আগামী জাতীয় নির্বাচন ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম​) এর মাধ্যমে ! ডিজিটার কারচুপির আশংকা

তুমুল বিতর্কিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে হঠাৎ দেশে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বক্তৃতাকালে আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মতপ্রকাশের পর এ নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। ইতোমধ্যে ইভিএম প্রসঙ্গ অবতারণার উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি প্রশ্ন তুলেছে। এ প্রশ্ন তুলেছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলও। বিতর্কের ঝড় উঠেছে টিভি টকশো এবং সোস্যাল মিডিয়ায়ও।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডে ভোট গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইভিএম পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশনের টিচার্স ট্রেনিং কলেজকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় তা বন্ধ হয়ে যায়। তার পরে এটি আর সারানো সম্ভব হয়নি। ফলে ওই কেন্দ্রে আবার ভোট গ্রহণ করতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইভিএম চালুতে এসব সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বুয়েটকে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও তারা সমস্যা চিহ্নিত করেনি; বরং উল্টো ইসি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তোলে। পরে ইসি বুয়েটকে ইভিএম ফেরত দিতে বলে। এখন পর্যন্ত তারা ইভিএম ফেরত দেয়নি। ইভিএম নিয়ে কাজ তখন থেমে ছিল। দীর্ঘ দিন পর আবার আলোচনায় এলো ইভিএম।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উক্তির পর গতকাল বৃহস্পতিবার ই-ভোটিং প্রধানমন্ত্রীর ভোটারবিহীন নির্বাচন করার আরেকটি ডিজিটাল প্রতারণা কি না তা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

ইভিএম নিয়ে সদ্যবিদায়ী ইসিতে মতবিরোধ তীব্র ছিল। বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক সিইসির কাছে এক ইউও (আন-অফিসিয়াল) নোটে লিখেছিলেন, কমিশনে যে ইভিএম রয়েছে তাতে ভোট সংখ্যার কাগজ রেকর্ডের ব্যবস্থা নেই; ভোটারের পরিচিতি শনাক্তকরণেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে এ যন্ত্র দিয়ে ভোটে কারচুপি রোধ করা সম্ভব নয়। অন্য নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী আলাদা এক নোটে বলেন, বর্তমানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি, যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে হাতে গণনা করে এ বিরাটসংখ্যক ভোট সময় মতো সম্পন্ন করা দুরূহ হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রশিণের জন্য ভারতের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

এর পর বিদায়ী কমিশন শেষ দিকে এসে হঠাৎ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করে, তবে তা ছিল নীরবে। যান্ত্রিক ত্রুটিহীন অধিকতর নিরাপদ ইভিএম তৈরি করতে উচ্চপর্যায়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। ইসির অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমানকে প্রধান করে বুয়েট, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও কম্পিউটার সমিতির সদস্যরা এ কমিটিতে রয়েছেন।

বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) পক্ষ থেকে নতুন ইভিএমের একটি মডেল উপস্থাপন করা হয় ওই কমিটির প্রথম বৈঠকে। টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান ও ইসির অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান বলেন, নতুন ইভিএমের মডেল কেমন হবে তা চূড়ান্ত হয়নি। বিশিষ্ট আইসিটি বিশেষজ্ঞদের মতামত আমরা গ্রহণ করছি। আমরা চাই নতুন ইভিএম হবে অধিকতর ব্যবহারবান্ধব, কারিগরি ত্রুটিমুক্ত ও নিরাপদ। কেউ এসব ইভিএম তুলে নিয়ে গেলেও যেন নির্বাচনের ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আনতে না পারে। তবে সদ্যবিদায়ী রকীব কমিশন নতুন মডেলের ইভিএম অনুমোদন দেয়নি। নতুন নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন পেলেই এই ইভিএম আলোর মুখ দেখবে।

নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের সাথে সংলাপে আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তাব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যান্ত্রিক সমস্যার কথা বলে শুরু থেকেই ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছিল কাজী রকীবউদ্দিন আহমদের কমিশন।

উল্লেখ্য, ড. এ টি এম শামসুল হুদার কমিশন চট্টগ্রাম সিটির একটি ওয়ার্ড দিয়ে ইভিএমের যাত্রা শুরু করে। এরপর তারা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার করে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ের আগে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিও রেখে যায় পরবর্তী কমিশনের জন্য। এ ল্েয ইভিএমের প্রটোটাইপ তৈরির নির্দেশনাও দিয়ে যায়। সে ধারাবাহিকতা ধরে না রেখে কাজী রকীবউদ্দিন কমিশন ইভিএম থেকে ক্রমেই দূরে সরে যায়। বর্তমানে ইসির হাতে এক হাজার ২০০টির বেশি ইভিএম আছে। বুয়েটের সহায়তায় প্রথমে ১৩০টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ৪০০টি এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সহযোগিতায় আরো ৭০০ ইভিএম ক্রয় করে ইসি। এসব ইভিএম তৈরিতে কমিশনের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিগত নির্বাচনগুলোতে আমরা ইভিএম ব্যবহার করতে পারিনি। ইভিএমকে আরো স্মার্ট ও নিরাপদ করতে একটি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে নতুন মডেলের ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

নয়া দিগন্ত

Leave a Reply