একদিন জিয়ার মরণোত্তর বিচার হবে: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের জন‌্য বাংলাদেশে ‘একদিন’ জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার হবে বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

সোমবার ‘মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক হত্যা দিবস’ পালনের অংশ হিসেবে এক আলোচনাসভায় তিনি এ কথা বলেন। বর্তমান সরকারের শরিক জাসদের পঁচাত্তরের ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি।

একাত্তরে গাজীপুরে প্রতিরোধ যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোজাম্মেল বলেন, “এই জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনী। সে বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে পরিপূর্ণভাবে জড়িত। অনেক তথ্যাদি আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা, ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার ইনশাল্লাহ বাংলাদেশের মাটিতে হবে।”

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট একদল সেনা সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারের নিহত হওয়ার পর সেনাপ্রধানের দায়িত্বে আসেন জিয়াউর রহমান। এরপর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে এক অভ্যুত্থান হলে জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে আটকাবস্থা থেকে মুক্ত হন জিয়া। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।

এই দিনকে বিএনপি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’, আওয়ামী লীগ ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ ও জাসদ ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করে।

মোজাম্মেল বলেন, “তৎকালে (১৯৭৫ এর নভেম্বর) সেনাবাহিনীতে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা যে লিফলেট ছাড়ল, যে বিভ্রান্তিকর কাজগুলো হয়েছিল, সেই সময় জাসদের যে ভূমিকা ছিল, সেই ভূমিকার কারণেই এ অবস্থা হয়েছিল। যেহেতু তারা পরে এ কথা স্বীকার করেছে যে তাদের সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। একটা দল যখন স্বীকার করে, তখন অন্যদের বলার কিছু থাকে না।”

জাসদের সেই ‘ভুল সিদ্ধান্তের কারণে’ জিয়াউর রহমান ‘সুযোগ পেয়েছিলেন’ বলেও মন্তব‌্য করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “একটা ছোট্ট ভুলও অনেক সময় দেশের জন্য ক্ষতিকর। সেনাবাহিনীতে যে সব নিয়ম কানুন, তাতে ক্ষমা করতে নেই। জিয়াউর রহমানকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন হত্যা করাই ছিলো স্বাভাবিক নিয়ম। আমি জানি না, কোন স্ট্রাটেজিতে তারা তা করে নাই। তাকে গৃহবন্দি রেখে পরবর্তী পাল্টা ক্যু’র সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। এগুলো হয় না।

“জিয়া কিন্তু পাল্টা ক্যু করে প্রতিশোধ নিতে এক মুহূর্ত দেরি করেন নাই, যেটা খালেদ মোশাররফরা প্রতিবিপ্লবীদের ছাড় দিয়েছিলেন।”

এই ‘কৌশলগত ভুলের’ জন্য খালেদ মোশাররফের সমালোচনা করলেও তিনি ‘শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমিক’ ছিলেন বলে মত দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “খালেদ মোশাররফ জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, তিনি দেশকে ভালোবাসেন।”

মোজাম্মেল বলেন, “জিয়া কীভাবে বাই চান্স মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন… উনার জীবদ্দশায় মেজর রফিক (মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম) যে বই লিখেছেন, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, সেখানে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে, তাকে কিন্তু জোর করে এনে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জিয়ার জীবদ্দশাতেই ওই বই লেখা হয়েছিল… তিনি প্রতিবাদ করেন নাই।”

মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ফেডারেশন করে’ স্বাধীনতার পথ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে ‘জিয়াও জড়িত ছিলেন’ বলে অভিযোগ করেন মোজাম্মেল।

“ফেডারেশন করে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের অবসান করা যায়- জিয়া, মোশতাকরা এতে জড়িত ছিল। খালেদ মোশাররফ সেটা চাননি। তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। বাংলাদেশ ওদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না। এটা নিশ্চয়ই ইতিহাস প্রমাণ করবে। তাদের বিচার হবে।”

মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরোত্তম স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে এই স্মরণসভায় খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান হিসাবে স্বীকৃতি দিতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। মন্ত্রীও এ বিষয়ে কথা বলেন।

“সেদিন খালেদ মোশাররফ প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ কথা আমরা কেউ আজ লিখি না। যত স্বল্প সময়ের জন্যই হোক, সেটা একদিনের জন্যই হোক, আর চারদিনের জন্যই হোক। তিনি কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি হয়েছিলেন। মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। আমি সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করব সেই ইতিহাসটুকু সংরক্ষণের জন্য।”

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর পঁচাত্তর পরবর্তী ভূমিকারও সমালোচনা করেন আ ক ম মোজাম্মেল।

তিনি বলেন, “খুনী মোশতাককে বাঁচাতে গিয়ে জেনারেল ওসমানী সাহেব তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ডোন্ট শুট হিম, কিল মি ফার্স্ট, দেন কিল হিম।

“১৫ অগাস্টের পর তার ওই আড়াই মাসের ভূমিকা যদি আমরা পর্যালোচনা করি, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত, তিনি কিন্তু খুনীদের উপদেষ্টা হয়ে এ সব দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই ইতিহাসও আসবে। ইতিহাসের স্বার্থে সব সত্য কথাই মানুষের সামনে আসবে। একদিনের হিরো চিরদিনের হিরো থাকে না।”

খালেদ মোশাররফের স্ত্রী সালমা খালেদের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদ, খালেদ মোশাররফের মেয়ে মাহজাবিন খালেদ, এসপি মাহবুব উদ্দিন বীর বিক্রম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান, খালেদ মোশাররফের সহযোদ্ধা মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

bdnews24

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।