ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি। এছাড়া এ বিষয়ে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন, ওআইসির হস্তক্ষেপ ও সংকটপূর্ণ এলাকায় শান্তিরক্ষী পাঠানোর দাবি জানান জানান।

গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুটবল মিয়ানমারের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-২২ দলের দুটি প্রীতিম্যাচ বাতিল করেছে। ম্যাচ দুটি ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। দেশটির জাতীয় ফুটবল দলের মুখপাত্র জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে এটা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

তার আগে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দেশটি। এছাড়া গত মাসে মালয়েশিয়া জানিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের গণহত্যার পর মিয়ানমারে অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক ফুটবল টুর্নামেন্ট বর্জনের কথা ভাবছে দেশটি। পরে মন্ত্রিরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় তা বর্জন করা হয়নি। আঞ্চলিক ফুটবল টুর্নামেন্টটির সহ-আয়োজক ছিল মিয়ানমার। রবিবারের বিক্ষোভের আগে গত মাসেও মিয়ানমারের দূতাবাস অভিমূখে বিক্ষোভ করেন মালয়েশীয় ও রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গাদের হত্যার বিষয়ে মালয়েশিয়ার এসব উদ্যোগে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল উ ঝাও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। তিনি মালয়েশিয়াকে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আসিয়ান চুক্তির নীতি মেনে চলার আহ্বান জানান।

উ ঝাও জানান, মালয়েশিয়ার এসব পদক্ষেপের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কোনও সম্পর্ক নেই। দেশে জনপ্রিয়তা বাড়াতেই এসব উদ্যোগ নিচ্ছেন মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী। মিয়ানমারে নিযুক্ত মালয়েশীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে বলেও জানান তিনি।

মালয়েশিয়ার সংহতি মিছিলের প্রতিবাদে মিয়ানমারে বৌদ্ধরা বিক্ষোভ করেছেন। রবিবার ইয়াঙ্গুনে এ বিক্ষোভে কয়েকশ বৌদ্ধ ভিক্ষু অংশগ্রহণ করেন। তারা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলা হয়, ভুয়া জাতিগত বিষয় তুলে দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট না করার জন্য।

মিয়ানমারে সঙ্গে মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হলেও সম্পর্ক ছিন্ন করা কোনও বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ হবে না বলে মনে করেন ওআইসি নিযুক্ত মিয়ানমারের বিশেষ প্রতিনিধি তান শ্রি সৈয়দ হামিদ সৈয়দ আলবার। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে সংকটের সমাধান হিসেবে আমি দেখি না। কূটনীতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আলোচনার সুযোগ রাখা উচিত বলেই আমরা মনে করি।’ সংকট সমাধানে ওআইসি ও আসিয়ান-এর হস্তক্ষেপ করা উচিত বলেও জানান তিনি।

সম্পর্ক ছিন্ন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন খোদ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। রবিবারের সমাবেশে তিনি বলেছেন, এটা কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয় যে, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব।

তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের অনড় অবস্থানের কারণে সংকট আরও গভীর হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চাপ সত্ত্বেও এ অবস্থান থেকে দেশটির সরে আসার কোনও লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে দেশটির উপ-তথ্যমন্ত্রী ইয়ে হাতুত বলেছেন, তারা মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা জাতীয় সমস্যা। এটা কোনও আঞ্চলিক সমস্যা নয় যে প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক বিশ্বকে উদ্বেগ জানাতে হবে।

শুধু মালয়েশিয়া নয়, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়াও রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও আসিয়ানের সদস্য। ফলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি ওঠছে বিষয়টিতে আসিয়ানের হস্তক্ষেপের। তবে মিয়ানমার জানিয়েছে, আসিয়ানের কোনও আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যু স্থান পাবে না।

তবে আসিয়ানে ইন্টার-পার্লামেন্টারি মিয়ানমার ককাসের প্রেসিডেন্ট ইভা কুসুমা সুন্দরি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু মিয়ানমারের নয় আসিয়ান অঞ্চলেরও সমস্যা। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষের মানবাধিকার সব রাষ্ট্রেরই বিষয়। রোহিঙ্গা সংকট এ অঞ্চলের অপর দেশগুলোকে প্রভাবিত করছে।’ তিনি মনে করেন, এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ জারি রাখা উচিত। সূত্র: দ্য ব্যাংকক পোস্ট, স্ট্রেইট টাইমস, রয়টার্স, মালয়েশিয়াকিনি, বার্নামা টুডে।

১ টি মন্তব্য:

  • ডিসেম্বর 6, 2016 at 6:00 অপরাহ্ন
    Permalink

    welcome

    Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।