পুলিশের ক্রসফায়ার নাটকের নতুন সংস্করন – জঙ্গি উদ্ধার !

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাদ্দাম হোসেন ওরফে রাহুল ওরফে চঞ্চল ওরফে সবুজ ওরফে রবিকে (২১) গত এপ্রিলে শ্বশুরবাড়ি থেকে পুলিশ পরিচয়ে কয়েজন লোক তুলে নিয়ে যায় বলে দাবি করেছেন তাঁর স্বজনেরা। সাদ্দামের বিরুদ্ধে রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার পরিকল্পনা করার অভিযোগ রয়েছে।
আজ শুক্রবার সকালে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বেড়িবাঁধ এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নব্য জেএমবির নেতা ও ঢাকার গুলশান হামলার ‘অপারেশন কমান্ডার’ নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান নিহত হন। এ সময় তাঁর সহযোগী সাদ্দামও নিহত হন।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ (দোতলা মসজিদের পাশে) এলাকার তাজুল আলম মিয়া (আলম জোলা) ও সুফিয়া বেগমের ছেলে সাদ্দাম হোসেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম সাদ্দাম। তিনি বিবাহিত, তাঁর একটি শিশুসন্তানও রয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে সাদ্দামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পুরো বাড়িতে সুনসান নীরবতা। সাদ্দামের বাবা তাজুল আলম মিয়া খেতে কাজ করছিলেন। আর বড় ভাই মিজানুর রহমান ঘরের বেড়া মেরামতে ব্যস্ত। তাঁদের কাছে সাদ্দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা জানান, সাদ্দামের নামে ২টি মামলা রয়েছে। একটি জাপানি নাগরিক হত্যা, অন্যটি কাউনিয়ায় মাজারের খাদেম হত্যা। যার ওয়ারেন্ট এসেছে তাঁদের বাড়িতে।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘শুনেছি ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জের শ্বশুর বাড়ি থেকে পুলিশ পরিচয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর তাঁর সন্ধান পাইনি। রাজারহাট থানায় গিয়েছিলাম সাদ্দামের খোঁজে। পুলিশ বলেছে তারা জানে না। সাদ্দামের বাবা বলেন, ‘তখন জিডি করতে চাইছিলাম। কিন্তু পুলিশ জিডিও নেয়নি।’ বন্দুকযুদ্ধে সাদ্দাম নিহত হওয়ার খবর দিলে তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। পরে ছবি দেখালে তারা চিনতে পারেন। এ সময় তাঁর মা সুফিয়া বেগম আহাজারি শুরু করেন। এ সময় প্রতিবেশীরাও ছুটে আসেন।

তবে একটি সূত্র জানায়, সকালেই তাঁর পরিবার মৃত্যুর সংবাদ পায়। এরপর তাজুল আলম মিয়া ছেলের লাশ নেওয়া যাবে কি না বা নিতে গেলে কোনো ঝামেলা হবে কি না তা জানার জন্য রাজারহাট উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যোগাযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, তারা লাশ নিতে চান। সাদ্দামের বাবা বলেন, ‘ছেলেকে যদি পুলিশ ধরেই নিয়া যায়, তাহলে বন্দুকযুদ্ধে মরে কেমনে।’ তিনি জানান, সাদ্দাম পরিবারের অমতে প্রেম করে বিয়ে করার পর থেকে বাড়িতে থাকেনি। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে কোনো জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত ছিলেন কি না তা তাঁদের জানা নেই।

সাধারণ এক কৃষক পরিবারের সন্তান সাদ্দামের জঙ্গি হয়ে ওঠার বিষয়ে গ্রামবাসীরাও কিছু জানে না। প্রতিবেশী আনছার আলী ও কছিরন জানান, সাদাসিধে ও ভদ্র ছেলে ছিল সাদ্দাম। সে কী করে জঙ্গি হলো বুঝতে পারছেন না তাঁরা। স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা সাদ্দামের কোনো খবর পাচ্ছি না। সাংবাদিকেরা খালি ফোন করতেছে।’

সাদ্দামের পরিবারের সদস্যরা জানান, সাদ্দাম রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চর তাম্বুলপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও পাওটানা ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করার পর লালমনিরহাট সরকারি কলেজে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেম করে বিয়ে করেন ফারজানা নামের এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে। ধরে নিয়ে যাওয়ার তিন মাস পর তাঁর স্ত্রী একটি ছেলেসন্তান জন্ম দেন। তবে বর্তমানে সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তান কোথায় আছে তা তাঁরা জানেন না।

কুড়িগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) সনাতন চক্রবর্তী জানান, কুড়িগ্রামের গাড়িয়াল পাড়ার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী হত্যা মামলার ২ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি সাদ্দাম। এই মামলায় মোট ১০ জন চার্জশিটভুক্ত আসামির মধ্যে আটক আছে চারজন। পলাতক তিন জনের মধ্যে একজন সাদ্দাম। বাকি তিনজন আগেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে, সাদ্দাম জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে জেএমবির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। জাপানি নাগরিক কুনিওকে হত্যা করার টার্গেট ও পরিকল্পনা করেন সাদ্দাম। এ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করেন তিনি।

সাদ্দাম সম্পর্কে কুনিও হত্যার অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য হাইকমান্ডের নির্দেশমতো জাপানি নাগরিক কুনিওকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাদ্দাম। সাদ্দামসহ তাঁর সহযোগীরা কুনিওকে হত্যার ১০ দিন আগে থেকে তাঁর চলাচল ও গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। কুনিও হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সাদ্দামসহ তাঁর সহযোগীরা রংপুর শহরের ছোট নুরপুর এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা কিনে শহর ও আশপাশের রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে তাঁরা রাস্তা চিনে নিয়েছিলেন।

সাদ্দাম সাম্প্রতিক সময়ে জাপানি নাগরিক কুনিও হত্যাসহ রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় দরবারের খাদেম রহমত আলী হত্যা, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সহকারী বাহাই সম্প্রদায়ের রুহুল আমিন হত্যাচেষ্টা মামলারও আসামি।

এর আগে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের গজপুরি এলাকার নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক হাসান (২৮) রাজশাহীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাদ্দামের শ্বশুরবাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচরণ গ্রামে। তাঁর শ্বশুর ফুল মিয়া একজন কৃষক। শাশুড়ি দুলালি বেগম গৃহিণী। শুক্রবার সন্ধ্যায় গোপালচরণ গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে কোনো লোক নেই। সাদ্দামের শ্বশুরের টিনশেড ঘর তালাবদ্ধ। এলাকাবাসী জানায়, তিন বছর আগে ফুল মিয়ার মেয়ে ফারজানা খাতুনের সঙ্গে সাদ্দামের বিয়ে হয়। গত বছরের ১৪ এপ্রিল সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক সাদ্দামকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাঁকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। সাদ্দামকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্ত্রী উধাও হয়। তাঁরা কোথায় আছে তা এলাকার কেউ জানে না। গোপালচরণ গ্রামের ইউপি সদস্য দুলা মিয়া জানান, টিভিতে খবর দেখে সাদ্দামের নিহত হওয়ার খবর এলাকাবাসী জানতে পারে।

prothom alo

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।