৫০ কোটি ডলার ভারতীয় ঋণে, ভারতীয় অস্ত্র কিনতে হবে বাংলাদেশকে !

ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর * ৩০টি চুক্তির সম্ভাবনা * অনিশ্চিত তিস্তা চুক্তি
ভারত থেকে সমরাস্ত্র ক্রয় করতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছে দিল্লি। এটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাই সম্মত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরেই এ সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতেই এ সফর হতে পারে বলে জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র। ফেব্রুয়ারিতে সফরটির আয়োজন করার ব্যাপারে দিল্লির পক্ষ থেকে আগ্রহের কথা জানানোর পর ঢাকায় মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৩০টি চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই স্মারকের অধীনে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ, সফর বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া, সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরকালেও তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারতের পক্ষ থেকে একটি কারিগরি দল শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করে গঙ্গা ব্যারাজের ব্যাপারে তাদের পর্যবেক্ষণ জানাবে। এছাড়া বাণিজ্য, অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কানেকটিভিটিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি সই করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৮ ডিসেম্বর ভারত সফরে যাবেন বলে প্রাথমিকভাবে তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. নরেন্দ্র মোদির কর্মসূচি মেলাতে সমস্যা হওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফরটি স্থগিত করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পার্লামেন্টে বাজেট অধিবেশন চলবে। ফলে এই সময়ে মোদির ব্যস্ততা থাকতে পারে বলে ঢাকার কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতেই ভারত শেখ হাসিনার সফর আয়োজন করতে চায়। সেই মোতাবেক মোদি সময় দিতে পারবেন বলে জানানো হয়। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সফরের প্রস্তুতি শুরু হয়।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ১৭০০ সৈন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। তাদের মরণোত্তর সম্মাননা জানানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সফরকালে তেমন ৬-৭টি নিহত সৈন্যের পরিবারকে আনুষ্ঠানিক সম্মাননা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর থেকে সেই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে সব পরিবারকেই সম্মাননা জানানো হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে যেসব চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আছে ‘ট্রেডিং কর্পোরেশন বাংলাদেশ’ (টিসিবি) এবং ভারতের ‘স্টেট ট্রেডিং কর্পোরেশন’র (এসটিসি)র মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি, সীমান্ত হাট নিয়ে আরও নতুন চুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক, ভারত থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি, দুই দেশের কোস্টগার্ডের মধ্যে সহযোগিতার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি), উপকূলীয় ও নৌ প্রটোকল রুটে যাত্রী ও ক্রুস জাহাজ চলাচল চুক্তি, দুই দেশের আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চুক্তি, বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্ট ও ভারতের জুডিশিয়াল ট্রেনিং একাডেমির মধ্যে চুক্তি প্রভৃতি। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ভারত ব্যবহার করতে পারবে মর্মে চুক্তি আগেই হয়েছে। এখন এই দুটি সমুদ্রবন্দর কীভাবে ব্যবহার করা যায় তার বিষয়ে একটি এসওপি সই করার প্রস্তাব ভারত করেছে। তবে বাংলাদেশ মনে করে, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। এসব নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। আলোচনায় উভয়পক্ষ একমত হলে এ বিষয়েও চুক্তি সই হতে পারে। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ভারতের ঋণের ব্যাপারে বেশ কিছু চুক্তি সই করার কাজ করছে। ভারত দুই দফায় বাংলাদেশকে দু’শ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছে। এখন এসব ঋণের প্রকল্প কোনোটা বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। কোনো কোনো প্রকল্প চলছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন।

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করার পর দুই দেশের মধ্যে ২৭টি চুক্তি সই হয়। সম্প্রতি চীন থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। তারপর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকর বাংলাদেশ সফর করে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এবং ভারত থেকে সমরাস্ত্র ক্রয়ে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছে ভারত। এ দুটি প্রস্তাব এখন বাংলাদেশ পর্যালোচনা করে দেখছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি সফর করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক দূর করে সুসম্পর্কের সূচনা করেন। ওই সময়ে ৫০ দফার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। তারপর ২০১১ সালে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করে আরও চুক্তি সই করেন। ওই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত হয়েও তা সই হয়নি। মমতা ব্যানার্জি এখন তিস্তার ব্যাপারে তার আপত্তি দিয়ে রেখেছেন। ২০১৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করলে দুই দেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি সই হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের পর আর দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাননি। তবে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিও স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানাতে দিল্লি গিয়েছিলেন। এছাড়া ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে গোয়ায় সফর করেছিলেন।

যুগান্তর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।